নদীভাঙনে নিঃস্ব বহু পরিবার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত সন্তানরা
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সানন্দবাড়ী পশ্চিমপাড়া এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন। সম্প্রতি তোলা সমকাল
রাজ্জাক মিকা, দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর)
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৫ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
এক সময় যাদের আবাদি জমি, বসতভিটা ছিল, আজ তারা নিঃস্ব। জীবন কাটছে অভাব-অনটনে। জোটে না দুবেলা দুমুঠো খাবার। জীবিকার তাগিদে কেউ পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানীসহ দূরদূরান্তে। নদীভাঙা পরিবারের ছেলেমেয়েরাও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ঘটছে বাল্যবিবাহের ঘটনা। এমন চিত্র জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের নদী ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের।
দেওয়ানগঞ্জ নদনদী বিধৌত অঞ্চল। এই উপজেলায় মোট জমির পরিমাণ ২৬ হাজার ৬১৮ হেক্টর। তার মধ্যে কৃষিজমি ১৮ হাজার ৭৪৪ হেক্টর। উত্তরে ডাংধরা এবং দক্ষিণে দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউনিয়ন। উত্তর থেকে দক্ষিণ সীমানার দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। এই উপজেলায় ছড়িয়ে আছে ব্রহ্মপুত্র, জিঞ্জিরাম, যমুনা ও দশানী নদী। এক সময় এই অঞ্চল কৃষিতে সমৃদ্ধ ছিল। গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু ছিল। কিন্তু সব কিছু পাল্টে যাওয়া শুরু করে সত্তর দশকের দিকে। যমুনা, জিঞ্জিরাম ও ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি এবং প্রবাহের কারণে হারিয়ে যেতে থাকে তাদের সুখের দিনগুলো। নদীপারের মানুষের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার।
ডাংধরা ও চরআমখাওয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে জিঞ্জিরাম ও যমুনা নদী। এই দুই ইউনিয়নের খোলাবাড়ি, চিথুলিয়া, মোল্লারচর, এরান্ডাবাড়ি, জিগাবাড়ি, মৌলভীরচর, চুনালীপাড়া, মুন্সিপাড়া, মণ্ডলপাড়া, সানন্দবাড়ী পশ্চিমপাড়া, পাটাধোয়াপাড়াসহ বেশ কয়েকটিগ্রাম আজ নদীতে। যেখানে থাকার কথা জনবসতি, আজ সেখানে ধুধু বালুচর। এই অঞ্চলের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ বসতভিটা কৃষি জমি হারিয়ে আজ নিঃস্ব।
সানন্দবাড়ী লম্বাপাড়া গ্রামের হারুন অর রশিদ বলেন, ডাংধরা ও চরআমখাওয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম আজ নদীতে। ভাঙনকবলিত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে যে যার সুবিধামতো। এক সময় তাদের সংসারে সুখ ছিল, শান্তি ছিল। সব হারিয়ে আজ তারা নিঃস্ব। জীবন জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। যুগ যুগ ধরে এই অঞ্চল নদীভাঙনের কবলে পড়লেও ভাঙন রোধে নেওয়া হয়নি স্থায়ী পদক্ষেপ।
চুনালীপাড়া গ্রামের দিলবর হোসেনের বসতভিটা নদীভাঙনের কবলে পড়েছে চারবার। তাঁর পাঁচ বিঘা কৃষিজমিও ভেঙে গেছে। এখন তিনি নিঃস্ব। তাঁর মতো কয়েকশ পরিবারের একই দশা। চুনালীপাড়া গ্রামটি এখন নদীতে বিলীন। প্রকৃতির সঙ্গে তাদের লড়াই এখনও থামেনি। নদীটি এখনও ভাঙছে। প্রতিকারে কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। ভাঙন প্রতিরোধ না করা হলে সানন্দবাড়ীর অস্তিত্ব মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হওয়ার শঙ্কা স্থানীয়দের।
হাতিভাঙ্গা ও বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র ও জিঞ্জিরাম নদী। নদী দুটির ভাঙনে বিলীন হয়েছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। নিঃস্ব হয়েছে বহু পরিবার। ভাঙনকবলিত এলাকার মধ্যে রয়েছে চরহাতিভাঙ্গা, পোল্যাকান্দি, ফারাজীপাড়া, গুমেরচর, নয়াগ্রাম, মদনেরচর, মাদারের চর। চরজেগে উঠলেও ভাঙনের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেনি বেশির ভাগ মানুষ। বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট নদীতে।
নদীপারেই বসতি চরপোল্যাকান্দি গ্রামের আমিনুল ইসলামের। তিনবার ভাঙনের কবলে পড়েছে তাঁর বসতবাড়ি। কৃষিজমি হারিয়ে আজ তিনি নিঃস্ব। তাঁর ভাষ্য, ব্রহ্মপুত্রের জেগে ওঠা চরে বসতি স্থাপন করেছেন। এই অঞ্চলের প্রায় হাজার খানেক পরিবারের একই দশা। জেগে ওঠা চরে ফসল হলেও ভাঙনের ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে পারেননি কেউ। এখানে নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট। সন্তানদের ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করাতে পারছে না দরিদ্র পরিবারগুলো। এক সময় তাদের এমন দুরাবস্থা ছিল না। সংসারে ছিল সুখ-শান্তি। শিক্ষার জন্য ছিল প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আজ তারা নিঃস্ব।
দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। এই ইউনিয়নের পূর্বাংশের মাইছানিরচর, তিলকপুর, কাউনেরচর ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে। প্রতিবছর নদের ভাঙনে গ্রামগুলোর বাসিন্দারা বসতভিটা, ফসলি জমি হারাচ্ছেন। নিঃস্ব হচ্ছেন অনেক মানুষ। পরিবার-পরিজন নিয়ে কাটাতে হচ্ছে মানবেতর জীবন।
তিলকপুর গ্রামের ফজলু মিয়া চাকরি করছেন একটি বীমা কোম্পানিতে। জীবনের প্রথম অধ্যায় থেকে দেখেছেন ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের খেলা। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা। জীবনের ছন্দপতন। তাঁর ভাষ্য, এই অঞ্চলে কয়েক যুগ ধরে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন চলছে। পাল্টে যাচ্ছে মানুষের জীবনমান। বহু বছর ধরে ব্রহ্মপুত্র ভাঙলেও ভাঙন রোধে প্রতিরোধে কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ নেই। ব্রহ্মপুত্রের অব্যাহত ভাঙন থেকে পরিত্রাণ চান তারা।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ জহুরুল হোসেন বলেন– যমুনা, জিঞ্জিরাম ও ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন রোধে একটি প্রকল্প করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হলে এসব নদনদী ভাঙন রোধের কার্যক্রম শুরু হবে।
- বিষয় :
- নদী