উদ্ভাবন
সুমনের 'বনকাগজ'
মাহবুব সুমন ও তার উদ্ভাবিত বনকাগজ- সমকাল
এমএ খান মিঠু, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:৪৭ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:১৫
গাছ থেকে কাগজ। আবার সেই কাগজ থেকেই জন্মাবে গাছ! বিস্ময়কর এমনই এক উদ্ভাবন করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন মাহবুব সুমন নামের এক তড়িৎ প্রকৌশলী। তিনি ও তার প্রতিষ্ঠান 'শালবৃক্ষ' দলের গবেষকদের নিয়ে করা কাগজটির নাম দিয়েছেন 'বনকাগজ'। এই কাগজ থেকেই পাওয়া যাবে ১১ রকমের গাছ, যার মধ্যে থাকবে তিন ধরনের ফুল ও আট ধরনের সবজি। কাগজটি ভিজিটিং কার্ড বা আমন্ত্রণপত্র হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। পরে প্রয়োজন ফুরিয়ে এলে পরিত্যক্ত হিসেবে এটিকে ছিঁড়ে আর্দ্র মাটিতে ফেলে দিলেই জন্ম নেবে ফুল-ফলের গাছ।
চারপাশে যখন নির্বিচারে গাছ কেটে বন উজাড়ের মহোৎসব চলছে, তখনই 'বনকাগজ' আবিস্কার করে সবুজ বনায়নের বার্তা নিয়ে ছুটছেন নারায়ণগঞ্জের ছেলে মাহবুব সুমন ও তার শালবৃক্ষ দল। এরই মধ্যে এই 'বনকাগজ' জনপ্রিয় উঠেছে বিভিন্ন মহলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্ট মাহবুব সুমন পেশায় প্রকৌশলী হলেও ছোটবেলা থেকেই পরিবেশের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক।
যেভাবে শুরু 'বনকাগজে'র যাত্রা: নিজের প্রতিষ্ঠান 'শালবৃক্ষ'র জন্য ভিজিটিং কার্ড তৈরি করতে গিয়ে বনকাগজ তৈরির বিষয়টি মাথায় আসে মাহবুবের। গবেষণা, পরীক্ষা, ব্যর্থতা, প্রতিবন্ধকতাসহ নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে টানা এক বছরের প্রচেষ্টায় বনকাগজ তৈরিতে সফল হন তিনি। মাহবুব বলেন, মানুষ ভিজিটিং কার্ড একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর ফেলে দেয়। বিয়েসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রের বেলায়ও একই অবস্থা। অথচ প্রতিনিয়ত হাজার হাজার গাছ কেটে তৈরি হচ্ছে এ কাগজ। মাহবুব বলেন, কয়েকটি দেশে এ ধরনের কাগজ তৈরিতে কাজ হচ্ছে। তবে ১১টি বীজ দিয়ে কাগজ তৈরির বিষয়টি এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি। আমরাই প্রথম, যারা একসঙ্গে এতগুলো ফসলের বীজ দিয়ে কাগজ তৈরির পর সেই কাগজ থেকে গাছ জন্মাতে সক্ষম হয়েছি।
কাগজ থেকে যেভাবে জন্ম নেয় গাছ: বনকাগজের মধ্যে আট রকমের সবজি আর তিন রকমের ফুলের বীজ আছে। এ কাগজ মাটিতে লাগানোর জন্য বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। কাগজটি আস্ত অথবা ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলে দিলেই হলো। ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে বীজ অঙ্কুরোদ্গম হবে। তবে অবশ্যই মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকতে হবে। মাটি আর্দ্র না হলে কাগজটাকে মাটির ওপর রেখে একটু ভিজিয়ে দিলেই হবে। বিষয়টি অনেকটা মাটিতে বীজ ছিটিয়ে দেওয়ার মতো। তবে একটি বনকাগজ এক বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। এক বছরের ভেতর এটি মাটিতে ফেললে সেখান থেকে ফসল হবে।
যেভাবে তৈরি হয় বনকাগজ: বনকাগজ মূলত তৈরি হয় পরিত্যক্ত কাগজ থেকে। মেশিনের মাধ্যমে প্রথমে কাগজগুলো টুকরো করে ৪২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়, যাতে কাগজগুলো একেবারে গলে যায়। তারপর ওই কাগজগুলোর মণ্ড তৈরি করে ফ্রেমে আকার অনুযায়ী বসিয়ে দিতে হয়। পরে বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে বীজগুলো কাগজে দিয়ে দিতে হয়। কাজটি করতে হয় খুবই সতর্কতার সঙ্গে, যাতে বীজগুলো নষ্ট না হয়ে যায়। বনকাগজ তৈরির ব্যয় সম্পর্কে মাহবুব সুমন জানান, প্রকল্পটি নিয়ে এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। তাই এ মুহূর্তে ব্যয়টা তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রতি পিস কাগজ তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, যা সাধারণ কাগজ তৈরির চার গুণ। তবে এই খরচ অর্ধেকেরও কম করা সম্ভব। শিগগিরই খরচ কমিয়ে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসতে পারব।
এদিকে, শুধু বনকাগজেই থেমে থাকেননি মাহবুব সুমন। পরিবেশকে প্লাস্টিক দূষণমুক্ত রাখতে তৈরি করেছেন বাঁশের তৈরি জগ ও মগ। তৈরি করেছেন পরিবেশ উপযোগী সার তৈরির যন্ত্রও, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'মাতাল'। যেখানে দৈনন্দিন পচনশীল বর্জ্য থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হবে সার। এই সার ছাদ-কৃষিতে ব্যবহার করা যাবে। বনকাগজের সঙ্গে শালবৃক্ষের গল্পও সামনে এসেছে। শালবৃক্ষ মূলত কাজ করে দূষণমুক্ত সবুজ পৃথিবী বাস্তবায়নে। 'দূষণমুক্ত রিসাইক্লেনিং' প্রকল্প নিয়ে তাদের কাজ। এ প্রকল্পেরই একটি অংশ বনকাগজ। মাহবুব সুমন বলেন, আমার একার পক্ষে এটি করা সম্ভব হতো না। পুরো কাজটিতে আমাকে নানাভাবে সহায়তা করেছেন সায়দিয়া গুলরুখ, কামরুল হাসান ও ইকরামুনেসা চম্পা। তাদের নিয়েই 'শালবৃক্ষ'। এই দলের সবার প্রচেষ্টার ফসল আমাদের এই বনকাগজ। তিনি জানান, বনকাগজ মূলত খাদ্য উৎপাদনকে লক্ষ্য করে বানানো। বনকাগজ দিয়ে 'পারমাকালচার' কৃষিচর্চা করা যাবে। আর পারমাকালচার মাটির উপকার করে; মাটিতে প্রাণসঞ্চারে সাহায্যে করে। এর ফলে আমরা পাই নিরাপদ ফসল। শালবৃক্ষের সদস্য ইকরামুন্নেসা চম্পা জানান, বনকাগজ নিয়ে আমাদের কার্যক্রম বর্তমানে ক্ষুদ্র পরিসরে চলছে। আমরা চাই, এটি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক।
- বিষয় :
- উদ্ভাবন
- সুমন
- 'বনকাগজ'
- নারায়ণগঞ্জ
