‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখির’ খোঁজে ঘরছাড়া মোমিন
বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন থেকে আখড়ার সাধুজীবন
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউরিয়ার আখবাড়িতে বসে আছেন মোমিন সাধু। ছবি: সমকাল
মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী (কুষ্টিয়া)
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:৩২ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:৩৭
ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে পড়ার সময় আব্দুল মোমিনের (৩৫) স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়া। দিনরাত বই নিয়ে পড়ে থাকতেন। একদিন বাংলা সাহিত্যের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে চোখ আটকে গেল ফকির লালন সাঁইয়ের একটি পঙ্ক্তিতে- ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’। পঙ্ক্তিটির অর্থ খুঁজতে গিয়ে তার মনে জন্ম নিল একের পর এক প্রশ্ন। খাঁচা কে? পাখি কে? কীভাবে আসে, কীভাবেই বা যায়?
গাইড বইয়ে মিলল না উত্তর। অনলাইনে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে একসময় বিসিএসের প্রস্তুতিই থামিয়ে দিলেন মোমিন। উত্তর খুঁজতে পাড়ি জমালেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায়, মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়িতে।
সাল ২০১৮। কুমিল্লার গ্রামের বাড়ি, পরিবার আর বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন পেছনে ফেলে এক কাপড়ে ছেঁউড়িয়ায় চলে আসেন তিনি। সেই থেকে বদলে যায় তার পরিচয়। ছাত্র আব্দুল মোমিন হয়ে ওঠেন ‘মোমিন সাধু’। কখনো লালনের আখড়াবাড়িতে, কখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাজার প্রাঙ্গণে দেখা মেলে তার।
গত শনিবার বিকেলে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে দেখা হয় মোমিন সাধুর সঙ্গে। মাথায় কালো কাপড় বাঁধা, শরীরেও জড়ানো কালো কাপড়ের আরও দুই টুকরো। নিজের পুরো পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক হলেও জীবনের বাঁকবদলের গল্প বলতে দ্বিধা করলেন না তিনি।
মোমিন বলেন, ‘আমি ২০০৯ সালে এসএসসি, ২০১১ সালে এইচএসসি পাস করি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে। ২০১৬ সালে তিতুমীর থেকে ফিজিক্সে অনার্স শেষ করি। ইচ্ছে ছিল বিসিএস ক্যাডার বা ফরেন ক্যাডার হব। কিন্তু লালনের ওই একটা লাইন আমাকে ঘরছাড়া করল। মনে হলো, চাকরি পেলে হয়তো একটা খাঁচা পাব, কিন্তু পাখির খবর জানা হবে না।’
খাঁচা দেহ, পাখি আত্মা
লালনের গানের সেই পঙ্ক্তির অর্থ খুঁজতেই ২০১৮ সালের তিরোধান দিবসে আখড়ায় আসেন মোমিন। সেখানে গুরু জসিম উদ্দিন, যিনি জসিম পাগলা নামে পরিচিত ছিলেন, তার কাছে শুরু হয় নতুন সাধনার জীবন। মোমিনের ভাষায়, খাঁচা মানে দেহ, আর পাখি মানে আত্মা। সেই সত্যের সন্ধানেই এখন তার দিন কাটে। তার গুরু জসিম পাগলা ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবেন- এমন প্রশ্নে মোমিনের উত্তর, ‘এক সেকেন্ডের ভরসা নাই।’
তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনো ভাবি না। যেহেতু সেকেন্ডের ভরসা নাই, সেহেতু যতক্ষণ সৃষ্টিকর্তা আমাকে রাখেন, ততক্ষণ আমি সত্যের সঙ্গে থাকতে চাই। সত্য কথা বলে, জ্ঞানার্জন করে সত্য জ্ঞান পেতে চাই। যে জ্ঞান অবিনশ্বর, যেটা সত্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।’
মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টার কথাও বলেন মোমিন। তার ভাষ্য, মিথ্যা, গিবত, হিংসা, অহংকার ও রাগ থেকে মুক্ত হতে চান। দূরে থাকতে চান মানুষের ভেতরের পশুত্ব, হানাহানি ও প্রবৃত্তির টান থেকে।
পরিবারের প্রত্যাশা, মোমিনের অন্য পথ
তিন ভাই ও চার বোনের সংসারে মোমিন ছিলেন সবার বড়। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, ছেলে ভালো চাকরি করে সংসারের হাল ধরবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশার বদলে মোমিন বেছে নিয়েছেন সাধনার জীবন। তার বাড়ি ছেড়ে চলে আসা আজও মেনে নিতে পারেননি বাবা-মা। পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগও প্রায় বিচ্ছিন্ন।
তবে এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই মোমিনের। তার চাওয়া, পৃথিবীর সব মানুষকে একই পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখা হোক।
তিনি বলেন, আমার এখন একটাই চাওয়া- এক ফ্যামিলিতে পৃথিবীর সকল মানুষকে দেখতে চাই। লালন সাঁই তো সেটাই বলে গেছেন—‘জাত গেল জাত গেল বলে, একি আজব কারখানা।’
মোমিনের বিশ্বাস, মানুষের প্রতি ভালোবাসা সব জায়গা থেকেই সম্ভব। তবে সত্যের সন্ধানে থেকে মানুষকে ভালোবাসার গুরুত্ব আলাদা। লালনের গানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘কবে গো সৃজন হবে, যেদিন হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, জাতি-গোত্র নাহি রবে।’
ধর্মীয় বিভাজন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে তার। মোমিন বলেন, ধর্মের মধ্যেই যখন এত দল ও বিভক্তি, তখন মানুষ কীভাবে সত্যবাদী হবে? একে অন্যকে পরাজিত করার চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সত্যের পথে থাকা কঠিন বলে মনে করেন তিনি।
‘আমি একই ফ্যামিলিতে পৃথিবীর সকল মানুষকে দেখতে চাই,’ বলেন মোমিন।
ছেঁউড়িয়ার সাধুদের ভাষ্য, প্রতি বছর লালন উৎসবের আগে শিক্ষিত তরুণদের অনেকে আখড়ায় আসেন। তাদের কেউ কেউ ফিরে গেলেও কয়েকজন থেকে যান সাধনার পথে। মোমিন তাদেরই একজন।
প্রায় ১৩৬ বছর আগে দেহত্যাগ করেছেন লালন সাঁই। কিন্তু তার গান- ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, ‘মিলন হবে কত দিনে’ আজও মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায়, জীবনের অর্থ খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করে।