মেঘমুক্ত আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘার হাতছানি, বাড়ছে পর্যটকের ভিড়
ছবি- সমকাল
পঞ্চগড় ও তেতুলিয়া সংবাদদাতা
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:৩৪
বর্ষা বিদায় নিয়েছে। ঘন কুয়াশা ও শীতের আগমনের এখনো কিছুটা দেরি। এরই মধ্যে আকাশে মেঘের আনাগোনা কমে আসায় পঞ্চগড়ের উত্তর আকাশে দৃশ্যমান হচ্ছে বরফে ঢাকা হিমালয় পর্বতমালার মনোমুগ্ধকর শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। ভোর থেকেই দূরদূরান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভিড় বাড়ছে দেশের সর্বোত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। মহানন্দা নদীর তীরসহ উপজেলার বিভিন্ন খোলা জায়গা থেকে খালি চোখেই দেখা মিলছে দূরের এই পর্বতশৃঙ্গের। বিশেষ কোনো যন্ত্র ছাড়াই এমন দৃশ্য উপভোগ করতে পেরে মুগ্ধ হচ্ছেন পর্যটকেরা।
সাধারণত অক্টোবরের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। এবারও অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে মিলেছে এই শৃঙ্গের দেখা। গত মঙ্গলবার ও বুধবার ভোরে জেলা শহর ও তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে পাহাড়টি দেখা যায়। আকাশ পরিষ্কার থাকায় দূরের শৃঙ্গগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের রং ও দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসে। তবে মেঘ, কুয়াশা কিংবা আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনেই আড়াল হয়ে যেতে পারে এই মনোরম দৃশ্য। তাই প্রতিদিন কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার নিশ্চয়তা নেই। কখনো কখনো পর্যটকদের কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়।
তেঁতুলিয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সবচেয়ে পরিচিত স্থান মহানন্দা নদীর তীরবর্তী ডাকবাংলো এলাকা। এ ছাড়া বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টের আশপাশ, চা-বাগানসংলগ্ন খোলা প্রান্তর এবং উপজেলার বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থান থেকেও অনুকূল আবহাওয়ায় দেখা যায় পর্বতশৃঙ্গটি। জেলা শহরের কিছু এলাকা থেকেও কখনো কখনো দেখা মেলে হিমালয়ের এই শৃঙ্গের। সমতল ভূমিতে দাঁড়িয়ে দূরের বরফঢাকা পাহাড় দেখার সুযোগই তেঁতুলিয়াকে পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর এলাকা থেকে ছয় বন্ধু মিলে মোটরসাইকেলে তেঁতুলিয়ায় এসেছেন কলেজশিক্ষার্থী মহিবুল মিলন। তিনি বলেন, ‘আমরা ছয় বন্ধু বাইক নিয়ে রংপুর থেকে এসেছি। গত সপ্তাহে একবার এসেছিলাম। কিন্তু কুয়াশার কারণে সেদিন কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়নি। আল্লাহর অশেষ রহমতে আজকে সুন্দর করে দেখেছি। আমরা আসলে প্রতিবছরই এই সময় বন্ধুদের নিয়ে তেঁতুলিয়ায় ঘুরতে আসি। তেঁতুলিয়ায় ভোরে শীতের আমেজে কাঞ্চনজঙ্ঘাসহ এই এলাকার অপরূপ দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগে।’
পাহাড় দেখার পাশাপাশি তেঁতুলিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোও পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াচ্ছে। এখানে রয়েছে চা-বাগান, চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, মহানন্দা নদী, পুরোনো ডাকবাংলো, আনন্দধারা, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট ও স্থলবন্দর। বিস্তীর্ণ চা-বাগানের সবুজ প্রকৃতি দেখতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসা অনেক পর্যটক এসব স্থানও ঘুরে দেখছেন। এতে স্থানীয় যানবাহন, খাবারের দোকান ও আবাসনসেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তেঁতুলিয়ার রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। ভারতের শিলিগুড়ি অঞ্চল বাংলাদেশের সীমান্তের কাছেই। তবে সীমান্তের ওপারে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি ও অনুমতি লাগে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দাঁড়িয়েই দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সুযোগ থাকায় দেশীয় পর্যটকদের কাছে তেঁতুলিয়া আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। ভারতের দার্জিলিংয়ের টাইগার হিলসহ বিভিন্ন স্থান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। তবে বাংলাদেশের সমতল ভূমি থেকে এই পর্বতশৃঙ্গ দেখার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার উচ্চতা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার। এভারেস্ট ও কে-টু-এর পর উচ্চতার দিক থেকে এটি বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। নেপাল ও ভারতের সিকিম অঞ্চলের সীমান্তে অবস্থিত এই শৃঙ্গ হিমালয় পর্বতমালার অন্যতম পরিচিত পর্বত।
