ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেয়ের প্রেমিককে হত্যার পর নৌকাডুবির নাটক

মেয়ের প্রেমিককে হত্যার পর নৌকাডুবির নাটক
×

আতাউর রহমান

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৬:০০ | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৬:১৭

কেরানীগঞ্জে ধলেশ্বরী নদীতীরের লোকজনও বলছিলেন কথাটা- অন্য একটি বালুবাহী বাল্ক্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে গেছে কামাল হোসেনের ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি (ট্রলার)। এতে ট্রলারে থাকা রবিন শিকদার (২২) নামে এক যুবক মারা যান পানিতে ডুবে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং ওই নৌকায় থাকা অপর যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদেও অভিন্ন তথ্য পায়। বিপত্তি বাধে রবিনের মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে। সেখানে লেখা ছিল- বুকের আঘাতে মৃত্যু হয়েছে তার। পরিবারেরও বিশ্বাস ছিল, সাঁতার জানা রবিন পানিতে ডুবে মারা যেতে পারেন না। শেষ পর্যন্ত ঘটনার প্রায় দুই মাস পর নৌকাডুবি আর রবিনের মৃত্যুর নেপথ্যে যা বেরিয়ে এসেছে, তা হার মানায় সিনেমার গল্পকেও।

পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে- নৌকাডুবিতে রবিন মরেননি; নৌকাডুবিও হয়নি সেদিন। প্রেমিকার বাবা কামাল হোসেন পরিকল্পিতভাবে খুন করেছিলেন ওই যুবককে। এর পর তিনি সহযোগীদের নিয়ে নৌকাডুবির নাটক সাজান। গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে কেরানীগঞ্জের ছানারঘাট সংলগ্ন চর চামারদহ এলাকায় ধলেশ্বরী নদীতে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারটি ডুবে যাওয়ার কথা বলা হয়। এর পরদিন দুপুরে ধলেশ্বরীর কাদের মেম্বারের চরসংলগ্ন তীরে রবিনের মরদেহ মেলে। ওই যুবক পেশায় শ্রমিক ছিলেন।

ওই ঘটনায় দায়ের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কেরানীগঞ্জ মডেল থানার কলাতিয়া ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক চুন্নু মিয়া বলেন, 'ইঞ্জিনচালিত  নৌকাডুবি ও রবিনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল। নানা আলামত বিশ্নেষণ করে ঘটনার সময়ে ট্রলারে থাকা ছয়জনের দিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। এক পর্যায়ে বিপ্লব ও মিরাজ নামে দু'জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করে, রবিনকে নোঙরের কাজে ব্যবহূত রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তারা আদালতেও স্বীকারোক্তি দেয়। ওই দু'জনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।'

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, কামাল স্বীকার করেছেন, রবিনের সঙ্গে তার মেয়ের সম্পর্ক ছিল। এতে তার বিবাহিত মেয়ের সংসার ভাঙার উপক্রম হয়। তিনি বারবার রবিনকে বুঝিয়েছেন। এর পরও সে তার মেয়েকে বিরক্ত করত। এতে বাধ্য হয়ে তিনি রবিনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। হত্যার দায় স্বীকার করে কামাল আদালতে স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন। তার আরও তিন সহযোগী পলাতক। হত্যায় জড়িত সবার বাড়ি নবাবগঞ্জে। নিহত রবিনের বাড়ি একই এলাকায়।

রবিনকে হত্যার জন্য ট্রলার ভাড়া করেন কামাল :পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে কামাল জানিয়েছেন, তিনি রবিনকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করেন। এর পর জানতে পারেন, মানিকগঞ্জের সিংগাইরে নৌকাবাইচ হবে। সেখানে যাওয়ার জন্য তিনি ট্রলার ভাড়া করেন। সবাই জানত, তিনি নৌকাবাইচের জন্য ট্রলার ভাড়া করেছেন। কিন্তু ট্রলার মালিকের কাছ থেকে এক মাসের জন্য সেটি ভাড়া করেন। প্রতিদিন মালিককে এক হাজার টাকা দেওয়ার কথা। ঘটনার দুই দিন আগে তিনি একই এলাকার বিপ্লব, মিরাজ, আদিল ও অহিদকে নিয়ে বৈঠক করেন। ওই ট্রলার নিয়ে তারা ৬ সেপ্টেম্বর নৌকাবাইচ দেখতে যান। তার সহযোগী অহিদ ও আদিলের মাধ্যমে (পলাতক দুই আসামি) রবিনকেও নৌকাবাইচ দেখতে নেন। ফেরার পথে পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয়।

যেভাবে নৌকাডুবি নাটক: পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে তিন আসামি জানিয়েছে, নৌকাবাইচ দেখতে যাওয়া লোকজনকে বিভিন্ন ঘাটে নামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু রবিন তাদের একই এলাকার হওয়ায় ট্রলারে থেকে যায় সে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ট্রলারটি কেরানীগঞ্জের ছানারঘাট সংলগ্ন চর চামারদহ এলাকায় ধলেশ্বরী নদীতীরে একটি চরে ভেড়ানো হয়। তখন রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টা হবে। ওই সময়ে রবিনকে নিয়ে তারা চরে নামে। কামালের নেতৃত্বে তারা রবিনকে কিল-ঘুষি দেয়। এক পর্যায়ে কামাল তাকে রড দিয়ে পেটাতে থাকেন। নিস্তেজ হয়ে গেলে রবিনকে ট্রলারে তোলা হয়। এর পর সবাই মিলে ট্রলার কাত করে পানি ভরে অর্ধডুবি করা হয়। টলমল অবস্থায় সেটি চালিয়ে যাওয়া হয়। এক পর্যায়ে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবাহী একটি বাল্ক্কহেডের সঙ্গে ইচ্ছে করেই ধাক্কা লাগানো হয়। এতে সঙ্গে সঙ্গে ট্রলারটি ডুবে গেলে তারা সাঁতরে তীরে ওঠে। তবে রবিনের নিথর দেহ ট্রলারের পাটাতনের ওপর পড়ে থাকায় সেটি ভেসে যায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক চুন্নু মিয়া বলেন, 'মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি আমি। আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথাও বলি। সেখানকার লোকজন বলছিলেন, ঘটনার পর ট্রলারে থাকা লোকজন চিৎকার করছিল ট্রলারডুবির কথা জানিয়ে। তারা বলছিল, তাদের একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এর পর রবিনের পরিবারকেও ঘটনা জানানো হয়। পরদিন নিজেরাই নদীতে রবিনের লাশ খুঁজতে থাকে। যাতে কেউ সন্দেহ না করে সে জন্য তারা রবিনকে হত্যা এবং ট্রলারডুবির নাটকের পরও রবিনের পরিবারের সঙ্গে মায়াকান্না করে। কিন্তু তদন্তের কাছে আসামিদের সব নাটকই ধরা খেয়েছে।'

নিহত রবিনের বাবা ও মামলার বাদী মোস্তফা শিকদার বলেন, 'আমার ছেলে সাঁতার জানত। ট্রলারডুবির পর সবাই বেঁচে গেলেও রবিন তীরে উঠতে না পারার বিষয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল আমাদের। বিষয়টি পুলিশকে বারবার বলার পর পুলিশও ঘটনার গুরুত্ব দেয়। এতে আসামিরা গ্রেপ্তার হয়। আসামিদের উপযুক্ত বিচার দাবি করছি আমি।'

আরও পড়ুন

×