ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

সরেজমিন: সাতক্ষীরা

কাছে থেকে দেখা

কাছে থেকে দেখা
×

বুলবুলে ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ গ্রামের একটি বাড়ি - সমকাল

এম কামরুজ্জামান, সাতক্ষীরা

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:১৬ | আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:২৬

সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। দুপুর ১২টার দিকে শ্যামনগরের সুন্দরবন উপকূলবর্তী নীলডুমুরের প্রমত্ত খোলপেটুয়া নদীর ঘাটে পৌঁছলাম। নদীর ওপারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বদ্বীপ গাবুরা ইউনিয়ন। এখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বাস। কোস্টগার্ড, সিপিপি, বিজিবি, নৌবাহিনীর সদস্যরা বেশ তৎপর। সেনাসদস্যরাও উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিতে পথে। গাবুরার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তারা। খোলপেটুয়া নদীর উত্তাল ঢেউ উপেক্ষা করে নৌকায় পার করে আনা হচ্ছে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষকে। যাদের উদ্ধার করে আনা হচ্ছে তাদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ভয়াল ছোবল থেকে প্রাণে বাঁচার আকুতি। কেউ  কোলের শিশুটি নিয়ে, কেউবা বাড়ির হাঁস-মুরগি নিয়ে দলে দলে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছে।

উত্তাল খোলপেটুয়া নদী পার হয়ে গাবুরা এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, স্থানীয় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে বেশকিছু মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। বেলা যতই গড়াচ্ছে, আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে মানুষ বেশি ছুটছে। সন্ধ্যার আগেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ভরপুর। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে পা রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই।

সন্ধ্যার পর কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে দেখি নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি একই সঙ্গে অবস্থান করছে। সবার মধ্যে বাঁচার চেষ্টা। কারও প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। সবার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আতঙ্ক। কোথাও বিদ্যুৎ নেই, চারদিকে অন্ধকার। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া আর বিদ্যুৎ চমকে প্রকৃতি যেন জানান দিচ্ছে 'বুলবুল' আসছে। রাত ২টা পর্যন্ত থেমে থেমে ভারি ও মাঝারি বৃষ্টি। সেসঙ্গে দমকা হাওয়া।

সুন্দরবনসংলগ্ন মুন্সীগঞ্জে বেসরকারি একটি সংস্থার গেস্ট হাউসে রাতে অবস্থান নিলাম আমরা অনেকে। তৃতীয় তলায় গুমোট অন্ধকার, শোঁ শোঁ শব্দ। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় বন্ধ, মাঝে মাঝে পাওয়া যাচ্ছে।

রাত প্রায় ৩টা। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ভয়াল থাবা তখন শুরু। প্রবল শক্তি নিয়ে বুলবুল সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় আছড়ে পড়ছে। ভয়ানক দৃশ্য! মনে হচ্ছে বিল্ডিং উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। টানা প্রায় ছয় ঘণ্টা দুর্বিষহ জীবন কেটেছে সাতক্ষীরা উপকূলবর্তী প্রায় ছয় লাখ মানুষের। রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দুর্বল হয়ে পড়ে বুলবুল।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, উপড়ে পড়ে আছে অসংখ্য গাছ। প্রতিটি এলাকার প্রায় সব কাঁচা ঘর ধসে পড়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ির দিকে ছুটছে মানুষ। অনেক বড় গাছ পড়ে আছে বসতবাড়ির ওপর। ঘরের শেষ সম্বলও যেন শেষ। সড়কের ওপর গাছ আর গাছ। রাস্তা দিয়ে হেঁটে সামনের দিকে এগোনোর মতো পরিস্থিতি নেই। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরে দেখে- সব ওলটপালট, কিছুই আগের মতো নেই। তাদের আর্তনাদ, তাদের কান্না থামছে না। কে দেবে কার সান্ত্বনা!

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় সাতক্ষীরা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। উপকূলবর্তী প্রায় ২ লাখ মানুষকে এবার নিরাপদে সরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল তারা। আঘাত হানার আগেই প্রতিটি এলাকায় সচেতন করা হয় মানুষকে। আর এ কারণেই শক্তিশালী বুলবুলের আঘাতে মানুষের প্রাণহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি সাতক্ষীরায়।

প্রায় ২২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, সিপিপি, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকার কারণে কোনো ধরনের প্রাণহানি ছাড়াই বুলবুলের মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। এ মুহূর্তে প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য জরুরি ব্যবস্থা।

আরও পড়ুন

×