বিএনপির ৮২ কমিটির ৭২টিই মেয়াদোত্তীর্ণ
ফাইল ছবি
কামরুল হাসান
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৫:১৬
জাতীয় নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও সাংগঠনিক তৎপরতায় পিছিয়ে পড়ছে বিএনপি। সারাদেশে ৮২ কমিটির মধ্যে এখন ৭২টি মেয়াদোত্তীর্ণ। নীতিনির্ধারকরা ব্যস্ত রাষ্ট্র পরিচালনায়। জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ব্যস্ত এমপি-মন্ত্রীদের নিয়ে। লবিং-তদবিরেও ব্যস্ত অনেকে। শিগগির এ অবস্থা থেকে বের হতে না পারলে সামনে সরকার ও দলের জন্য কঠিন সময় তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
শুধু সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি নয়; সারাদেশে বিএনপির থানা-উপজেলা এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিও এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। বরিশাল, খুলনা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের বেশ কয়েক নেতা জানান, দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি সাংগঠনিক তৎপরতায় ভাটা পড়েছে। এতে সরকার গঠনের সাড়ে তিন মাসের মাথায় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন এক সময়ের ত্যাগী ও যোগ্য নেতারা।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, মাত্র তো আমরা ক্ষমতায় এসেছি। একটু গুছিয়ে খুব শিগগিরই সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করা হবে।
জানা গেছে, সারাদেশে বিএনপির সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর মধ্যে ৪৯টি আহ্বায়ক কমিটি এবং ৩১টিতে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি। এসব কমিটির মধ্যে মেয়াদ রয়েছে মাত্র ৮ জেলা ও মহানগর কমিটির। ৭২টি কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। কমিটি স্থগিত রয়েছে শেরপুর জেলা কমিটির। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে আরও আগে।
দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতিটি জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ দুই বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে কাউন্সিলে নতুন কমিটি গঠন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যর্থ হলে যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে আরও তিন মাস সময় নিতে পারবে। এই সময়েও কমিটি গঠনে ব্যর্থ হলে পূর্ববর্তী কমিটি বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে। এরপর কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের শর্তে তিন মাসের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেবে কেন্দ্র। যদি আহ্বায়ক কমিটিও ব্যর্থ হয়, সে ক্ষেত্রে কেন্দ্র কমিটি গঠন করে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
বিএনপির নেতারা জানান, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে দল ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি কাউন্সিল প্রক্রিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে সারাদেশে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন। এজন্য বেশির ভাগ জেলা কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে গঠন করা হয় আহ্বায়ক কমিটি। কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে বছরের পর বছর পার হলেও নতুন কমিটি আর হয়নি।
গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ২০১৭ সালের কমিটি দিয়েই চলছে। আহ্বায়ক কমিটির মতো অনেক জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটিও বছরের পর বছর মেয়াদহীন। ২০১৭ সালে গঠিত নড়াইল, কিশোরগঞ্জ ও কক্সবাজার জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ রয়ে গেছে। আবার ২০১৮ সালের পর কয়েকটি জেলায় কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন হলেও বেশির ভাগেরই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
ঢাকা ও ফরিদপুরে একটিরও মেয়াদ নেই
এ দুই বিভাগে বিএনপির সাংগঠনিক ইউনিট ১৭টি। একটিরও কমিটির মেয়াদ নেই। গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আফরোজা খানম রিতাকে আহ্বায়ক করে এবং অন্য ৬ জনকে সদস্য করে মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর প্রায় চার মাস পর মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আংশিক আহ্বায়ক কমিটিকে বর্ধিত করে ৬১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। সেটিও এখন মেয়াদোত্তীর্ণ।
গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ এ কমিটির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান সিনহা সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করেছেন। অন্যদিকে সংগঠনের সদস্য সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ দল থেকে বহিষ্কৃত। ঢাকা জেলা কমিটি গঠন করা হয় ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর। মেয়াদোত্তীর্ণ গুরুত্বপূর্ণ এই জেলা কমিটির কার্যক্রমও তেমন চলছে না। একইভাবে চলছে ২০২২ সালে গঠিত নরসিংদী জেলা আহ্বায়ক কমিটি।
চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় একটি ছাড়া সব মেয়াদোত্তীর্ণ
