ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আঘাত ও নীরব সহিংসতা

অমর একুশে ২০২৬

আঘাত ও নীরব সহিংসতা
×

নিশাত সুলতানা

নিশাত সুলতানা

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫২ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘কাউকে শোষণ, দমন কিংবা নির্যাতনের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র কী?’ এমন প্রশ্ন উঠলে আমাদের মনে প্রথমেই আসে দৃশ্যমান কিছু উপকরণ, যেমন ছুরি, লাঠি, আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ইত্যাদি। উত্তরগুলো যে ভুল তা কিন্তু নয়। এই অস্ত্রগুলোর প্রয়োগ চোখে দেখা যায়, রক্তক্ষরণ দৃশ্যমান থাকে, আঘাতের ক্ষত ধরা যায়। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য হলো এই অস্ত্রগুলোর চেয়েও ধারালো এবং মারাত্মক এক অস্ত্র আছে; যার নাম ভাষা; যে অস্ত্রের কোনো শব্দ নেই, কিন্তু এই অস্ত্রের কাজ শব্দ নিয়েই। শব্দ দিয়েই সে মানুষকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ভাষার প্রয়োগ কখনও কখনও এত ক্ষুরধার হয়ে ওঠে যে তা আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করে। কথার আঘাতে আমরা ক্ষতবিক্ষত হই, বিপর্যস্ত হই। শরীরের ক্ষত কখনও না কখনও শুকায়, কিন্তু ভাষার আঘাতে সৃষ্ট ক্ষত সারাজীবন রয়ে যায়। পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন তাঁর ‘কবর’ কবিতায় শ্বশুরবাড়িতে নাতনির প্রতি কথার খোঁটার দুঃসহ যন্ত্রণা বোঝাতে লিখেছিলেন–‘হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে’। শারীরিক সহিংসতা ছাড়াও যে অপমান, অবহেলা, মানসিক নিপীড়ন সম্ভব কবির এই পঙক্তিটি তারই উদাহরণ।

ভাষা যেমন একদিকে মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম, ঠিক একইভাবে তা আবার শোষণ, বৈষম্য আর নির্যাতনেরও মাধ্যম। বিষয়টিকে যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক না কেন অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কাউকে ওপরে ওঠানোর কিংবা নিচে নামানোর অন্যতম বড় অস্ত্র হলো ভাষা। শব্দ নির্বাচন আর প্রয়োগের রাজনীতি যুগে যুগে নির্ধারণ করেছে মানুষের সামাজিক অবস্থান। আবার এভাবেও বলা যায় যে, মানুষের সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে শব্দ চয়ন ও ভাষার ব্যবহার। কে ক্ষমতাবান আর কে প্রান্তিক, সেই চিত্রটি নিপুণভাবে আঁকতে পারে ভাষা। আমরা দেখেছি, যে বা যারা ক্ষমতা কাঠামোর শীর্ষে তাদের জন্য যে ভাষার প্রয়োগ হয়, তা কখনোই ক্ষমতা কাঠামোর নিচে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় না। ক্ষমতার এই রাজনীতিকে ঘিরে যে ক্ষমতা কাঠামোটি আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, সেখানে নারীর অবস্থান পুরুষের চেয়ে নিচে। আর পুরুষ তাঁর উচ্চ অবস্থানটি ধরে রাখতে ও তা পাকাপোক্ত করতে নারীর প্রতি সহিংস ভাষার প্রয়োগ করে চলেছেন বিরামহীন। পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে ভাষাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ভাষার উৎপত্তির সময় থেকেই যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী, নারী ভাষা-রাজনীতির শিকার হয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা ব্যবহারের মাধ্যম বদলেছে। মৌখিক থেকে লৈখিক, অফলাইন থেকে অনলাইন; কিন্তু মাধ্যম যাই হোক না কেন, ভাষায় নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি মোটেই। বরং মাধ্যম এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ভাষায় নারীর প্রতি অসম্মান, সহিংসতা আর নির্যাতন। 
ভাষা এমন একটি দর্পণ; যেখানে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিশ্বাস ও চর্চা প্রতিফলিত হয়। ভাষা যেহেতু সমাজের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটায়, তাই কোনো সমাজে নারীর অবস্থান কেমন, তা বোঝা যায় সেই সমাজে নারীর প্রতি ব্যবহার হওয়া ভাষার মাধ্যমে। নারী সম্পর্কে ব্যক্তির যে চিন্তা, তাই ফুটে ওঠে তার ভাষায়। ভাষা যেহেতু মানুষের মনোভাব প্রকাশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম, তাই ভাষার প্রয়োগের পেছনে ব্যবহারকারীর মনস্তত্ত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

