রংপুর বিভাগে ১৩ জনের মৃত্যু
শৈত্যপ্রবাহের কারণে উত্তরাঞ্চলে বেড়েছে শীতজনিত রোগের প্রকোপ
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তোলা- সমকাল
মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২০ | ১০:৫৫
শৈত্যপ্রবাহের কারণে উত্তরাঞ্চলে বেড়েছে শীতজনিত রোগের প্রকোপ। এ পর্যন্ত এসব রোগে মারা গেছে ১৩ জন। আক্রান্ত হয়েছে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ। এ ধরনের রোগ থেকে বাঁচতে জনসচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চিকিৎসকরা।
উত্তরাঞ্চলে শুরু হয়েছে শৈত্যপ্রবাহ। কুয়াশা কম থাকলেও হিমেল হাওয়ায় কাহিল হয়ে পড়েছে মানুষ। দিনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে নেমে এসেছে স্থবিরতা। হিমেল হাওয়ার কারণে মানুষের কর্মব্যস্ততা একটু দেরিতেই শুরু হচ্ছে। রংপুর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনভর ঘণ্টায় ছয় কিলোমিটার বেগে দমকা বাতাস বয়ে গেছে। শৈত্যপ্রবাহের কারণে সারাদিন সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। এদিকে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া রোগে ভুগছে নানা বয়সী মানুষ।
সোমবার বিকেলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের দোতলায় অবস্থিত মেডিসিন বিভাগে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অধিক সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর চাপ বাড়ায় ওয়ার্ডের মেঝে ও ওয়ার্ডের বাইরে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। অন্যদিকে শিশু ওয়ার্ড ও নবজাতক নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রেও ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মেডিসিন বিভাগের সামনে মেঝেতে চিকিৎসা নেওয়া নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ থেকে আসা আব্দুল বাসেতের ছেলে আব্দুল মমিন জানান, বাবার শ্বাসকষ্ট ও জ্বর কয়েক দিন ধরে। হাসপাতালে ভর্তি করার পর বেড পাইনি। ওয়ার্ডেই রোগীরা মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাই ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতেই বাবার চিকিৎসা চলছে। যেহেতু হাসপাতালে অনেক রোগী আসে, তাই ওয়ার্ডসহ বেডের সংখ্যা বাড়ানো উচিত।
নবজাতক নিবিড় পর্যবেক্ষণ ওয়ার্ডে নীলফামারী জেলার সোনারই ইউনিয়নের আশা মনি তার ৩১ দিন বয়সী ছেলে আমির হামজাকে ভর্তি করিয়েছেন। তিনি বলেন, 'ঠান্ডার কারণে আমার ছেলের জ্বর ও নিউমোনিয়া হয়েছিল। আজ তিন দিন হাসপাতালে আছি। এখন একটু সুস্থ রয়েছে।'
কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার জোলেখা বেগম বলেন, 'আমার আট মাস বয়সী ছেলে মিনহাজকে নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। ছেলের ডায়রিয়া থেকে জ্বর হয়েছিল। সেই সঙ্গে খিঁচুনিও ছিল। এখন চিকিৎসা চলছে।'
রংপুর মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মাহফুজার রহমান বলেন, 'সারাদেশের তুলনায় উত্তরাঞ্চলে বেশি শীত থাকে। প্রতি বছরের মতো এবারও শীতজনিত রোগ নিয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এটি আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবেই হয়েছে। রোগ সম্পর্কে সচেতন না হওয়া ও সময় মতো চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে এসব রোগে প্রাণহানিও ঘটছে। শীত মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, ধুলাবালি, ধূমপান থেকে দূরে থাকা গেলে শীতজনিত রোগ এড়ানো সম্ভব।
এদিকে রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের আট জেলায় নিউমোনিয়ায় ৬৮, ডায়রিয়ায় ২৪৪, অন্যান্য শীতজনিত রোগে ১০৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া গত ১ নভেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত রংপুর বিভাগের আট জেলায় নিউমোনিয়ায় চার হাজার ৩৯৪, ডায়রিয়ায় ১১ হাজার ১৯ এবং অন্যান্য শীতজনিত রোগে ৬ হাজার ১০২ জন আক্রন্ত হয়েছেন। সরকারি হিসাবে ১৩ জন মারা যাওয়ার তথ্য থাকলেও এর সংখ্যা আরও বেশি। এদিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে হাজার হাজার রোগী শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন প্রতিদিন।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মোস্তফা খালেদ আহমেদ বলেন, 'ভৌগোলিক অবস্থার কারণে রংপুর বিভাগে শীত বেশি অনুভূত হয়। শীতজনিত রোগে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি। এ ছাড়া শীতে হতদরিদ্র মানুষ শীত থেকে বাঁচতে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধের শিকার হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকের প্রাণহানিও ঘটেছে। আমি মনে করি, মানুষ সচেতন হলে শীতজনিত রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব।'
- বিষয় :
- রংপুর
- শৈত্যপ্রবাহ
- উত্তরাঞ্চল
- শীতজনিত রোগ
