খুলনার কয়রা
দুই দফায় বেড়েছে মেয়াদ, এখনও শেষ হয়নি কাজ
কপোতাক্ষ নদের তীর রক্ষার কাজ চলার মধ্যেই ধসে পড়েছে মাটি। গত বুধবার খুলনার কয়রা উপজেলার গাববুনিয়া এলাকায়
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:৩৯ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:৪০
খুলনার কয়রায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বর্ধন’ প্রকল্পের আওতায় কপোতাক্ষ নদের তীর রক্ষার একটি কাজ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। কাজের শুরু থেকে এলাকাবাসী ধীরগতি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিলেন। তাদের বাধার মুখে এক দফায় কাজও বন্ধ করতে হয় ঠিকাদারকে। দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হলেও নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাসেও তা শেষ হয়নি। এরই মধ্যে কয়েক জায়গায় ধসে পড়েছে মাটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কাশিরহাটখোলা, গাজীপাড়া ও গাববুনিয়া এলাকায় কপোতাক্ষ নদের তীর রক্ষার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বর্ধন’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭১ কোটি টাকায় কাজটি শুরু হয় ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সকে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই কাজ শেষ করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ওই সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের কাজে ৭৫ শতাংশ অগ্রগতির কথা জানিয়েছিল। গত শুক্রবার পর্যন্ত সেই কাজ ৮০ শতাংশ এগিয়েছে। অর্থাৎ প্রথম দফার নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস পেরিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে কাজের মেয়াদও দুই দফায় বাড়ানো হয়। প্রকল্পটি তদারকি করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সাতক্ষীরা-২ বিভাগ।
প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৪৫০ মিটার তীর রক্ষায় তিন লাখ ৮২ হাজার সিসি ব্লক ডাম্পিং ও এক লাখ ১১ হাজার ব্লক প্লেসিং করার কথা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইতোমধ্যে তিন লাখ ২২ হাজার ব্লক ডাম্পিং করা হয়েছে। এখনও ৬০০ মিটার বাঁধে ব্লক বসানোর কাজ বাকি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকেই তারা ধীরগতি লক্ষ্য করেছেন। সিসি ব্লক তৈরির সরঞ্জাম আনতে ও ব্লক তৈরির মাঠ প্রস্তুত করতে ছয় মাস লেগে যায়। কাজ শুরুর পর নানা অনিয়মে বাধাগ্রস্ত হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন চেয়েছিলেন কপোতাক্ষ নদের চিকন দানার বালু ব্যবহার করে ব্লক তৈরি করতে। এলাকাবাসীর বাধা দিলে তারা তা করতে পারেননি। দীর্ঘদিন পর বাইরে থেকে মোটা দানার বালু এনে আবার কাজ শুরু হয়।
প্রকল্প এলাকার এক বাসিন্দা আব্দুর রহমানের ভাষ্য, কাজে ধীরগতির মূল কারণ এলাকার মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিম্নমানের ব্লক তৈরি করা। ঠিকাদারের লোকজন কয়েক দিন পর পর সুযোগ বুঝে ব্লক তৈরি করেন। পরে এসব ব্লক রাতে নদে ডাম্পিং করা হয়। কী পরিমাণ ব্লক তৈরি করা হয়েছে, কী পরিমাণ ডাম্পিং করা হয়েছে– এসব তথ্য এলাকাবাসীকে দেওয়া হয়নি।
দেবাশীষ মণ্ডল নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, এক বছর মেয়াদের কাজ দুই বছরেও তারা শেষ করতে পারেননি। কাজ চলার মধ্যেই অনেক জায়গায় চরের মাটি ধসে যেতে শুরু করেছে।
উত্তর বেদকাশি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সরদার নুরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে এমন অভিযোগ পেয়ে কয়েকবার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ঠিকাদার স্থানীয় একজন শ্রমিক সরদারের সহায়তায় একইভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জানতে পেরেছেন, পাউবোর টাস্কফোর্সের টিম এসে ব্লক গুনে চলে যাওয়ার পর সেই ব্লক ডাম্পিং করা হয় না। একই ব্লক বার বার গণনায় দেখিয়ে প্রকল্পের টাকা নয়-ছয় করতেই সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সের পক্ষে প্রকল্পের সাইট ব্যবস্থাপক হিসেবে আছেন তানভীর আহমেদ। তাঁর ভাষ্য, প্রকল্পটির দৈর্ঘ্যের ‘চেইনেজ’ হিসাবে এক হাজার ৪৫০ মিটার দেখানো হলেও কাজ করা হবে সাড়ে ১১শ মিটার। এর মধ্যে বেশির ভাগ কাজ হয়ে গেছে। কাশিরহাট এলাকায় কয়েকটি দোকান ও বিদ্যুতের খুঁটির কারণে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া গাজীপাড়া এলাকায় ২০০ মিটার অংশে কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা যাচ্ছে না।
এলাকাবাসী ও ইউপি চেয়ারম্যানের তোলা অভিযোগ অস্বীকার করেন পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী। তাঁর দাবি, টাস্কফোর্সের উপস্থিতিতেই ব্লক গণনা শেষে তা ডাম্পিং করা হয়ে থাকে। কাজের ধীরগতি বিষয়ে বলেন, কাজটি দরপত্র প্রক্রিয়ায় দেরি হওয়ার কারণে এমনটি হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকার কয়েকটি জায়গায় স্থাপনা সরাতে সময় লেগেছে। তবে বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার আশা করছেন তিনি।
- বিষয় :
- খুলনা