এডিপি বাস্তবায়নের হার এযাবৎকালের সর্বনিম্ন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৪২ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৪৭
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক, অর্থাৎ গত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) খরচের খাতাই খুলতে পারেনি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এই মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো হচ্ছে সেতু বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া তিন মাসে ব্যয়ের পরিমাণ বরাদ্দের ১ শতাংশেরও কম এমন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ আছে আরও ছয়টি। এগুলো হচ্ছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যয়ান তদারকি প্রতিষ্ঠান (আইএমইডি)।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর বাস্তবায়নের এমন পরিস্থিতির কারণে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়নের সার্বিক হার বরাদ্দের মাত্র ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। গতকাল রোববার আইএমইডি প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। আইএমইডির ওয়েবসাইটে গত ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে এডিপি বাস্তবায়নের প্রতিবেদন আছে। তবে প্রান্তিকভিত্তিক বাস্তবায়নের তথ্য আছে গত ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে। প্রান্তিকভিত্তিক রেকর্ড থেকে দেখা যায়, গত এই ১৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এত কম হারে এডিপি বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি।
এর আগের অর্থবছরগুলোর প্রান্তিকভিত্তিক এডিপি বাস্তবায়নের তথ্য আইএমইডির ওয়েবসাইটে নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের মতো এত কম হারে এডিপি বাস্তবায়ন আগের কোনো অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে হয়নি। কভিড অতিমারির সময় ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল বাস্তবায়নের হার। সংকটকালীন ওই অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এমনকি গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথম প্রান্তিকে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময়েও এডিপি বাস্তবায়নের হার চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে বেশি ছিল।
গত অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তার আগের দুই অর্থবছরের একই প্রান্তিকে বাস্তবায়নের হার অনেক বেশি ছিল। ২০২৪-২৫ ও ২০২৩-২৩ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাস্তবায়নের হার ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৫ ও ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে এডিপির মাত্র ১২ হাজার ১৭ কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়েছে। এই ব্যয় ২০২২-২৩ অর্থবছরের ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক। ওই অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা। একই প্রান্তিকে গত অর্থবছর ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১৩ হাজার ২১৫ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ২০ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। অন্যদিকে শুধু সেপ্টেম্বর মাসের এডিপি বাস্তবায়নের হার আরও শোচনীয়। মাসটিতে বাস্তবায়ন হার মাত্র ২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।
উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে রুগ্ণ দশা কাটিয়ে উঠতে পারছে না স্বাস্থ্য খাত। সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ব্যয়ের হার সবচেয়ে কম। মাত্র ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের ব্যয়ের হার ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বাস্তবায়নে ২ শতাংশের ঘর পার হতে পারেনি এমন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ আছে আরও বেশ কয়েকটি। গড়ে এই ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ব্যয়ের হার ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছর এডিপির আকার তিন লাখ আট হাজার ৬২৪ কোটি টাকা।
এডিপি বাস্তবায়নে গতি আনতে কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ধীরগতির প্রকল্প ছাঁটাই ও অর্থ যৌক্তিক করা হচ্ছে। যেসব প্রকল্পের কাজের গতি অত্যন্ত ধীর, সেগুলো চিহ্নিত করে বরাদ্দ কমিয়ে আনা বা প্রয়োজনে প্রকল্প বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত প্রকল্প অগ্রগতি ট্র্যাকিংয়ের জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে একটি আধুনিক ড্যাশবোর্ডভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের বদলে কেবল পেশাগত যোগ্যতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং প্রমাণিত দক্ষতা বিবেচনা করা, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি না করে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যে সব কর্মকর্তা বা সংস্থার গাফিলতির কারণে প্রকল্পের বাস্তবায়নে অযাচিত বিলম্ব হচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পদক্ষেপও থাকছে। এ ছাড়া অর্থবছরের সময়ে পরিবর্তন এনে জুলাই-জুনের পরিবর্তে এপ্রিল-মার্চ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছর আংশিক ও ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে।
- বিষয় :
- এডিপি