ঢাকা শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

পরীমণির জামিন, আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের হুমকি-গালাগাল

১১ দেহরক্ষীর ধাক্কাধাক্কিতে মাথা ফাটল বিচারপ্রার্থীর

পরীমণির জামিন, আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের হুমকি-গালাগাল
×
×

ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে পরীমণি। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা সংগৃহীত

 সমকাল ও আদালত প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

আদালতে জামিন নিতে আসা চিত্রনায়িকা পরীমণির দেহরক্ষীদের বিরুদ্ধে এক বিচারপ্রার্থীকে মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সাংবাদিকদের হত্যার হুমকি, মারধর, গালাগাল, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া এবং অপদস্থ করার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে এসব ঘটনা ঘটে। 

আবাসন ব্যবসায়ী ও ঢাকা বোট ক্লাবের সদস্য নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর গতকাল আদালতে আত্মসমর্পণ করেন পরীমণি। পরে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান ৫০০ টাকা মুচলেকায় তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। 

আদালতের প্রাঙ্গণে পরীমণির দেহরক্ষীর আঘাতে মাথা ফেটে যাওয়ার অভিযোগ করেন সুজন চন্দ্র নামের এক বিচারপ্রার্থী। তাঁর বড় ভাই বলেন, জমিসংক্রান্ত মামলায় তাঁরা আদালতে এসেছিলেন। দুই ভাই আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় পরীমণির দেহরক্ষীরা তাঁদের ধাক্কা দেন এবং সুজনের মাথায় আঘাত করেন। এতে তাঁর মাথা থেকে রক্ত বের হতে থাকে।
পরে সুজনের ভাই সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আদালতে এসেছিলাম। এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নায়িকা পরীমণির নিরাপত্তারক্ষীরা ধাক্কা দিয়ে আমার ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।’
গত বুধবার পরীমণির জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আদালত। গতকাল আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দেহরক্ষীদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকার আদালতে হাজির হন পরীমণি। 

প্রথমে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে গাড়িতেই বসে ছিলেন পরীমণি। তাঁকে ঘিরে ছিলেন দেহরক্ষীরা। আশপাশের মানুষের চলাচলও তাদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে দেখা যায়। সাধারণ পোশাকে আরও কয়েকজনকে পরীমণিকে ঘিরে রাখতে দেখা যায়। তিনি আত্মসমর্পণ করবেন জেনে অনেক সাংবাদিক আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় জমান।
বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে গাড়ি থেকে নেমে এজলাসের উদ্দেশে রওনা হন পরীমণি। তাঁর দেহরক্ষীরা তাঁকে ঘিরে এজলাসে নিয়ে যান। এ সময় সাংবাদিকরা ছবি ও ভিডিও করতে গেলে ধাক্কাধাক্কি করেন দেহরক্ষীরা।

শুনানির পর আদালত ভবনের নিচে কয়েকজন সাংবাদিককে মারধর ও তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে পরীমণির দেহরক্ষীদের বিরুদ্ধে। গাড়িতে ওঠার আগে তিনি সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইন রাজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে দূর থেকে হাত ধরে টেনে কাছে নিয়ে গালিগালাজ করেন। উপস্থিত সাংবাদিকরা এর প্রতিবাদ জানান।
উপস্থিত সাংবাদিকরা জানান, লিফটে ওঠার সময় ভিডিও করতে গেলে রাজুর মোবাইল ফোন কেড়ে নেন পরীমণি। পরে রবিউল হোসাইন রাজু টান দিয়ে তা ফিরিয়ে নেন। পরে গাড়িতে ওঠার সময় রাজুকে হেনস্থা করেন।

সাংবাদিকরা জানান, আদালত থেকে বের হওয়ার সময় পরীমণিকে আবার ঘিরে রাখেন তাঁর দেহরক্ষীরা। সাংবাদিকরা ছবি তুলতে ও ভিডিও করতে গেলে ধাক্কাধাক্কি করেন তারা। 
জানতে চাইলে সাংবাদিক রবিউল হোসাইন রাজু বলেন, ‘পরীমণি আদালতে এলে আমরা সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করি। লিফটে ওঠার সময় মেজাজ হারিয়ে পরীমণি আমার ফোনটি কেড়ে নেন। তখন ফোন দিয়ে আমি ভিডিও করছিলাম। পরীমণির নিরাপত্তারক্ষীরা এ সময় আমার ট্রাইপড ভেঙে ফেলেন।’ 
রবিউল হোসাইন বলেন, ‘গায়ে হাত দেওয়ার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। পরীমণি আমার থেকে অনেক দূরে ছিলেন। সেখানকার ভিডিও দেখলেই সব পরিষ্কার হবে। আমার কেড়ে নেওয়া ফোনটি তাঁর হাত থেকে ফিরিয়ে নিয়েছি।’

রবিউল হোসাইন রাজুর একটি হাত ছোটবেলা থেকেই অনেকটা অকেজো, আঙুল নেই। অন্য হাত দিয়ে তিনি ক্যামেরা-ট্রাইপড নিয়ে রিপোর্টিংয়ের কাজ করেন। তাঁর সহকর্মীরা বলেন, রাজুর বিরুদ্ধে পরীমণির শরীরে হাত দেওয়ার অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়। 

মামলার প্রেক্ষাপট
২০২২ সালের ৬ জুলাই আদালতে পরীমণির বিরুদ্ধে এ মামলা করেন আবাসন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন। আদালত অভিযোগের বিষয়ে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর ঢাকা জেলার পরিদর্শক মনির হোসেন আদালতে পরীমণি ও জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেন। তাদের বিরুদ্ধে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। ওই বছরের ১৮ এপ্রিল আদালত দুই আসামিকে ২৫ জুন হাজির হতে সমন জারি করেন। ওই দিন আত্মসমর্পণ করে জামিন পান তারা।
গত বছরের ২৬ জানুয়ারি পরীমণি ও তাঁর কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার আদালত। সে অনুযায়ী বুধবার পরীমণি আদালতে হাজির না হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তবে পরোয়ানা জারির পরদিনই আত্মসমর্পণ করে জামিন পান পরীমণি।

সাংবাদিক হেনস্তায় চার সংগঠনের নিন্দা ও প্রতিবাদ
আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিককে গালাগাল ও দেখে নেওয়ার হুমকিসহ পরীমণির সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীর মাধ্যমে কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলার  তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (এমআরএ), মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স ইউনিটি (এমআরইউ), ডিজিটাল রিপোর্টার্স ফোরাম (ডিআরএফ) এবং ইয়ুথ জার্নাল। গতকাল পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চারটি সংগঠনের পক্ষ থেকে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।

আরও পড়ুন

×