ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

আড়াইহাজার

প্রকাশ্যেই চলে জুয়া খেলা মামলা-গ্রেপ্তার হাতেগোনা

১০ মাসে জুয়া-সংক্রান্ত মামলা ৪টি। গ্রেপ্তার ১০ জন

প্রকাশ্যেই চলে জুয়া খেলা মামলা-গ্রেপ্তার হাতেগোনা
×
×

 এস এম প্রভাত, আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ)

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে প্রায় প্রকাশ্যেই চলছে জুয়া খেলা। এর ক্রমবিস্তারে সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়লেও তা প্রতিকারে নেই তেমন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। গত ১০ মাসে জুয়া-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৪টি। গ্রেপ্তার হয়েছেন ১০ জন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে তিন তাস নামে চলে আসছে অবাধ জুয়া আসর। জুয়ার আসর বসে সন্ধ্যার পর থেকে। তবে অনেক সময় দিনেও আসর বসে। এ ছাড়া অনলাইন জুয়ার ভয়াল থাবার কবলে পড়ছে কিশোর ও তরুণরা। ঘরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তারা জড়িয়ে পড়ছে এই ধ্বংসাত্মক খেলায়।

জুয়াখেলার প্রবণতা বাড়ার ভুক্তভোগী হচ্ছেন আড়াইহাজারের সব শ্রেণির বাসিন্দারা। জুয়া খেলার টাকা জোগাড় করতে জুয়াড়িরা চুরিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। গত ২৬ আগস্ট ঝাউগড়া এলাকা থেকে একই রাতে ১২টি টিউবওয়েল চুরি হয়। বাসাবাড়ি থেকে দা, বঁটি, কোদাল, কাঁচি ও বালতিও চুরি হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
আমির হোসেন, আফসার, হবি হোসেন, মনির হোসেন, শ্যামল, পনির, শামীম ও হানিফ কয়েকজন এলাকায় জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত। মামলা বা গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কার বিষয়ে তারা বলেন, ধরা পড়লেও সমস্যা নেই। নিজস্ব উকিল আছে, কোকিলের মতো সুরে সুরে জামিন করাইয়া দেয়।

১০ মাসে চার মামলায় গ্রেপ্তার ১০
আড়াইহাজার থানার পুলিশের তথ্যমতে, গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জুয়া-সংক্রান্ত মামলা দায়ের হয়েছে মাত্র চারটি। এতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১০ জন। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, সাধারণত এসব ঘটনায় কেউ মামলা করেন না। আবার মামলা হলেও আসামিদের ধরা সম্ভব হয় না। অনেক সময় পুলিশ জুয়াড়িদের আটক করলেও প্রভাশালীদের তদবিরের কারণে তাদের ছেড়ে দিতে হয়। জুয়ার আসরের খবর পেয়ে অভিযান চালাতে গেলেও সাধারণত জুয়াড়িরা টের পেয়ে পালিয়ে যায়।

জুয়ায় বাধা দেওয়ায় স্ত্রীকে হত্যাচেষ্টা
উপজেলার মোহনপুর গ্রামের বাসিন্দা মাজারুল ইসলাম সবুজ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। অনলাইন জুয়া জড়িয়ে তিনি স্ত্রীর কাছে টাকা দাবি করতেন এবং বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। বাবার কাছ থেকে জুয়া খেলার জন্য টাকা এনে না দেওয়ায় গত ১৩ জুন তিনি স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করেন। চিৎকার শুনে স্থানীয়রা এসে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
জমি কেনাবেচায় জড়িত থাকার পাশাপাশি কাপড়ের ব্যবসা করতেন বিশনন্দী বাসিন্দা মাহফুজুল ইসলাম। ২০২৪ সালে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি বলেন, এক বন্ধুকে দেখে অনলাইনে জুয়া খেলা শুরু করি। এক পর্যায়ে লোভ পেয়ে বসে। কিন্তু পরে শুধু হারতে থাকি। এদিকে খেলার নেশায় ধারদেনা করতে থাকি। জুয়া আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।

খাগকান্দা এলাকার মুদি দোকানদার বেনু মিয়া জুয়া খেলায় হারতে হারতে জমিজমা বিক্রি করে এখন সহায় সম্বলহীন। মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন। একই এলাকার আনিছুর রহমান জুয়া খেলা টাকা জোগার করতে না পেয়ে প্রায়ই স্ত্রীকে নির্যাতন করতেন। নির্যাতন সইতে না পরে স্ত্রী বাবার বাড়ি চলে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেনু মিয়া ও আনিছুর ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।
আড়াইহাজারে হাটবাজারে বা চায়ের দোকানে বসলে শোনা যায় এমন অনেক ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বা সামাজিক অশান্তির খবর পাওয়া যায়।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কাজী আব্দুস সেলিম বলেন, সেই অর্থে জুয়া-সংক্রান্ত কোনো আইন দেশে নেই। যা আছে সেটার নাজুক অবস্থা। ৭২-এর সংবিধানে জুয়া নিষিদ্ধের ব্যাপারে বলা আছে। তাই জুয়া ঠেকাতে কার্যকরী ও কঠোর আইন প্রয়োজন। কারণ এটা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে। সরকারি সফর আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবুল কাসেম বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবারকেও সন্তানের ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দিতে হবে। প্রাবন্ধিক ও গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন বাবুল বলেন, জুয়া মতো ব্যাধি থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক সচেতনা খুব জরুরি।
আড়াইহাজার থানার ওসি সবজেল হোসেন বলেন, জুয়ার সঙ্গে জড়িত চক্র এবং আসক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন জুয়ার সাইট শনাক্ত ও বন্ধের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

আরও পড়ুন

×