নীলফামারীর তোমার এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে তেঁতুলিয়ায় এসেছেন কলেজশিক্ষক শফিউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেমেয়েসহ পরিবার নিয়ে গতকাল এসেছিলাম। রাতে এখানে এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলাম। ভোরের দিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেরেছি। তেঁতুলিয়ার মহানন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে নেপাল ও ভারতের মাঝামাঝি অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার মজাই আলাদা। এই দৃশ্য আসলে এখান থেকেই দেখতে হয়। দেশের অন্য কোথাও থেকে পাহাড়ের এমন দৃশ্য দেখা যায় বলে মনে হয় না।’
পর্যটকদের আনাগোনায় স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজও বাড়ছে। তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো এলাকার ইজিবাইকচালক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘এই সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন পরিবার-পরিজন নিয়ে তেঁতুলিয়ায় ঘুরতে আসেন। তাঁরা কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য দেখেন। ডাকবাংলো এলাকায় মহানন্দা নদীর পাড়ে ভোর থেকেই ভিড় শুরু হয়। বেলা উঠে গেলে অদৃশ্য হয়ে যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। এরপর তাঁরা আমাদের রিকশায় ঘুরেন। আমরা পর্যটকদের বিভিন্ন চা-বাগান, কমলার বাগান, দার্জিলিং ব্রিজ, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট ও স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখাই।’
তবে পর্যটনের এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহন চলাচল ও পার্কিং ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদে দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখার স্থান, মানসম্মত খাবার এবং পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা জরুরি হয়ে উঠছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যসেবা ও মানসম্মত আবাসনও প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি ডাকবাংলো ও বেরং কমপ্লেক্সে দুটি করে কক্ষ থাকলেও বুকিং দিয়েও সেগুলো পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে। তবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার মৌসুমে এসব হোটেলে কক্ষের সংকট দেখা দেয়। আগাম আবাসন বুকিংয়ের সুবিধা, সহজ যাতায়াত এবং দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকদের ভোগান্তি কমবে। একই সঙ্গে পরিকল্পিত পর্যটনসেবা গড়ে উঠলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে তেঁতুলিয়া টুরিস্ট পুলিশের উপপরিদর্শক আব্দুল আজিজ বলেন, ‘এখন শীতকাল শুরু হয়ে গেছে। দুই-এক দিন ধরে আকাশ পরিষ্কার থাকার কারণে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে টুরিস্টরা আসতে শুরু করেছেন। তাঁদের সেফটি ও সিকিউরিটি আমাদের দায়িত্ব। আমরা তাঁদের নিরাপত্তার জন্যই কাজ করছি। টুরিস্টরা যখনই যেকোনো সমস্যার কথা আমাদের জানান, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি।’
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে তেঁতুলিয়া থেকে খুব সুন্দরভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। প্রথমবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে আমি নিজেই অভিভূত এর সৌন্দর্য দেখে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে, এমন খবর শোনার পর থেকে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা তেঁতুলিয়া ঘুরতে আসছেন। এখানে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের টুরিস্ট পুলিশ, মডেল থানা পুলিশ এবং আমাদের সমন্বয়ে একটা যৌথ টিম কাজ করছে। এ ছাড়া আমাদের এখানে আবাসনের যে সংকট আছে, সেটা আমরা নিরসনের চেষ্টা করছি। পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য এখানে সন্ধ্যাকালীন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনের চেষ্টা করছি। আশা করি শুক্রবার থেকে এই অনুষ্ঠান চালু হবে।’