অসংবেদনশীল ও অপ্রত্যাশিত শব্দের আঘাতে সবচেয়ে বেশি জর্জরিত হন নারী। চলতি পথে, বাসের ভিড়ে, সহকর্মীদের আলোচনায়, পারিবারিক সমালোচনায়, বন্ধুদের আড্ডায় বুঝে কিংবা না বুঝে নারীর প্রতি যে অসংবেদনশীল ভাষার প্রয়োগ করা হয়, তার অধিকাংশই নারীর লিঙ্গ, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, যৌনতা, কর্মদক্ষতা কিংবা যোগ্যতাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। এ শব্দগুলো যে শুধু পুরুষ ব্যবহার করেন তা কিন্তু নয়; নারীরাও প্রায়ই তাদের সম্মানের প্রতি চরম অবমাননাকর এসব ভাষার প্রয়োগ করেন খুব স্বাভাবিকভাবে, চিন্তাভাবনা না করেই। কারণ নারীরাও একই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ঘোরটোপে বেড়ে উঠেছেন। পুরুষতান্ত্রিক ভাষার এই চর্চাকে চ্যালেঞ্জ করবেন এই সাহস কিংবা যোগ্যতা কয়জন নারীই বা অর্জন করতে পারেন? নারীর প্রতি অবমাননাকর এই ভাষাগুলো আমাদের দৈনন্দিন শব্দভান্ডারে এমনভাবে মিশে আছে যে তা প্রয়োগ করার আগে আমরা নিজেরাও তলিয়ে দেখি না এসব ভাষা আমাদের নিজেদের কিংবা আমাদের আপনজনকে অপমানিত করছে কিনা।

বাংলা ভাষায় অধিকাংশ হয়রানিমূলক কথা, গালি কিংবা শব্দ সাধারণত নারীকে অবমাননা কিংবা হয়রানি করার জন্যই ব্যবহৃত হয়। বাংলা ভাষায় প্রচলিত গালিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে পুরুষের চেয়ে নারীর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে অনেক বেশি। নারীর অঙ্গ কিংবা তাঁর যৌনতাকে ঘিরে গালিতে ফুটে ওঠে পুরুষের ধর্ষকামী এবং বিকৃত বাসনা। নারীর অঙ্গকেন্দ্রিক শব্দ প্রয়োগেই যেন নিহিত থাকে পুরুষের বিজয়। একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, বাংলা ভাষায় বেশ কিছু স্ত্রীবাচক গালি আছে, যার পুরুষবাচক কোনো শব্দ নেই। নারীর প্রতি ইঙ্গিত ছাড়া গালি যেন ঠিক পূর্ণতা পায় না। আবার তিরস্কারমূলক নারীবাচক অনেক শব্দের বিপরীতে পুরুষবাচক কোনো শব্দের অস্তিত্বই নেই আমাদের শব্দভান্ডারে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঘটনার সঙ্গে নারীর ন্যূনতম সম্পর্ক না থাকলেও তাকে হেয় করে উৎপন্ন হওয়া গালি ব্যবহৃত হতে থাকে বিনা সংকোচে যুগের পর যুগ। আবার অনেক পুরুষবাচক শব্দের বিপরীতে নেই নারীবাচক শব্দের উপস্থিতি এবং অনিবার্যভাবেই এই পুরুষবাচক শব্দগুলোর সঙ্গে ক্ষমতা ও আধিপত্যের একটি যোগসূত্র রয়েছে। উপযুক্ত স্ত্রীবাচক শব্দের অনুপস্থিতিতে অনেক নারীকেই পুরুষবাচক এসব শব্দের বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়। এছাড়া রয়েছে বৈষম্যমুক্ত জেন্ডারনিরপেক্ষ শব্দের ব্যাপক অভাব। আবার আমাদের শব্দভান্ডারে যে জেন্ডার নিরপেক্ষ শব্দগুলো আছে, সেগুলোও আমাদের সচেতনতার অভাবে ব্যবহৃত হয় না।

