ঢাকা শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

মধুটিলা ইকোপার্ক

অব্যবস্থাপনায় মলিন ইকোপার্কের সৌন্দর্য, মিলছে না ইজারাদার

অব্যবস্থাপনায় মলিন ইকোপার্কের সৌন্দর্য, মিলছে না ইজারাদার
×
×

মধুটিলা ইকোপার্কে ঢুকে পড়া বন্যহাতি। গত ১ নভেম্বর তোলা সমকাল

মিজানুর রহমান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঘন বন, পাহাড়, সীমান্তঘেঁষা প্রাকৃতিক পরিবেশ আর জীববৈচিত্র্য মিলিয়ে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্কে। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। বারবার দরপত্র আহ্বান করেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইজারাদার।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী বিনোদনের অভাব, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে পার্কটির আকর্ষণ কমছে। এতে পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, পাশাপাশি রাজস্ব আয় ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না।
মধুটিলা ইকোপার্কের আয়তন প্রায় ৩৮৩ একর। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পার্কটি। নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকার এই পার্কের চারপাশে রয়েছে গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পাহাড়, বনভূমি, সীমান্তের নৈসর্গিক পরিবেশ পর্যটকদের কাছে স্থানটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। শেরপুর ছাড়াও ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে ঘুরতে আসে।

সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে অবকাঠামো
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়েনি পর্যটনসেবার মান। সম্প্রতি পার্কে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন লেক খনন না করায় পানি অপরিষ্কার হয়ে পড়েছে। শিশুপার্ক থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত বিনোদনমূলক রাইড নেই। পার্কের ১০টি পিকনিক স্পটের বেশির ভাগই সংস্কারের অভাবে অচল হয়ে আছে। পুরো পার্কে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে মাত্র দুটি শৌচাগার। নেই পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা।
নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে পাহাড়ে ওঠার সিঁড়িগুলো অপরিষ্কার। পার্কের ভেতরের সরু সড়কের বিভিন্ন অংশও ভেঙে গেছে। এ ছাড়া বেশির ভাগ এলাকায় সীমানাপ্রাচীর না থাকায় নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সীমানাপ্রাচীর নেই, অবাধে ঢুকে হাতি
পার্কটির আরেকটি বড় সমস্যা বন্যহাতির বিচরণ। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সীমানাপ্রাচীর না থাকায় প্রায়ই বন্যহাতি পার্ক এলাকায় ঢুকে পড়ে। কখনও পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দোকানপাট ভাঙচুর করে, নষ্ট করে ব্যবসায়ীদের মালপত্র। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি পর্যটকদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, পার্কটিকে পর্যটনবান্ধব করতে হলে মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি বন্যহাতির নিরাপদ চলাচল ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

লোকসানের শঙ্কায় আগ্রহ হারাচ্ছেন ইজারাদার
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৫ লাখ টাকায় ইকোপার্কটি ইজারা দিয়েছিল বন বিভাগ। তবে ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে নতুন করে ইজারা ও পার্ক পরিচালনায় জটিলতা দেখা দেয়। এ অবস্থায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে বন বিভাগ। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ইজারাদার না পাওয়ায় চলতি ২ নভেম্বর আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ৮ নভেম্বর দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
পার্কের সর্বশেষ ইজারাদার মজিবর রহমান চৌধুরী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৫ লাখ টাকায় পার্কের প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন স্পট ইজারা নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ১২ মাসে ইজারার অর্ধেক টাকাও তুলতে পারেননি। এতে বড় ধরনের লোকসান হয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, পার্কে দীর্ঘদিন ধরে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি। এতে পর্যটকরা আগ্রহ হারাচ্ছেন। পর্যটক কমে যাওয়ায় তাদের ব্যবসায়ও লোকসান হচ্ছে।

পর্যটক সংকটে বিপাকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা
মধুটিলার অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন ছোট-বড় অনেক ব্যবসায়ী। পার্কের ভেতরে রয়েছে খাবার, আচার, খেলনা ও বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান। আচার বিক্রেতা হামিদুল ইসলাম অনেক দিন থেকেই সেখানে ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল। এখন মানুষ কম আসায় বিক্রি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, পর্যটক বাড়লে তাদের ব্যবসাও বাড়বে। কিন্তু পুরোনো অবকাঠামো, বিনোদনের ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক পর্যটক দ্বিতীয়বার আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
দর্শনার্থী সাইদুল ইসলাম বলেন, আগে ছুটির দিনগুলোতে মধুটিলায় অনেক মানুষের সমাগম হতো। এখন সেই চিত্র নেই। দীর্ঘদিন ধরে নতুন কোনো উন্নয়ন বা বিনোদনসুবিধা যুক্ত হয়নি। তার ওপর প্রায়ই বন্যহাতির পাল পার্কে ঢুকে পড়ে। সব মিলিয়ে পার্কটির আকর্ষণ কমে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো ঘুরতে আসার আগ্রহ পাই না।
তবে শুধু দরপত্র আহ্বান কিংবা উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নেই মধুটিলার সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা। তাদের মতে, পর্যটকদের নিরাপত্তা, অবকাঠামোর সংস্কার, আধুনিক বিনোদন-সুবিধা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ইজারার শর্ত ও সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের বাস্তবসম্মত হিসাবও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

 উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে, বলছে বন বিভাগ
মধুটিলা ইকোপার্কের রেঞ্জার আব্দুল করিম বলেন, পার্কের উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। আগের দরপত্র আহ্বানে কাঙ্ক্ষিত ইজারাদার পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া অংশগ্রহণকারীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রেও জটিলতা ছিল। এ কারণে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। 
শেরপুরের সহকারী বন সংরক্ষক সাদেকুল ইসলাম খানের ভাষ্য, পার্ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব ইজারাদারের। পার্কে জনবলসংকট রয়েছে। এরই মধ্যে কিছু সংস্কারকাজ হয়েছে। সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, লেক খননসহ অন্যান্য উন্নয়নকাজের জন্য একটি ডিপিপি তৈরির কাজ চলছে।
 

আরও পড়ুন

×