ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ঐতিহ্য মেনে চট্টগ্রামের এক মন্দিরে কুমারী পূজা

ঐতিহ্য মেনে চট্টগ্রামের এক মন্দিরে কুমারী পূজা
×

চট্টগ্রামের একটি মন্দিরে ঐতিহ্য অনুযায়ী শনিবার কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়-সমকাল

চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২০ | ০৯:৩১ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২০ | ০৯:৩৮

করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার কুমারী পূজা আয়োজন না করার নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। তবে আয়োজন না করার নির্দেশনা থাকলেও চট্টগ্রামের একটি মন্দিরে ঐতিহ্য অনুযায়ী শনিবার কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়। 

চট্টগ্রামের পাথরঘাটার ‘শান্তনেশ্বরী মাতৃমন্দিরে’ কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়। ঐতিহ্যের আকর্ষণীয় এই পূজা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে অনেক ভক্ত ছুটে আসেন মন্দির প্রাঙ্গণে। স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সীমিত সংখ্যক ভক্তকে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দিয়ে সম্পন্ন করা হয় কুমারী পূজা। পূজা শেষে দফায় দফায় কুমারী মা’কে দর্শনের সুযোগ পান ভক্তরা। 

স্বাস্থ্যবিধি মেনে অঞ্জলি, উলুধ্বনি, মন্ত্রোচ্চারণসহ নানা আয়োজনে শনিবার পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী এই ‘শান্তনেশ্বরী মাতৃমন্দিরে’ ‘কালসন্দর্ভা’ নামে পূজিত হন কুমারী রূপী দেবী। নগরের পাথরঘাটার হরচন্দ্র মুন্সেফ লেনের এই মাতৃমন্দিরের শ্রীমৎ শ্যামল সাধু মোহন্ত মহারাজের পৌরহিত্যে কুমারী পূজার প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা হয়। কুমারী পূজায় পূজারি হিসেবে ছিলেন পণ্ডিত শম্ভু ভট্টাচার্য্য ও তন্ত্রধারে ছিলেন দেবব্রত নাথ জুয়েল। এবারের পূজায় ‘কুমারী মা’র আসনে বসে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী শ্রেয়া বিশ্বাস। ধর্মীয় মতে, বয়স ভেদে কুমারীর নাম ভিন্ন হয়। এবার নয় বছরের শ্রেয়া পূজিত হন ‘কালসন্দর্ভা’ নামে। 

মন্দিরের পৌরহিত শ্রীমৎ শ্যামল সাধু বলেন, ‘দুর্গাপূজার মহা অষ্টমী পূজাতে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এটি আকর্ষণীয় ও ঐতিহ্যের পূজা। হিন্দু শাস্ত্রমতে ১ থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা যেকোনো বর্ণের ও গোত্রের কুমারীকে পূজা করার কথা উল্লেখ আছে। বয়সভেদে কুমারীর নাম ভিন্ন হয়। দুর্গার আরেক নাম কুমারী। কুমারী আদ্যাশক্তি মহামায়ার প্রতীক। নারীর যথাযথ মর্যাদা অধিষ্ঠিত করতে কুমারী পূজা করা হয়। মাটির প্রতীমায় যে দেবীর পূজা করা হয়, তারই বাস্তব রূপ কুমারী পূজা। কুমারী এক হাতে অভয় ও অন্য হাতে বর প্রদান করেন। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে সীমিত পরিসরে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।’ 

চট্টগ্রামের একটি মন্দিরে ঐতিহ্য অনুযায়ী শনিবার কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়-সমকাল 

কুমারীর আসনে বসা শ্রেয়া বিশ্বাস নগরের দেওয়ানজী পুকুর পাড় এলাকার শ্যাম কুমার বিশ্বাস ও তনিমা বিশ্বাস টিনার মেয়ে। মেয়ে কুমারীর আসনে বসতে পারায় দারুণ খুশি শ্রেয়ার বাবা-মা সহ স্বজনরা। শ্রেয়ার মা তনিমা বিশ্বাস বলেন, ‘মেয়েকে কুমারীর আসনে দেখা আমাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের। সবার ভাগ্যে এমন সুযোগ আসে না। মেয়ের এমন প্রাপ্তির দিনে আমরা অনেক আনন্দিত। সবাই আমার মেয়ের জন্য আশীর্বাদ করবেন।’ কুমারী পূজায় সহযোগিতায় ছিলেন মন্দিরের পরম বৈষ্ণব বাবলু মিত্র, রুবেল আচার্য, সুভাষ বিশ্বাস, বাবলা চক্রবর্তী ও জুয়েল দাশ প্রমুখ।  

চট্টগ্রাম কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসীন সমকালকে বলেন, ‘কুমারী পূজা করার বিষয়ে কেউ আমাদেরকে জানায়নি। ধর্মীয় আচার হওয়ায় আমরা কাউকে বাধাও দেইনি। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থায় ছিল। মন্দিরে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানার বিষয়টি তদারকি করতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একসাথে অনেক ভক্তকে মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।’ 

চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার সমকালকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে পূজার মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মাস্ক ছাড়া মণ্ডপে প্রবেশ না করতে নির্দেশনা দেওয়া আছে। প্রতিটি মণ্ডপের প্রবেশ পথে হাত ধোঁয়ার ব্যবস্থা রাখাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারেও সকলকে বলা হয়েছে। পূজা আয়োজকদের পক্ষ থেকে দর্শনার্থীদের জন্য মাস্কের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই সীমিত পরিসরে ঐতিহ্যের কুমারী পূজা পালিত হয়েছে।’ 

কুমারী পূজার তন্ত্রধারের দায়িত্বে থাকা মাতৃমন্দিরের ভক্ত দেবব্রত নাথ জুয়েল সমকালকে বলেন, ‘কুমারী মাকে দর্শন করতে অনেক ভক্ত সকাল থেকে মন্দির প্রাঙ্গণে ছুটে আসলেও স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্বের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সকাল ৮ টা থেকে ১২টা পর্যন্ত মন্দিরের ভেতরে ভক্তদের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সীমিত ভক্তকে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দিয়ে কুমারী পূজা সম্পন্ন করা হয়। কুমারী পূজা শেষ হওয়ার পর কয়েক দফায় কিছু ভক্তকে কুমারী মাকে দর্শন করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। সরকারিভাবে নির্দেশনা থাকায় মন্দিরে আসা ভক্তদের জন্য মাস্কসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই ঐতিহ্যের কুমারী পূজা সম্পন্ন করা হয়েছে।’ 

এবার করোনা পরিস্থিতিতে কুমারী পূজা আয়োজন না করার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কেনো এই মন্দিরে কুমারী পূজার আয়োজন করা হলো এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেবব্রত নাথ জুয়েল বলেন, ‘এই মন্দিরের একটি আদি পূজা কুমারী পূজা। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা কুমারী পূজার আয়োজন করেছি।’ 

কুমারী পূজায় আসা নগরের নালাপাড়ার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বয়সী শিখা ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘নিজ চোখে কুমারীকে দেখতে পারলে অনেক পূণ্য হয়। অনেক কষ্ট হলেও কুমারীকে দর্শন করতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’

আরও পড়ুন

×