ভাষা কিন্তু সমাজে বৈষম্য টিকিয়ে রাখার অন্যতম বড় হাতিয়ার। শব্দ নির্বাচন ও ভাষার ব্যবহারের সঙ্গে মিশে থাকে ক্ষমতার রাজনীতি। তাই ভাষাকে শুধু নিছক শব্দসম্ভার বলে উড়িয়ে দেওয়ার কিছু নেই। ২০২১ সালে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ‘ফিয়ার অফ ভায়োলেন্স’ কিংবা ‘সহিংসতার ভয়’ নামে যে গবেষণাটি করেছিল সেখানে ৫৬.৬ শতাংশ নারী এবং কন্যাশিশু জানিয়েছিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তারা কখনও না কখনও আপত্তিকর মন্তব্যের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ৭৮.৩ শতাংশ প্রতি মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে মানসিক চাপ অনুভব করেন। বিশ্বে প্রতি তিনজনে একজন নারী সহিংসতার শিকার হন। অনেকক্ষেত্রেই সহিংসতা বলতে আমরা কেবল শারীরিক নির্যাতনকেই বুঝে থাকি। মনে রাখতে হবে, শারীরিক নির্যাতনের সময় মৌখিক নির্যাতনের বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী। আর মৌখিক নির্যাতনের অন্যতম বড় উপায় হলো গালির ব্যবহার ও নারীর প্রতি আপত্তিকর শব্দের প্রয়োগ।

ভাষায় নারীর প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠায় প্রথমেই বদলাতে হবে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, অভ্যাস, ক্ষমতার চর্চা। আমরা প্রতিদিন যে শব্দগুলো উচ্চারণ করি, সেগুলোই তৈরি করে আগামী দিনের সমাজ, আগামী প্রজন্মের মন। তাই আজ আমাদের নিজেদের দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। আমরা কি এমন একটি ভাষার বলয়ে বসবাস করি, যেখানে নারী সম্মানিত, নিরাপদ, সমান? নাকি অজান্তেই সেই পুরোনো সহিংসতার উত্তরাধিকারই বহন করে চলেছি আমরা? 

নারীর প্রতি অসংবেদনশীল শব্দের ব্যবহার নারীর অগ্রযাত্রাকে অনেকখানি থামিয়ে দেয়। শুধু তা-ই নয়, অসম্মানজনক ভাষার ব্যবহার নারীর আত্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যেন শব্দচক্রে জর্জরিত নারীর জীবন। মাতৃভাষা মানে মায়ের ভাষা। তাই মায়ের সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে হলে ভাষায় নারীর সম্মান প্রতিষ্ঠা করা খুব জরুরি। ভাষাতেই নারীর সম্মান, ভাষাতেই তার অপমান। এই ভাষার মাসে আমাদের প্রতিশ্রুতি হোক শব্দে আর জব্দ না হোক নারীর জীবন। মায়ের ভাষা সত্যিকার অর্থেই সকলের ভাষা হয়ে উঠবে; যেদিন আমরা মানুষ হিসেবে জেগে উঠব। 

প্রাবন্ধিক ও উন্নয়নকর্মী

আরও পড়ুন

×