এ দুই বিভাগে ১৫টি সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাদে সব জেলা কমিটিই মেয়াদহীন। ২০২২ সালে চাঁদপুর ও রাঙামাটিতে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন হলেও সেসবের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ২০১৭ সালে কক্সবাজার জেলা কমিটির সভাপতি করা হয় শাহজাহান চৌধুরীকে এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয় শামীম আরা স্বপ্নাকে।
২০২৫ সালের ৯ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। তবে এ কমিটি গঠনের আগে কাউন্সিল করার একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোন্দলের কারণে তা হয়নি। পরে তারেক রহমান বর্তমান কমিটির ঘোষণা দেন।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘর্ষের জেরে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কমিটি বিলুপ্ত করা হলেও এখন পর্যন্ত নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর গোলাম আকবর খন্দকারকে আহ্বায়ক করে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির ৪৪ সদস্যের ওই আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। কোন্দলের কারণে এই জেলা কমিটি ২০১৪ সালের মার্চের পর আর কখনও পূর্ণাঙ্গ হতে পারেনি।
রাজশাহী ও খুলনায় ৭টির মেয়াদ নেই
রাজশাহী বিভাগে ৯টি সাংগঠনিক ইউনিটের ২টি জেলা বাদে সবই মেয়াদোত্তীর্ণ। রাজশাহী বিভাগের ৯টি সাংগঠনিক ইউনিটের মেয়াদ নেই একটিরও। ২০১৯ সালের ৮ মে রুমানা মাহমুদকে সভাপতি এবং সাইদুর রহমান বাচ্চুকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ এই কমিটি পুনর্গঠনের জন্য গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি আমিরুল ইসলাম আলীমকে আহ্বায়ক করে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বেশ কয়েকজন বিতর্কিতকে অন্তর্ভুক্ত করায় তখন তৃণমূলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রায় দেড় বছর সময় পার হলেও কাউন্সিল আয়োজনের লক্ষণ দেখা যায়নি।
খুলনা বিভাগের ১১টি জেলার মধ্যে গত বছর যশোর ও খুলনা মহানগর কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এর আগের বছর ২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গা জেলা কমিটির কাউন্সিলে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এর বাইরে অন্য সব জেলা কমিটি রয়েছে মেয়াদের বাইরে।
বরিশালে সংগঠনের অবস্থা নড়বড়ে
৮টি সাংগঠনিক ইউনিট কমিটির মধ্যে একমাত্র পটুয়াখালী জেলার মেয়াদ রয়েছে। গত বছরের ৩ জুলাই এই জেলাতে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন কমিটি স্থগিতের পর গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বরগুনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ডিসেম্বরে জেলায় ৬টি উপজেলা, ৪টি পৌর কমিটি, প্রতিটি পৌরসভায় ৯টি; মোট ৩৬টি ওয়ার্ড কমিটি; ৪২টি ইউনিয়ন কমিটি ও প্রতিটি ইউনিয়নে ৯টি; ৩৭৮টি ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। ৬ মাসের অধিক সময় পার হলেও তৃণমূলের এসব কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
জেলা সদস্য সচিব হুমায়ুন হাসান শাহীন বলেন, কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা পেলেই সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। ঝালকাঠি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ২০২০ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাকি জেলা কমিটিও আছে আহ্বায়ক কমিটির ব্যানারে।
রংপুর ও সিলেটের অবস্থাও ভালো নয়
রংপুর বিভাগে ১০টি এবং সিলেট বিভাগে ৫টি সাংগঠনিক ইউনিট। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও জেলা কমিটি গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত হয়। এর বাইরে ২০২২ সালে দিনাজপুর, ২০২৩ সালে সৈয়দপুর জেলা বিএনপির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এসব জেলা কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে।
সিলেট বিভাগের মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বরে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ এই কমিটি এখন পর্যন্ত কাউন্সিলের প্রস্তুতিমূলক কোনো কাজ শেষ করতে পারেনি। ২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়, সেটিই চলছে। ২০২২ ও ২৩ সালে সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ওইসব জেলা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
ময়মনসিংহের মেয়াদ আছে দুটির
এ বিভাগে ৬টি সাংগঠনিক ইউনিট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার মধ্যেই শেরপুর জেলা বিএনপির ৪১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি স্থগিত করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর জেলা আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় সংঘাত-সংঘর্ষের জের ধরে ওই কমিটি স্থগিত করা হলেও এখন পর্যন্ত কার্যক্রম শুরুর অনুমতি পায়নি। এই বিভাগে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর ও ৩১ সেপ্টেম্বর জামালপুর ও নেত্রকোনা জেলা বিএনপির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই দুই জেলা ছাড়া আর কোনো জেলা কমিটির মেয়াদ নেই।
