ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামে বিভীষিকা

দায় নিচ্ছে না কেউ, পলাতক ভবন মালিক

দায় নিচ্ছে না কেউ, পলাতক ভবন মালিক
×

চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:৩০ | আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:৪১

চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে তৈরি হচ্ছে ধোঁয়াশা। ওই দুর্ঘটনায় সাত ব্যক্তির প্রাণ গেলেও তার দায় নিচ্ছে না কেউই। দুর্ঘটনার কারণ নিয়েও সরকারি সংস্থাগুলো একে অপরকে দায়ী করে বক্তব্য দিচ্ছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল) বলছে, গ্যাস লিকেজের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেনি। সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে বিস্ফোরণ হতে পারে। আবার বিস্ফোরক অধিদপ্তর বলছে, গ্যাস লিকেজ না হলে বিস্ফোরণ এত ভয়াবহ হতো না। ফায়ার সার্ভিস বলছে, সেপটিক ট্যাঙ্ক গ্যাস চেম্বার হওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ দুর্ঘটনার সময় এটি প্রায় পূর্ণ ছিল। এসব পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে চুপচাপ আছে ভবনটির নকশা অনুমোদন দেওয়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। অথচ ভবনটির অনুমোদিত নকশার বাইরের অংশেই রোববার ঘটেছে দুর্ঘটনা।

গতকাল সোমবার ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য নিয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটি। বাড়ির মালিককে আসামি করে মামলা করেছেন নিহত রিকশাচালক মাহমুদুল হকের স্ত্রী শাহিনা আকতার। তবে বিস্ফোরণের পরপরই ভবন মালিক দুই ভাই পালিয়ে গেছে। ওই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১০ জন।

দুর্ঘটনার কারণ প্রসঙ্গে কর্ণফুলী গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) আ ন ম সালেক বলেন, 'গ্যাসলাইনের ত্রুটি থেকে যে বিস্ফোরণ হয়নি সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত। কারণ লাইনের ত্রুটি থেকে বিস্ফোরণ হলে চুলা অক্ষত থাকত না। বাসায় শুকাতে দেওয়া কাপড়চোপড়ও আগুনে পুড়ে যেত। গ্যাসলাইনের রাইজারও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এখানে আগুনের মাত্রা কম ছিল। বিস্ফোরণের মাত্রা বেশি ছিল। গ্যাসলাইনে সমস্যা থাকলে ঘটত এর ঠিক উল্টোটা।'

তবে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ভবনের রাইজার ও পাইপলাইন খুব পুরনো। পাইপলাইন রাবার দিয়ে মোড়ানোর কথা ছিল। তবে এটি রাবার দিয়ে মোড়ানো ছিল না। তার ধারণা, এখান থেকেই গ্যাস বেরিয়ে তা পাশের রুমে প্রবেশ করেছে। ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক জসিম উদ্দীনও কথা বলেছেন একই সুরে। তিনি বলেন, 'সেপটিক ট্যাঙ্ক পূর্ণ ছিল। সেটিতে গ্যাস চেম্বার হওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। তাদেরও ধারণা গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন !: দুর্ঘটনার কারণ জানতে কেজিডিসিএল গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটিকে এক দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছিল। রোববার দুপুরের পরে গঠিত এ কমিটি কয়েক ঘণ্টার পর সন্ধ্যাতেই তাদের রিপোর্ট পাঠিয়ে দেয় মন্ত্রণালয়ে। অভিযোগ উঠেছে, প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতদের বক্তব্য সেভাবে আমলে না নিয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ যুক্ত করেই দায় এড়ানো রিপোর্ট দেয় কেজিডিসিএল। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কমিটির সদস্য প্রকৌশলী আবু জাহের বলেন, 'দুর্ঘটনার কারণ জানতে তাদের এর চেয়ে বেশি সময়ের প্রয়োজন ছিল না। কারণ গ্যাস লিকেজ থাকলে কেমন দুর্ঘটনা হয় তা তাদের জানা আছে। তারা ঘটনাস্থলও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। কেউ তাদের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে পার পাবে না।

বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে মামলা:  বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় বড়ূয়া ভবনের মালিক দুই ভাইকে আসামি করে মামলা করেছে নিহত ভ্যানগাড়িচালক মাহমুদুল হকের স্ত্রী শাহীনা আক্তার। অবহেলাজনিত মৃত্যু ও ক্ষতিসাধনের অভিযোগ এনে নগরীর কোতোয়ালি থানায় মামলাটি দায়ের করেন তিনি। মামলা হওয়ার কথা স্বীকার করে ওসি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, তারা আসামিকে গ্রেপ্তার করতে তৎপর আছেন। মামলায় কাকে আসামি করা হয়েছে জিজ্ঞেস করলে তিনি তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে, মামলায় ভবন মালিক দুই ভাই অমল বড়ুয়া ও টিটু বড়ুয়ার নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত কয়েকজন সহযোগীকে আসামি করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ আছে বড়ূয়া ভবনটির মালিক টিটু বড়ূয়া ও অমল বড়ূয়া। তাদের খুঁজে পাচ্ছে না কেউ। ভবনটি থেকে ভাড়াটিয়াদের সরিয়ে নিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এ ভবনেরই উপরের তলায় থাকত মালিকরা। কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, 'ভবন মালিকদের খুঁজছি আমরা। কিন্তু তাদের কোনো হদিস পাচ্ছি না। বিস্ফোরণণের প্রকৃত কারণ জানতে হলে তাদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।'

চুপ ছিল সিডিএ: ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মেনে গড়ে ওঠেনি বড়ূয়া ভবনটি। সিডিএর নাকের ডগাতেই অনিয়ম করে ভবন তৈরি করেছে অমল বড়ূয়া ও টিটু বড়ূয়া। পাঁচতলা ভবনটি গড়ে তুলতে যে পরিমাণ জায়গা ছাড়ার কথা ছিল তাও ছাড়েনি মালিকপক্ষ। পার্কিংয়ের স্থানে আবাসিক ভবন তৈরি করেছে তারা। সীমানার বাইরে ভবন বর্ধিত করায় গ্যাসের রাইজারটি ঝুঁকিপূর্ণভাবে ছিল নিচতলার দেয়ালের সঙ্গে। এতে ঘটেছে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

বিস্ফোরণের পর সিডিএর প্রধান পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থলে আসে। তারা ভবনটি নির্মাণে বিল্ডিং কোড না মানার প্রমাণ পান। এ সময় শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, ওই সড়কে যে ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে তা যথাযথ আইন মেনে করা হয়নি। মূল জায়গা ছেড়ে আরও সামনের দিকে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তার জায়গা দখল করেই ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের সেপটিক ট্যাঙ্কে গ্যাস জমেও অনেক সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। যাবতীয় বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ভবনটি কীভাবে অনিয়ম করেও এতদিন বহাল তবিয়তে ছিল- এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

আকার বাড়ল জেলা প্রশাসন কমিটির:  চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির আকার আরও বাড়ানো হয়েছে। পাঁচ সদস্যের কমিটিতে আরও দু'জন যুক্ত হয়েছেন। আগের কমিটি ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ প্রতিনিধি, স্থানীয় কাউন্সিলর এবং কর্ণফুলী গ্যাসের প্রতিনিধি ছিল। গতকাল নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে সিডিএ এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রতিনিধিকে। দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে মতদ্বৈধতা তৈরি হওয়ায় কমিটির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ জেড এম মোরশেদকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'তদন্তের সুবিধার্থে কমিটিতে সিডিএ এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রতিনিধিকে সংযুক্ত করা হয়েছে। যে ভবনে দুর্ঘটনা হয়েছে সেটির অনুমোদন দিয়েছে সিডিএ। আবার বিস্ফোরণ সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখে বিস্ফোরক অধিদপ্তর।'

কী কারণে এমন দুর্ঘটনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে দুর্ঘটনাটি গ্যাসজনিত। তবে এ গ্যাসলাইন থেকে লিকেজ হওয়া নাকি সেপটিক ট্যাঙ্কের তা তদন্ত শেষে বলা যাবে। সাত দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দেবে।

এদিকে বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় নগর পুলিশের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির সদস্যরা গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতদের স্বজনদের বক্তব্য রেকর্ড করেছে। ঘটনাস্থলে এসে কমিটির প্রধান নগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মেহেদী হাসান বলেন, তড়িঘড়ি করে তারা রিপোর্ট দেবেন না। বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে যা যা করা দরকার সবই করা হবে।

আরও পড়ুন

×