হত্যা করেন বাবা, লাশ লুকাতে সাহায্য করেন স্ত্রী ও ছেলে
প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী -সমকাল
পঞ্চগড় প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ০৬:৩৯
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় মস্তকবিহীন মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যার দায় স্বীকার করে একই পরিবারের তিনজন স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. নাঈমুল হাছান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সুদর্শন কুমার রায়, ডিবি পুলিশের ওসি রবিউল ইসলামসহ সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
বুধবার জেষ্ঠ্য বিচারিক হাকিম কামরুল হাসানের আদালতে ১৬৪ ধারায় এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তারা। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ৩৪ দিনের মধ্যে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিশেষ তৎপরতায় মূল রহস্য উদঘাটনসহ জড়িতদের গ্রেফতার করা হয় বলে দাবি করেন পুলিশ সুপার।
প্রেস ব্রিফিংয়ে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, হত্যার শিকার নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার লক্ষীরারায়নপুর গ্রামের মরিচ ব্যবসায়ী আব্দুর রবের (৪৮) হত্যার ঘটনায় তেঁতুলিয়া উপজেলার তীরইহাট ইউনিয়নের যোগীগছ গ্রামের ব্যাবসায়ী মানিক (৪৮), তার স্ত্রী আফরোজা বেগম (৪৫) এবং ছেলে আমান (২১) হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
বুধবার আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মানিক জানান, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং স্ত্রীর প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়ার কারণে আব্দুর রবকে হত্যা করে সে। এর আগে তার প্রতি কুদৃষ্টি দেন উল্লেখ করে মানিককে তার স্ত্রী আফরোজা ব্যবসায়ীক পার্টনার আব্দুর রবকে বাড়িতে আনতে নিষেধ করেন। ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে মানিকের আর্থিক লেনদেনও ছিল। ব্যবসায়ীক কারণেই গত ১৭ অক্টোবর মানিকের ব্যাংক হিসাবে ৯ লাখ ২৪ হাজার টাকা জমা দেন নিহত আব্দুর রব। ওই দিন মানিক তার ছেলে আমানকে নিয়ে ইসলামি ব্যাংক পঞ্চগড় শাখা থেকে ওই টাকা উত্তোলন করে ন্যাশনাল ব্যাংকের আরেক হিসাব নম্বরে জমা দেন। রাতে পঞ্চগড় জেলা শহর থেকে তার ব্যবসায়ীক পার্টনার আব্দুর রবকে নিয়ে একটি মটরবাইকে বাড়ি ফিরেন মানিক। রাতের খাওয়া শেষে একই বিছানায় শুয়ে পড়েন। গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় আব্দুর রবের বুক ও পেটে প্রথমে ছুরি বসিয়ে দেন মানিক। এক পর্যায়ে রবের গলা কেটে মাথা আলাদা করে স্ত্রী ও সন্তানকে ডেকে তোলেন। পরে মস্তকবিহীন মৃতদেহ এবং খন্ডিত মাথা একটি ব্যাগে নিয়ে মোটরবাইকে ছেলে আমানসহ বাড়ি থেকে বের হন। তারা প্রথমে ব্রম্মতল গ্রামের ঝিকদহ ব্রিজের নিকট গিয়ে মস্তকবিহীন মৃতদেহটি ফেলে দেন। সেখান থেকে খন্ডিত মাথাটি নিয়ে আজিজনগর গ্রামের হাইওয়ের পাশে ফেলে যান।
গত ১৮ অক্টোবর সকালে তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান ইউনিয়নের ব্রম্মতল এলাকায় মস্তকবিহীন মৃতদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিন বিকালেই মৃতদেহটি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার লক্ষীরারায়নপুর গ্রামের মরিচ ব্যবসায়ী আব্দুর রবের বলে সনাক্ত করে পুলিশ। তিনি দীর্ঘদিন থেকে তেঁতুলিয়ায় মরিচসহ বিভিন্ন পণ্য কিনে এলাকায় নিয়ে যেতেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী মানিকের সঙ্গে তার ব্যাবসায়ীক সম্পর্ক এবং আর্থিক লেনদেন ছিল। এরই সূত্র ধরে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলার পর ঘটনার জড়িত সন্দেহে তেঁতুলিয়ার যুগীগছ এলাকার মো. রুবেলকে (৩২) এবং আব্দুল বারেককে (৫০) গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্ত চলাকালীন মানিকসহ তার স্ত্রী এবং সন্তানকেও গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বলেন, স্ত্রীর প্রতি কুনজড় এবং টাকার লেনদেনের কারণেই মানিকসহ তার স্ত্রী ও সন্তান মিলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। প্রথমে গ্রেফতার দুইজনের দেওয়া তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য বের করা হয়েছে, তাই শিগগির আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
