৯ মাসেই দ্বিগুণ মৃত্যু, তবু নেই বিশেষায়িত চিকিৎসা
নারায়ণগঞ্জে অগ্নিদুর্ঘটনা
শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
শ্রমঘন নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন কারণে নিয়মিত ঘটছে অগ্নিদুর্ঘটনা। গত বছর এ জেলায় ৪৭৯টি দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হন। অন্যদিকে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ৭১টি দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের এ হিসেবের বাইরে গত চার মাসে আরও ১২ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, চলতি বছর ৯ মাসে গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ মৃত্যু হয়েছে। এ অবস্থায় জেলায় দগ্ধদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা তথা বার্ন ইউনিট না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকসহ নাগরিকরা।
নারায়ণগঞ্জে গ্যাস লিকেজজনিত দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। ঘনবসতিতে চোরাই গ্যাস সংযোগ ছাড়াও নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এর বাইরে বিদ্যুৎস্পর্শজনিত দুর্ঘটনা ও কলকারখানায় বয়লার বিস্ফোরণও রয়েছে।
কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে নারায়ণগঞ্জে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দগ্ধদের নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয় ঢাকায়। অনেক সময় যানজটে পড়ে ঢাকায় বার্ন ইনস্টিটিউটে যেতে দেরি হয়। ফলে রোগীদের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে অবস্থার অবনতি ঘটে। নারায়ণগঞ্জ শহরে দুটি সরকারি হাসপাতালে ৪০০টি শয্যা থাকলেও নেই কোনো বার্ন ইউনিট। ফলে এখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও যন্ত্রপাতিসহ কমপক্ষে ১০ শয্যার বার্ন ইউনিট স্থাপনের দাবি রয়েছে নাগরিক সংগঠনগুলোর।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জর সদর উপজেলার কাশীপুরের হাজীপাড়ায় এক লাখ ৩২ হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের তার থেকে বিদ্যুৎস্পর্শ হয়ে পাঁচজন মাদ্রাসা ছাত্রী দগ্ধ হয়। এর মধ্যে তিনজন মারা গেছে। দুইজন এখনও চিকিৎসাধীন। নিহত মাদ্রাসাছাত্রী আতিয়ার (১১) বাবা অটোরিকশাচালক মনির হোসেন বলেন, ঘটনার পরপর আমরা মেয়েকে প্রথমে শহরের খানপুরে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে তারা চিকিৎসা দিয়ে আমাদের ঢাকায় বার্ন ইনস্টিটিউটে নিয়ে যেতে বলেন। খানপুরে নিয়ে যেতে আমাদের আধা ঘণ্টার মতো লেগেছে। এরপর ঢাকায় যেতে আরও এক ঘণ্টা। যাদের কেউ দগ্ধ হয় তারা জানে এই হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে দৌড়ানো কতো কঠিন। নারায়ণগঞ্জে যদি আগুনের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতো তাহলে অনেক ভালো হতো।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নারায়ণগঞ্জে ৪৭৯টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে। এতে ১২ জন নিহত ও ৭৮ জন দগ্ধ হন। ২০২৬ সালের দুর্ঘটনার তালিকা ফায়ার সার্ভিস এখনও করেনি। তাদের প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী গত মে পর্যন্ত ৫ মাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৭১টি। এসব ঘটনায় ২৩ জন দগ্ধ ও ১২ জন নিহত হয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের তালিকার বাইরে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে এ প্রতিবেদকের করা হিসাব অনুযায়ী, গত জুন থেকে সেপ্টেম্বর এই চার মাসে নারায়ণগঞ্জে ১৮টি ঘটনায় ১২ জন নিহত ও ২৬ জন আহত বা দগ্ধ হয়েছেন। সে হিসেবে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৮৯টি আগুনের ঘটনায় ২৪ জন নিহত ও ৩৯ জন দগ্ধ বা আহত হয়েছেন।
