আলজাজিরার প্রতিবেদন
নথিহীনদের বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে ভারত
ফাইল ছবি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০০:৪৯
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর তথাকথিত নথিবিহীন মুসলিমদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ক্র্যাকডাউন শুরু হয়েছে। ফলে রাজ্যটির সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় তীব্র উত্তেজনা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
আলজাজিরার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১০ কোটি মানুষের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে মাসখানেক আগে প্রথমবার ক্ষমতায় আসে নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি। এর পরপরই নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কথিত অনুপ্রবেশকারীদের তাড়াতে ‘শনাক্ত, বাদ দেওয়া ও নির্বাসন’ নীতি ঘোষণা করেন। তবে এই অভিযানে কেবল মুসলিমদের নিশানা করা হচ্ছে। কারণ, বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের কারণে হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীরা এর আওতামুক্ত।
দেশটির সুপ্রিম কোর্টের এক রায়কে হাতিয়ার করে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক ব্যক্তিদের সরাসরি সীমান্তে পাঠানো হচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, রাজ্যের সব জেলায় অস্থায়ী আটককেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে বহিষ্কার বা জেলাভিত্তিক আটককেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে এবং আরও ৮৩৬ জনকে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
সীমান্তে চরম মানবিক সংকট
কলকাতা থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরের হাকিমপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত চৌকিতে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ মানুষ ভিড় করছেন। কাঁচা ইট ও সিমেন্টের তৈরি অসমাপ্ত ভবনের ভেতরে প্রচণ্ড গরম আর আর্দ্রতায় খাওয়ার পানির অভাবে এসব কেন্দ্র যেন একেকটি নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের হামলা ও পুলিশি হয়রানির ভয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করছেন।
দালালের মাধ্যমে সীমান্ত পার হয়ে কলকাতায় রাজমিস্ত্রির কাজ করা সাতক্ষীরার রাইসুল ইসলাম দুই বছর ধরে সপরিবারে সেখানে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু আমাদের সন্তানদের একটি ভালো জীবন দেওয়ার জন্য ভারতে এসেছিলাম। কিন্তু একশ্রেণির মানুষের অবিরাম হয়রানি ও অপমান আমাদের তিক্ত স্মৃতি নিয়ে ফিরতে বাধ্য করেছে।’ একইভাবে পাঁচ বছর রাজমিস্ত্রির কাজ করা মিরাজুল গাজীও বাড়িওয়ালার তাড়া খেয়ে ও স্থানীয়দের হামলার আশঙ্কায় সবকিছু ফেলে সীমান্তে এসে আশ্রয় নিয়েছেন।
ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক টানাপোড়েন
২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে এমনিতেই টানাপোড়েন চলছিল। পশ্চিমবঙ্গের এই জোরপূর্বক পুশইন নীতি সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, ৪ জুনের পর থেকে বিএসএফের অন্তত ১৮টি পুশইনের চেষ্টা তারা রুখে দিয়েছে, যেখানে ১৮০ জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিল।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পুশইন বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, এই বিষয়ে দিল্লিকে ইতোমধ্যে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি দ্বিপক্ষীয় ও বিদ্যমান আইন মেনে জাতীয়তা যাচাইয়ের আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করেন, এই কার্যক্রম দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেছেন, অবৈধ বিদেশিদের ক্ষেত্রে ভারতীয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দুই হাজার ৮০০ সন্দেহভাজন বাংলাদেশির তালিকা ঢাকার কাছে পাঠানো হয়েছে। এই যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হলে তাদের ফেরত পাঠানো হবে।
ধর্মীয় মেরূকরণ ও মানবাধিকার হরণ
এই বিতাড়ন প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যেও গভীর সামাজিক ও ধর্মীয় মেরূকরণ তৈরি করছে। এর আগে বিজেপিশাসিত আসাম রাজ্যেও একই কায়দায় বহু মানুষকে সীমান্তের শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভারতের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন একে অবৈধ আখ্যা দিয়ে আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এতে ভুলবশত ভারতীয় মুসলিমদের বহিষ্কার ঠেকানো সম্ভব হবে।
মানবাধিকারকর্মী তিস্তা শীতলবাদ অভিযোগ করেন, পুলিশ কোনো নিয়ম না মেনে নির্বিচারে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে পণ্য হিসেবে সীমান্ত পার করার চেষ্টা করছে। সমালোচকদের মতে, বিজেপি সরকারের এই অভিবাসীবিরোধী নীতি মূলত ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ। এর মূল লক্ষ্য দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে একটি কট্টর হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।
