ঢাকা শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

এসপিইউএস-সমকাল গোলটেবিল বৈঠক

স্থানীয় নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সব স্তরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যুক্ত করতে হবে

ভোটার ও প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণে সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে

স্থানীয় নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সব স্তরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যুক্ত করতে হবে
×
×

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টাইমস মিডিয়া ভবনের সমকাল কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় সরকার: প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিতে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৪ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় সরকার গড়তে দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে প্রার্থিতা এবং নির্বিঘ্নে ভোট প্রদানে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের জন্য গোপন ব্যালটে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে সুযোগ আছে, কেন্দ্রের নিচতলায় তারা যেন ভোট দিতে পারেন, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পরিবার থেকে শুরু করে পদে পদে প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে সব জায়গায় সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় সরকার: প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিতে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন। 

সম্প্রীতি প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা (এসপিইউএস) ও সমকাল যৌথভাবে এ আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল দি ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমস (আইএফইএস) এবং সুইডেন দূতাবাস।

সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, দেখেন, বাংলাদেশে জনশুমারির কথা বলছি। ২০২২ সালে সর্বশেষ জনশুমারিতে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দেওয়া হয়েছে ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। ধরলাম ১৭ কোটি। সেখানে শিশুর সংখ্যা ৫ কোটি ৮৭ লাখ, কিশোর ৩ কোটি ৩৮ লাখ, প্রাপ্তবয়স্ক ১১ কোটি ১১ লাখ, প্রবীণের সংখ্যা ১ কোটি ৫৭ লাখ। যোগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ২২ কোটি। দেখেন, কোথায় প্রায় ১৭ কোটি, আর কোথায় ২২ কোটি! এই যে আমাদের ৫৫ বছরের একটা বাংলাদেশে আমরা আমাদের জনশুমারিকে ঠিকমতো নির্ণয় করতে পারি না বা করি না। কারণ আমি যে নিম্ন-মধ্যবিত্ত দেশের নাগরিক– এটা থেকে উঠতে গেলে আমাকে মধ্যম আয়ের দেশ দেখাতে হবে। এর আগে যে সরকার ছিল; পৃথিবীকে মধ্যম আয়ের দেশ দেখানোর জন্য জনসংখ্যাকে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাথাব্যথার জন্য মাথাটাকে কেটে সমাধান করলেন। আমি সাধারণ নাগরিক হিসেবে যদি আমার নামটা জনসংখ্যার খাতা থেকে বাদ যায়, তাহলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নাম তো বাদ যেতেই পারে। আমি কাউকে আহত করার জন্য বলছি না। আমি একটা পরিসংখ্যান তুলে ধরলাম। এখন ২২-এর বিবিএস বলেছে, ৪৬ দশমিক ২ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। জনশুমারি-২২ এ বলেছে, এ সংখ্যা ২৩ দশমিক ৬২ লাখ জনসংখ্যা প্রতিবন্ধী।   

নিলোফার চৌধুরী আরও বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন না হলে এসডিজি অর্জন হবে না। সবখানে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধীরা যেন রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও লক্ষ্য রাখতে হবে। বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীবান্ধব সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তরিকভাবে তাদের জন্য কাজ করছেন। কিন্তু সেটা সবাইকে ধারণ করতে হবে। 

বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য বিথীকা বিনতে হোসাইন বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতা বাড়ানো হয়েছে। টয়লেটগুলো প্রতিবন্ধীবান্ধব করার কথা বলা হয়েছে। যেসব ভবনে প্রতিবন্ধীবান্ধব সুবিধা থাকবে না, সেসব ভবন বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি দেশের বিত্তশালীদেরও প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের মানুষ যদি সরকারকে সহযোগিতা করে তিন বছর পর এটার ফল পাওয়া যাবে। 

সম্প্রীতি প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি তামজিদা পারভীন সীমা বলেন, ‘প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব না। আমরা বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করছি। ৫০ জন অ্যালামনাই তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।’ 

মূল প্রবন্ধে দি ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেকটোরাল সিস্টেমসের (আইএফইএস) কনসালট্যান্ট মীর মোশাররফ হোসেন বলেন, স্থানীয় সরকারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে নতুন করে শুরু করতে হবে না। আইনি ভিত্তি, প্রতিষ্ঠান ও অংশগ্রহণের সুযোগ যথেষ্ট রয়েছে। প্রধান ঘাটতি বাস্তবায়ন, প্রবেশগম্যতা, প্রতিনিধিত্ব, সমন্বয় ও জবাবদিহিতে। এখানে দেখতে হবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমানভাবে অংশ নিতে পারছেন কিনা, তাদের মত স্থানীয় পরিকল্পনা ও বাজেটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে কিনা এবং সেই মতামতের পরিণতি সম্পর্কে তারা জানতে পারছে কিনা। লক্ষ্য রাখতে হবে এমন স্থানীয় শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কেবল উন্নয়নের সুবিধাভোগী নন; বরং নিজেদের জীবন ও সমাজকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তেরও সমান অংশীদার হতে পারেন।