১৩ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার সস্তাপুর এলাকায় গ্যাস বিস্ফোরণ থেকে সেলুনে আগুন লেগে পাঁচজন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে একজন পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। মার্চে পাঁচটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৬ মার্চ দেওভোগে গ্যাস বিস্ফোরণ থেকে তিনজন দগ্ধ হন। এপ্রিলে সোনারগাঁয়ে প্রতাপের চর এলাকায় একটি কারখানায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একজন শ্রমিক নিহত হন।
মে মাসে ২১ জন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে ৯ জন মারা যান। ১০ মে সদর উপজেলার ভূইগড়ে আবাসিক ফ্ল্যাটে গ্যাস বিস্ফোরণে একই পরিবারের পাঁচজন দগ্ধ হন। পরে চারজন মারা যান। ১১ মে সদরের লাকি বাজার এলাকায় গ্যাস বিস্ফোরণে বাবা ও তিন ছেলে দগ্ধ হন। পরে বাবা ও এক ছেলে হাসপাতালে মারা যান। ১৩ মে সোনারগাঁয়ের মেঘনাঘাট এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যান্টিনে বিস্ফোরণে ১২ জন দগ্ধ হন। তিনজন পরে মারা যান।
জুন মাসে তিনটি আগুনের ঘটনা ঘটে। ১১ জুন বন্দর উপজেলার মদনপুরে আগুনে চারজন নিহত ও একজন আহত হন। ১৯ জুন ফতুল্লার পাগলা তালতলায় পোশাক কারখানায় আগুন লেগে ১৫ জন আহত হন। জুলাই মাসে চারটি অগ্নিদুর্ঘটনায় ঘটলেও কেউ হতাহত হননি। আগস্টে তিনটি ঘটনা ঘটে। ৭ আগস্ট বন্দরের কুড়িপাড়ার চাপাতলিতে গ্যাস লিকেজ থেকে আগুনে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু হয়। সেপ্টেম্বরে অন্তত পাঁচটি দগ্ধের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২৭ সেপ্টেম্বর সদরের হাজীপাড়ায় একটি মাদ্রাসার ছাদে বিদ্যুৎস্পর্শে তিন শিশুশিক্ষার্থী নিহত হয়। আরও দুজন দগ্ধ হয়।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহিদুল হক দীপু বলেন, চিকিৎসকদের মতে যে কোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার চিকিৎসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় যদি উপযুক্ত চিকিৎসা না দেওয়া যায় সে ক্ষেত্রে জীবন সংশয় হতে পারে। নারায়ণগঞ্জে যদি দগ্ধদের চিকিৎসায় একটি ইউনিট থাকতো সেখানে নিশ্চয়ই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্সরা চিকিৎসা দিতেন। ফলে দগ্ধ হয়ে হয়তো এত মৃত্যুর ঘটনা ঘটত না।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের (ভিক্টোরিয়া) আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) বলেন, আমাদের এখানে প্রতিদিন দুই-তিনজন দগ্ধ রোগী আসে। যেগুলো ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ বার্ন, সেগুলোর চিকিৎসা আমরা দিতে পারি। কিন্তু যাদের দগ্ধের পরিমাণ বেশি, তাদের ঢাকায় পাঠাতে হয়। প্রতি মাসে আমরা গড়ে দুই-তিনজন বেশি পরিমাণ বার্নের রোগী পাই। তিনি আরও বলেন, এখানে দগ্ধদের জন্য একটি ইউনিট হলে ভালো হয়।
নগরীর খানপুরে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা আধুনিক হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. আবুল বাশার বলেন, যদি আমাদের এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দগ্ধ ব্যক্তিকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া যেত তাহলে মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক কমে যেত। তিনি আরও বলেন, আমাদের হাসপাতাল ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলছে। সেটি হলে এখানে পাঁচটি বেডের একটি বার্ন ইউনিট রাখার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে দিয়েছি। নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বার্ন ইউনিট করার ব্যাপারে আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে এটি হলে ভালো। নারায়ণগঞ্জে এটির প্রয়োজন আছে।
- বিষয় :
- মৃত্যু