ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

বাংলা একাডেমির সেমিনার সিরিজ

চার মনীষীর জীবন, কর্ম নিয়ে আলোচনা

চার মনীষীর জীবন, কর্ম নিয়ে আলোচনা
×

ছবি: সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০১:০২

বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও চিন্তার পরিসরে অনন্য অবদান রাখা চার গুণী স্মরণে শনিবার দিনব্যাপী সেমিনার সিরিজের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। তারা হলেন প্রাবন্ধিক ও লেখক আবদুল হক, কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির, ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর এবং কবি শামসুর রাহমান। একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এ আয়োজনে তাদের জীবন, কর্ম, সাহিত্য ও চিন্তার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন গবেষক, লেখক ও শিক্ষাবিদরা।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন একাডেমির পরিচালক ড. সরকার আমিন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, বাংলা একাডেমির উদ্যোগে শুরু হওয়া সেমিনার সিরিজ শুধু একাডেমির ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও এর কার্যক্রম বিস্তৃত হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের স্মরণীয় সাহিত্যিক ও মনীষীদের নিয়ে আয়োজিত এ আলোচনা ভবিষ্যৎ গবেষণা ও বুদ্ধিবিষয়ক চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। ড. সরকার আমিন বলেন, এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম তাদের সেইসব প্রাজ্ঞ পূর্বসূরির কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে, যারা আমাদের সৃজনশীল ও মননশীল ঐতিহ্যকে গভীরতা ও শক্তি দিয়েছেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কানিজ মওলা বলেন, বাংলা একাডেমির চলমান সেমিনার সিরিজ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে একটি বিস্তৃত উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। আলোচ্য চার মনীষী তাদের সৃষ্টিকর্ম ও চিন্তার গভীরতার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

দিনের প্রথম আলোচনা পর্বে স্মরণ করা হয় প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও অনুবাদক আবদুল হককে। ‘আবদুল হক : জীবন ও রাজনীতি’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম। আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক মাহবুব বোরহান এবং সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসান। বক্তারা বলেন, আবদুল হক বাংলা মননশীল সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নাম। নাট্যসাহিত্য, কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধে তাঁর অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি হেনরিক ইবসেনের নাটক অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাংলা ভাষার একটি তাৎপর্যপূর্ণ সেতুবন্ধন নির্মাণ করেন। তাঁর প্রবন্ধে জাতীয়তাবোধ, মুক্তচিন্তা ও ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গির যে প্রকাশ ঘটেছে, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের দিনলিপি এ অঞ্চলের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির এক মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

দ্বিতীয় পর্বে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির। ‘মহল্লার অন্তঃশব্দ : শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্যে মায়া, স্মৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষক ও সাহিত্য সমালোচক সৈকত আরেফিন। আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম এবং সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সুমন রহমান। বক্তারা বলেন, শহীদুল জহির বাংলা কথাসাহিত্যে এক স্বতন্ত্র শিল্পভাষার নির্মাতা। পুরান ঢাকার অলিগলি থেকে বাংলার গ্রামীণ জনপদ– সবখানেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন মানুষের অন্তর্গত জীবন ও সময়ের স্পন্দন। ভাষা ও বর্ণনাশৈলীর অভিনবত্বের মধ্য দিয়ে তিনি জাদুবাস্তবতার এক অনন্য সাহিত্যভুবন নির্মাণ করেছেন, যেখানে বাস্তবতা ও কল্পনার মেলবন্ধনে উঠে এসেছে বাংলার মানুষ ও সমাজের গভীর সত্য।

বিকেলে অনুষ্ঠিত তৃতীয় আলোচনায় স্মরণ করা হয় ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমরকে। ‘বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিক চিন্তা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষক আফজালুল বাসার। আলোচনায় অংশ নেন লেখক ফয়জুল হাকিম। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। বক্তারা বলেন, বদরুদ্দীন উমর কেবল একজন ইতিহাসবিদ নন, তিনি এ উপমহাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজচিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্যকার। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিকাশের নানা অধ্যায় তিনি বিশ্লেষণ করেছেন গভীর নিষ্ঠায়। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আজীবন সংগ্রাম তাঁকে একটি অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

দিনের শেষ পর্ব উৎসর্গ করা হয় কবি শামসুর রাহমানকে। ‘কবি শামসুর রাহমানের কবিতার শৈলী’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক ও সমালোচক তারানা নূপুর। আলোচনায় অংশ নেন কবি জহির হাসান এবং সভাপতিত্ব করেন কবি ও প্রাবন্ধিক ফয়েজ আলম। আলোচকরা বলেন, শামসুর রাহমান বাংলা কবিতার আধুনিকতার অন্যতম প্রধান নির্মাতা। তাঁর কবিতায় যেমন ব্যক্তিমানসের সূক্ষ্ম অনুভব ধরা পড়ে, তেমনি দেশ ও সময়ের রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতাও গভীর শিল্পরূপ লাভ করে। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কবিতায় কেবল ইতিহাস নয়, সাহস, সৌন্দর্য ও মানবমুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। ক্রমাগত নবায়নশীল কাব্যভাষা ও বিষয়বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা কবিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

দিনব্যাপী এ সেমিনার সিরিজের বিভিন্ন পর্ব সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সায়েরা হাবীব এবং সহপরিচালক  ড. মাহবুবা রহমান। আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা মনে করেন, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এই চার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

আরও পড়ুন

×