ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

চট্টগ্রামে সংগীতসন্ধ্যা

সুরের তরঙ্গে ভাসল গানের সাম্পান

সুরের তরঙ্গে ভাসল গানের সাম্পান
×

শুক্রবার চট্টগ্রামে হোটেল র‌্যাডিসনের মেজবান হলে এইচএসবিসির আয়োজনে 'গান হয়ে এলে' অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী -মো. রাশেদ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০১৯ | ১০:৪৭ | আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০১৯ | ১২:১৫

'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/ এই অপরূপ রূপে বাহির হলেন জননী/ ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে/ ওগো মা...।' কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গান যখন গাইছিলেন শিল্পী অদিতি মহসিন, তখন সাইড স্ট্ক্রিনে ভেসে আসছিল অপরূপ বাংলার নানা ছবি। আবার 'ওরে সাম্পানওয়ালা তুঁই আমারে করলি দিওয়ানা' গানটির যখন সুর তুললেন রন্টি দাশ, তখন স্ট্ক্রিনে ঢেউ তুলল কর্ণফুলী নদী। বাংলাদেশ ও চট্টগ্রামকে এভাবে একসুরে গেথেই এইচএসবিসি (হংকং-সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন) আয়োজন করেছে এক স্বর্ণালী সংগীতসন্ধ্যার। 'গান হয়ে এলে' শিরোনামে চট্টগ্রামের হোটেল র‌্যাডিসনের মেজবান হলে শুক্রবার রাতে হয়েছে এ আয়োজন। এতে উঠে এসেছে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ইতিহাস। কিংবদন্তি চিত্রনায়িকা সারাহ বেগম কবরী তার বেড়ে ওঠার দিনগুলোর কথা স্মৃতিচারণ করেছেন এ অনুষ্ঠানে। গান গেয়ে সবাইকে বিমোহিত করেছেন বরেণ্য শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও সামিনা চৌধুরী। অদিতি মহসিন, পার্থ বড়ূয়া, রন্টি দাশ ও সাব্বির চট্টগ্রামের জনপ্রিয় বিভিন্ন গান গেয়ে অনুষ্ঠানকে নতুন রঙে রাঙিয়েছেন।

এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফ্রাঁসোয়া দ্য মেরিকো এবং উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব-উর-রহমান অনুষ্ঠানে অতিথিদের স্বাগত জানান। 'গান হয়ে এলে' শিরোনাম নিয়ে কেন তারা চট্টগ্রামে এলেন বলেছেন সেই নেপথ্যের গল্পও। ফ্রাঁসোয়া দ্য মেরিকো তার বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, 'চট্টগ্রাম ঐতিহ্যময় সংস্কৃতির শহর। এখানে বন্দর আছে। আছে কীর্তিমান অনেক মানুষও। ঐতিহ্যের সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন তুলে ধরতেই এমন আয়োজন।'

মাহবুব-উর-রহমান তার বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করেন। চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমাদের ভাষার সংগ্রামে, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অপরিহার্য এক নাম চট্টগ্রাম। এটা বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন, বিনোদ বিহারী চৌধুরীর শহর। এটা শিল্পী শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের শহর। এটা কিংবদন্তি চিত্রনায়িকা কবরীর শহর। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী প্রবাল চৌধুরীর জন্মও এই শহরে। তাই আমরা চট্টগ্রামে এসেছি। সংস্কৃতির মাঝে ঐতিহ্যের স্মৃতিচারণ হবে আজ।'

কবরী মঞ্চে উঠেন ৮টা ৪৫ মিনিটে। পরনে তার গোলাপি রঙের শাড়ি। চুলের খোপায় ছিল বেলি ফুল। শিল্পী সামিনা চৌধুরীর গানের মাঝেই মঞ্চে আসেন মিষ্টি মেয়েখ্যাত কবরী। মঞ্চে উঠেই তিনি 'স্মৃতিটুকু থাক' বই থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনান। কথা বলেন চট্টগ্রামে তার বেড়ে ওঠা নিয়েও। গান নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবরী বলেন, 'চট্টগ্রাম সংগীতের দিক দিয়ে অনেক বেশি ঐতিহ্যময়। এখানকার মাইজাভান্ডারি গান, আঞ্চলিক গান সারা বিশ্বে সমাদৃত। এখানে আছে হালদা ফাডা গান। এটি উত্তর চট্টগ্রামের হালদা নদীর নামানুসারে হয়েছে। এই গান নৌকা-সাম্পানের মাঝিরা নদীতে সাম্পান বেয়ে যাওয়ার সময় গান। এমন অনেক বৈচিত্র্য আছে চট্টগ্রামের গানে। এইচএসবিসির এমন আয়োজন চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে।'

ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যা ৭টা ছুঁতেই মঞ্চে আসেন উপস্থাপক সৈয়দ আপন আহসান। শুরুতেই তিনি জানান এ আয়োজনের নেপথ্যের কথা। চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী ও গান কীভাবে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছে বলেন সেটিও। এর পরেই উদ্বোধনী সংগীত নিয়ে আসেন অদিতি মহসিন। তিনি একে একে গাইলেন তিনটি গান- আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে, আনন্দধারা বহিছে ভুবনে ও সার্থক জনম মাগো জন্মেছি এই দেশে।

কিংবদন্তি শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনও গানের আগে চট্টগ্রামের লোকজ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান কতটা শক্তিশালী সেটি তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন বলে মন্তব্য করেন। 'সব সখিরে পার করিতে নেব আনা আনা' গান দিয়েই গানের খাতা খুলেন সাবিনা ইয়াসমিন। 'সে যে কেন এলো না, কিছু ভালো লাগে না', 'চিঠি দিও প্রতিদিন, চিঠি দিও', 'গুনগুনিয়া গান গাহিয়া' শিরোনামের গানগুলো একে একে গান তিনি। সবার শেষে 'সব ক'টা জানালা খুলে দাও না' গানটি গেয়ে সবাইকে বিমোহিত করেন সাবিনা ইয়াসমিন।

শিল্পী শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান গেয়ে শোনান রন্টি দাশ ও সাব্বির। '৭০ ও ৮০-এর দশকে কবরী অভিনীত কয়েকটি সিনেমার জনপ্রিয় কিছু গানও গেয়ে শোনান তারা। এরই ফাঁকে মঞ্চে আসেন প্রয়াত শিল্পী প্রবাল চৌধুরীর ছেলে মানস চৌধুরী। তার বাবার জনপ্রিয় কয়েকটি গান মুক্তিযোদ্ধাদের কীভাবে অনুপ্রাণিত করেছে সেই গল্প বলেন মানস।

সবার শেষে মঞ্চে আসেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী পার্থ বড়ূয়া। চট্টগ্রামের ছেলে তিনি। এখান থেকে নিয়েছেন তিনি গানের হাতেখড়িও। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠার সেই গল্প বলেন পার্থ। গেয়েছেন তার পছন্দের কিছু গানও। সবার শেষে গাওয়া পার্থের গান বিমুগ্ধ হয়ে শুনেছেন আগত অতিথিরা।

আরও পড়ুন

×