ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বিকল্প উৎস থেকে আয় পড়ালেখা বিনামূল্যে

বিকল্প উৎস থেকে আয় পড়ালেখা বিনামূল্যে
×
×

 মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১২ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার একটি গ্রাম হরগজ। এই এক গ্রাম নিয়েই গঠিত হয় হরগজ ইউনিয়ন। তবে এটি নয়, অনন্য এক বৈশিষ্ট্যের কারণে উপজেলায় গড়ে উঠেছে গ্রামটির মর্যাদাপূর্ণ স্বতন্ত্র অবস্থান। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত হরগজের একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় শুরু থেকেই শিক্ষার্থীরা পড়লেখা করছে বিনামূল্যে। বেসরকারি বিদ্যালয়টিতে ভর্তি ফি, বেতন এমনকি এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফিও দিতে হয় না কাউকে। সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ প্রসারে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি না করে বিকল্প আয়ের পথ বেছে নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বিদ্যালয়টি। 
হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় নামের এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৭১৯ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। তাদের কাউকেই ভর্তি ফি, সেশন ফি, বেতনসহ অন্য কোনো ফি দিতে হয় না। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের সব ব্যয় বহন করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।  

২০২৫ সালে এসএসসিতে উপজেলায় প্রথম স্থান ও ২০২৬ সালে আটটি জিপিএ ৫ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়টি। ২০ হাজারের বেশি বাসিন্দার এ গ্রামে ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চারটি মাদ্রাসাও রয়েছে। হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় গ্রামের একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়।

এ বিদ্যালয়ের সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে হরগজ গ্রামের ২৪ জন অংশ নেন। তাদের মধ্যে আজাহার উদ্দিন, জয়নাল হোসেন ও জসিম উদ্দিন শহীদ হন। ১৯৭২ সালে গ্রামে মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এই তিন বীর শহীদের স্মরণে সেটির নাম রাখা হয় হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়।   
১৯৭৩ সালে হরগজের কৃতী সন্তান সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আ.খ.ম নূরুল হক ও 
বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম বশির উদ্দিন ঠান্ডু, আব্দুল হাকিমসহ আরও কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মিলে বিদ্যালয়টির মাঠে একটি গরুর হাট বসান। পশু বিক্রির হাসিল থেকে 
যে অর্থ আসে, তা দিয়েই বিদ্যালয়ের ব্যয় মেটানো হয়। অবকাঠামো উন্নয়নও করা হয় ওই আয় থেকে। 
২০১৯ সালে স্কুল মাঠে গরুর হাট বসানো নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ে হাট কমিটি। পরে বিদ্যালয়ের পাশে একটি জমি লিজ নিয়ে সেখানে গরুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি। তবে হাটের আয় থেকে বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে আগের মতোই।

বিদ্যালয়টির নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবণ্য আক্তার ও দশম শ্রেণির ছাত্র তামিম আল হাসান জানিয়েছে, তাদের গ্রামের মুরব্বিরা এ গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য বিনামূল্যে লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এ বিদ্যালয়ে পড়তে কোনো টাকা লাগে না। 
অভিভাবক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, একটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত সন্তানকে পড়াতে অনেক টাকা লাগত। এ বিদ্যালয়ে সে খরচ লাগছে না। আমাদের ওপর থেকে চাপটাই সরে গেছে। ধনী-গরিব পরিবারের শিক্ষার্থীরা একই সুযোগ ভোগ করায় বৈষম্যও থাকছে না। 
হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ বজলুর রহমান বলেন, এ ইউনিয়নের সব বাসিন্দা শিক্ষার ক্ষেত্রে একাট্টা। সবার সন্তান বিনা বেতনে লেখাপড়া করবে– এমন সুযোগ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা করেছেন একটি গরুর হাট বসিয়ে। 
সপ্তাহের রোববার বসে এ হাট। বিক্রি ভালো। হাটের যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যাপারীদের নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যবস্থা ও হাসিলের মূল্য কম হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে ব্যাপারীরা গরু নিয়ে আসেন হাটে। ফলে বিদ্যালয়ের আয় হয় ভালো। 

গ্রামের বাসিন্দা ও সাটুরিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মেহেদি হাসান আরিফ বলেন, আমাদের সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়ে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। হরগজ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, কেউ যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়, সে লক্ষ্যে সব শিক্ষার্থীকে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। 
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার কামরুল হাসান রাজীব বলেন, প্রত্যেক শিক্ষকের কাছে ১ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীর দেখভাল করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের খোঁজখবর নেন। কয়েকটি গ্রুপে শিক্ষকদের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার পর যে গ্রুপ প্রথম হয়, সেই শিক্ষককে অতিরিক্ত সম্মানি দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন,  ১৯৭২ সাল থেকে যেসব শিক্ষার্থী ক্লাসে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে ছিলেন, তাদের নামের তালিকা করে স্কুলের দেয়ালে লেখা হবে। এতে বর্তমান শিক্ষার্থীরা ওই নাম দেখে লেখাপড়ায় আগ্রহী বাড়বে। এ ছাড়া দেশের নামিদামি স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ ও অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষার মান আরও কীভাবে বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সাটুরিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফকির জাকির হোসেন বলেন, এ উপজেলায় ১৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে একমাত্র হরগজ শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিনা খরচে লেখাপড়া করছে। আমি মনে করি, ওই গ্রামের বাসিন্দাদের উন্নত মানসিকতার কারণেই শিক্ষার্থীরা এমন সুযোগ পেয়েছে।

আরও পড়ুন

×