পাটকল শ্রমিকদের বিক্ষোভে উত্তাল খালিশপুর শিল্পাঞ্চল
অনশনরত প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিকরা- সমকাল
খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৬:১১ | আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৬:২৫
মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন ও বকেয়া মজুরি পরিশোধসহ ১১ দফা দাবিতে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলের শ্রমিকদের আমরণ অনশন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার অনশনরত প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক আবদুস সাত্তারের মৃত্যুর পর ক্ষোভে ফুঁসছেন শ্রমিকরা।
শুক্রবার সকাল থেকেই বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে খালিশপুর শিল্পাঞ্চল। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অনশনস্থলে এসে শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অনঢ় রয়েছেন শ্রমিকরা।
সকাল ১১ টায় নগরীর খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের বিআইডিসি সড়কে গিয়ে দেখা যায়, প্লাটিনাম জুট মিলের সামনে প্লাটিনাম, দৌলতপুর ও স্টার জুট মিলের শ্রমিকরা অনশন করছেন। কিছুটা দূরে একই সড়কের ওপর অনশন করছেন ক্রিসেন্ট ও খালিশপুর জুট মিলের শ্রমিকরা। সেখানে সমাবেশ চলছে এবং কিছু সময় পরপর শ্রমিকরা দাবির পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। আরও চারটি পাটকল শ্রমিকরা তাদের নিজ নিজ মিলের সামনে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। গত মঙ্গলবার দুপুর দুইটা থেকে চলছে এ কর্মসূচি।
অনশন চলাকালে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক আবদুস সাত্তার মারা যান। শুক্রবার সকাল দশটায় প্লাটিনাম জুট মিলের সামনে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র মো. মনিরুজ্জামান মনি, বিএনপি নেতা অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলামসহ পাটকল শ্রমিকরা অংশ নেন। জানাজা শেষে মরদেহ দাফনের জন্য গ্রামের বাড়ি বরগুনা জেলার আমতলীতে পাঠানো হয়।
প্লাটিনাম জুট মিলের সিবিএ সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবীর জানান, আবদুস সাত্তারের মৃত্যুর পর শ্রমিকরা ক্ষোভে ফুঁসছেন। মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হবে। তিনি জানান, চারদিন ধরে অভুক্ত থাকা অনেক শ্রমিক দুর্বল হয়ে পড়েছে, অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অসুস্থদেরকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্টার জুট মিল সিবিএ’র সাবেক সভাপতি গাজী মাসুম বলেন, তাদের ১১ দফা দাবির মধ্যে মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন, বকেয়া মজুরি পরিশোধ, অবসরে যাওয়া শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে পাট মৌসুমে কাঁচা পাট কেনা এবং মিলগুলোকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে না দেওয়া অন্যতম। এর মধ্যে মূল দাবি হচ্ছে মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন। মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো শ্রমিক ঘরে কিংবা কাজে ফিরে যাবে না।
স্টার জুট মিল সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান জানান, শ্রমিকরা লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে বিজেএমসির কোনো মাথাব্যথা নেই। শ্রমিকরা জানান, তারা বাড়ি থেকে লেপ কাঁথা কম্বল নিয়ে এসেছেন। শীতের মধ্যেও রাতে তারা সড়কের ওপরেই ঘুমাচ্ছেন।
এদিকে শুক্রবার দুপুরে সড়কের ওপর জুম্মার নামাজ আদায় করেন শ্রমিকরা। নামাজ শেষে শ্রমিকদের দাবি পূরণে আল্লাহর কাছে সম্মিলিতভাবে মোনাজাত করা হয়। দুপুরে শ্রমিকদের অনশনস্থলে এসে একাত্মতা প্রকাশ করেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকী। তার সঙ্গে বাম সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
জুনায়েদ সাকী শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, পাটকলগুলোর দুরবস্থার জন্য শ্রমিকরা দায়ী নয়। দায়ী সরকারের ভুল নীতি ও অব্যবস্থাপনা। সে কারণে সরকারকে শ্রমিকদের দাবি মানতে বাধ্য করা হবে। তিনি খুলনার সকল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনে গিয়ে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে গত চার দিন ধরে পাটকলগুলোর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বিআইডিসি সড়কের অধিকাংশ দোকানপাটও বন্ধ রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের সমন্বয়কারী মো. বনিজ উদ্দিন মিঞা সমকালকে বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের বিষয়টি ইতোমধ্যে বিজেএমসির প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছে। আগামী ১৫ ডিসেম্বর সকাল ১১ টায় পাটমন্ত্রী তার কার্যালয়ে জরুরি সভা ডেকেছেন। সভায় শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান উপস্থিত থাকবেন। ওই বৈঠকে সংকট নিরসন হবে বলে তারা আশা করা হচ্ছে।