বাংলাদেশ ফিমেল ডিফ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক সাফিকা সাইফ রুহি বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষ নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। তাদের কথা বলার জায়গা নেই। শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কোথাও কথা বলতে চাইলে দেখা যায় সেখানে ইশারা ভাষার কেউ নেই। অথচ এটা প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার।

বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মো. বদিউল আলম বলেন, আইনে যে অধিকারগুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 

সোসাইটি অব দ্য ডিফ অ্যান্ড সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজারের নির্বাহী পরিচালক হাসিবা হাসান জয়া বলেন, দেশের প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী। ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষের জন্য ইশারা ভাষা দরকার। জন্মের পর শিশু কানে শুনছে কিনা, এক বছরের মধ্যে নিশ্চিত হওয়া দরকার। 

জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থার সভাপতি আব্দুল হাই বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শারীরিকভাবে দুর্বল। কেউ তাদের গুরুত্ব দিতে চায় না। 

সাইটসেভার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশ্বের অনেক দেশে সাংবিধানিক অধিকার আছে। প্রচলিত ব্যবস্থার সংস্কার করে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা, সেটা দেখা দরকার। যে কোনো ভবন ও রাস্তা নির্মাণের সময় বৈশ্বিক মান বিবেচনায় নেওয়া উচিত। স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিশেষ সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে একটি পৃথক বরাদ্দও রাখা যেতে পারে। 

অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের ইনক্লুসিভ লিড তসলিম জাহান বলেন, নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।  
বিস্ক্যানের নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব বলেন, সব জায়গায় প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতা তৈরি করতে হবে। অনেকে মনে করেন একজন ভোট না দিলে কী হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। দলগুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অঙ্গসংগঠন করতে পারে। 

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শেখ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেট ছাড়া প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন সম্ভব না। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক দোভাষী ও ব্রেইল রাখা প্রয়োজন। 

ডিজঅ্যাবল্ড চাইল্ড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন জাহান বলেন, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, এ জন্য নির্বাচন কমিশন প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে। পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য যেমন সংরক্ষিত আসন রয়েছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও তেমনটা থাকতে পারে। 
ফ্রেন্ডশিপের উপমহাব্যবস্থাপক নুসরাত জেরিন বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হতে পারলে কাজ করার পাশাপাশি নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারবেন। 

সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের সমন্বয়ক রাশিদুল আযম রাসেল বলেন, বিদ্যমান ইউনিয়ন পরিষদ আইনে কোথাও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কথা বলা নেই। এই আইনের সংস্কার প্রয়োজন। ১৩টি কমিটি আছে, কিন্তু সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কোনো কমিটি নেই। জেলা প্রশাসকের সম্মতি নিয়ে এ  ধরনের কমিটি গঠন করা যেতে পারে। জন্মনিবন্ধনের ফরমেও কোথাও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির তথ্য নেই। 

জাতীয় প্রতিবন্ধী নারী পরিষদের সভাপতি নাসিমা আক্তার বলেন, ‘প্রতিবন্ধী নারী হিসেবে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি। বেশির ভাগ পরিবার প্রতিবন্ধী সন্তানকে ভোটার করতে চায় না। এখানে জনসচেতনতা ও প্রচার দরকার।’ 

আইএফইএস বাংলাদেশের সিনিয়র কান্ট্রি ডিরেক্টর পল গুরেন বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আদায়ে আমরা সোচ্চার হবো।  সবাই মিলে এই কাজটা করতে হবে। কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। আরও বক্তব্য দেন এসপিইউএসের অ্যালামনাই মোছা. কাজল আক্তার।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। ইশারা ভাষায় ছিলেন মো. রাব্বি হাসান নাঈম। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে আইএফইএসের কান্ট্রি ডিরেক্টর রুমানা আমিন আর্চি, প্রোগ্রাম ম্যানেজার সৈকত শুভ্র আইচ, সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার শাওনি ইমাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 

আরও পড়ুন

×