ভিটেছাড়া বিধবার সন্তানসহ ঈদগাহে ৬ রাতযাপন
টানা ছয়টি রাত তারা কেন্দ্রীয় ঈদগাহের মেহরাবে কাটিয়েছেন। প্রতিবেশীর দেওয়া খাবারে অনাহার-অর্ধাহারে কেটেছে তাদের দিন। ছবি: সমকাল
আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২০
আক্কেলপুরে ১১ মাসের নাতি, ১৪ বছরের মেয়ে আর ২৩ বছরের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলেসহ বিধবা কোহিনুর বেগমকে বসতবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। টানা ছয়টি রাত তারা কেন্দ্রীয় ঈদগাহের মেহরাবে কাটিয়েছেন। প্রতিবেশীর দেওয়া খাবারে অনাহার-অর্ধাহারে কেটেছে তাদের দিন। অবশেষে খবর পেয়ে পুলিশ সুপার (এসপি) শাহনাজ বেগমের নির্দেশে পুলিশ এসে সন্তানদের বাড়িতে তুলে দিলেও তালাকনামা দেখানোর কারণে ঠাঁই হয়নি কোহিনুরের।
আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের নুরনগর-২ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। কোহিনুরের দাবি, স্বামীর সঙ্গে তাঁর আবার বিয়ে হয়েছিল। তবে প্রতিপক্ষের দাবি, স্বামীর জীবদ্দশাতেই তাঁকে তালাক দেওয়া হয়েছিল।
কোহিনুর বেগমের দাবি, সংসারে সচ্ছলতা আনতে প্রায় ১০ বছর আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। সেখানে থাকাকালে স্বামী আব্দুর রাজ্জাককে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকায় নুরনগর গ্রামে চার শতক জমির ওপর বাড়ি নির্মাণ করা হয়। পরে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হলেও ফোনে তাদের আবার বিয়ে হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুর তাজেম উদ্দিন ও সন্তানদের নিয়ে ওই বাড়িতেই বসবাস করছিলেন। কোহিনুরের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে বড় মেয়ে সম্পা বেগমের (২২) কয়েক মাস আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ায় ১১ মাস বয়সী ছেলে আবু সাঈদকে নিয়ে মায়ের সঙ্গেই থাকেন। ছোট মেয়ের নাম রেবেকা সুলতানা এবং ছেলে সজিব বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী।
কোহিনুরের অভিযোগ, তাঁর শ্বশুর বসতভিটার জমি নাতি-নাতনিদের নামে লিখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পরে তিনি জানতে পারেন বাড়িটি তাঁর দুই ননদের নামে দানপত্র করা হয়েছে। এ নিয়ে কথা বললে বিরোধ তৈরি হয় এবং শ্বশুর দুই ননদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেন। এর জেরে ৫ অক্টোবর কোহিনুরের ননদ ও তাঁর স্বামী আবুল কাশেম তাদের মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন এবং বাড়ি তালাবদ্ধ করে শ্বশুর তাজেম উদ্দিনকে নিয়ে চলে যান। এ ঘটনায় কোহিনুরের বড় মেয়ে ৫ অক্টোবর আক্কেলপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বাড়ি প্রবেশ, মারধর ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
কোহিনুর বেগম বলেন, ‘ননদ ও তাঁর স্বামীর সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আমাদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে বাস্তুহারা হয়ে ঈদগাহে অবস্থান করছি। রাতে পালা করে দুজন ঘুমাই, আর দুজন জেগে থাকি। ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে। প্রতিবেশীদের কেউ খাবার দিলে খাই, না হলে না খেয়ে থাকতে হয়। রাতে পুলিশ এসে আমার সন্তানদের বাড়িতে তুলে দিলেও তালাকনামা দেখিয়ে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমি বিদেশে থাকাকালে ফোনে আমাদের আবার বিয়ে হয়েছিল। এখন পাশে এক আত্মীয়ের বাড়িতে একা আশ্রয় নিয়েছি।’
এদিকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আবুল কাশেম বলেন, ‘জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মারধরের অভিযোগ সত্য নয়। সেদিন কোহিনুর ও তাঁর সন্তানেরা আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে মারধর করছিলেন। খবর পেয়ে আমার স্ত্রীসহ সেখানে গেলে তারা আমাদেরও মারধর করেন। শ্বশুর-শাশুড়ির নিরাপত্তার জন্যই তাদের আমাদের বাসায় নিয়ে এসেছি। কোহিনুরের স্বামী বেঁচে থাকতেই তাঁকে তালাক দিয়েছিল, ফলে এই বাড়িতে তাঁর কোনো অধিকার নেই।’
তিলকপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ পিন্টু বলেন, ‘তারা আমাদের কাছে এসেছিলেন এবং উভয় পক্ষকে ডেকে সমাধানের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তারা থানায় যান। গ্রাম পুলিশ পাঠিয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা হয়েছে। গত রাতে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে বাড়িতে তুলে দিয়েছে।’
আক্কেলপুর থানার ওসি মেহেদী মাসুদ জানান, পরিবারের লিখিত অভিযোগের তদন্ত তাৎক্ষণিকভাবে সুরাহা না হওয়ায় শনিবার রাতে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় ঈদগাহের মেহরাব থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। পরে অভিযুক্তদের ডেকে বাড়ির তালা খুলে কোহিনুরের সন্তানদের বসতঘরে তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে তালাকনামা উপস্থাপন করায় কোহিনুরকে তাৎক্ষণিকভাবে বাড়িতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
- বিষয় :
- জয়পুরহাট