চেতনার স্রোতে ভাষার ভাসান
অমর একুশে ২০২৬
শুভাশিস সিনহা
শুভাশিস সিনহা
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘তোমার মুখ বন্ধ, তুমি কোনো কথাই বলিতে পাইবে না। যাহার মনের জোর নাই, সত্যের জোর নাই, সে-ই এমন করিয়া গায়ের জোরে দুর্বলকে থামাইতে চেষ্টা করে। ... জোর করিয়া একজনকে চুপ করাইয়া দিলে তাহার ওই না কওয়াটাই বেশি কথা কয়। কারণ, তখন তাহার একার মুখ বন্ধ হয় বটে, কিন্তু তাহার হইয়া – সত্যকে, ন্যায়কে রক্ষা করিবার জন্য – আরও লক্ষ লোকের জবান খুলিয়া যায়। বালির বাঁধ দিয়া কি দামোদরের স্রোত আটকানো যায়?’
– মুখ বন্ধ/কাজী নজরুল ইসলাম
এই জান আর জবানের গভীর সম্পর্ক নিয়েই বাংলা ভাষা তার পথ চলা এগিয়ে নিয়েছে আর নিচ্ছে। জানের তাগিদেই জবান খোলে, আবার জবানের জন্যও জান দিতে হয়। নয়তো বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি রাজপথ ছাত্র-তরুণদের রক্তে রঞ্জিত হতো না। কিন্তু রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রিক অধিকারের চৌহদ্দি ছাড়াও ভাষার অধিকারের আরও অনেক প্রশ্ন রাষ্ট্রে বা সমাজে ক্রিয়াশীল। নিত্যপ্রয়োজনের ভাববিনিময়ের বাইরেও ভাষার অনেক কাজ রয়েছে। মিশেল ফুকো তাকে যোগাযোগের মাধ্যম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করেননি, বলেছেন ক্ষমা আর জ্ঞানের একটা পদ্ধতিগত কাঠামো, যা নানান অভিপ্রকাশের মধ্য দিয়ে সত্য আর সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করে। এর মানে ভাষা চেতনার ধারক বা আধার মাত্র নয়, নয় শুধু কর্ম বা করণ, ভাষা স্বয়ং কর্তাও। এই কারণেই একটা রাষ্ট্রের পরিচালনে কোন ভাষা প্রযুক্ত থাকবে, সেই প্রশ্নটা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখান থেকে জাতীয়তাবাদেরও বিকাশ ঘটে। সেই জাতীয়তাবাদী চেতনা একটা পর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এক ভূখণ্ডের নতুন পরিচয় তৈরি করে নেয়। দুনিয়ার অনেক ভাষাই নানান প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে নিজের রক্তক্ষয়ী খরস্রোত এগিয়ে নিয়েছে, কিন্তু বাংলার বিশিষ্টতা হলো, সে এই ভাষা বা জবানের জন্য মরণপণ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে একটা দেশ-রাষ্ট্রেরও নির্মাতা।
ভাষা কীভাবে সক্রিয় থাকে, তার কাজটা কী, এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলাভাষা-পরিচয়’ প্রবন্ধে একটা ধারণা দেবার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, ‘জানার কথাকে জানানো আর হৃদয়ের কথাকে বোধে জাগানো, এ ছাড়া ভাষার আর-একটা খুব বড়ো কাজ আছে। সে হচ্ছে কল্পনাকে রূপ দেওয়া। এক দিকে এইটেই সবচেয়ে অদরকারি কাজ, আর-এক দিকে এইটেতেই মানুষের সবচেয়ে আনন্দ। ...মানুষ নির্মাণ করে প্রয়োজনে, সৃষ্টি করে আনন্দে। তাই ভাষার কাজে মানুষের দুটো বিভাগ আছে–একটা তার গরজের; আর-একটা তার খুশির, তার খেয়ালের। আশ্চর্যের কথা এই যে, ভাষার জগতে এই খুশির এলেকায় মানুষের যত সম্পদ সযত্নে সঞ্চিত, এমন আর কোনো অংশে নয়। এইখানে মানুষ সৃষ্টিকর্তার গৌরব অনুভব করেছে, সে পেয়েছে দেবতার আসন।’ ভাষার এই গরজের কাজটি অনেকটাই মানবিক, আর খুশির বা খেয়ালের কাজটি সাংস্কৃতিক। আর সেই কাজে যখন বাধা আসে তখন তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক।
বাংলা ভাষার প্রথম দিককার সাহিত্যিক প্রকাশ আমরা চর্যাপদে পেয়েছি। গীত-নৃত্যে ছন্দে সুষমায় ইশারা ইঙ্গিতে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা সেই পদগুলো রচনা করেছিলেন। তারপর হিন্দু ও মুসলিম শাসনামলে ভারতীয় নানান পুরাণ বা মিথের আশ্রয়ে অসংখ্য কাব্য-গীতের মধ্য দিয়ে ভাষার ভান্ডার পূর্ণ হয়েছে। পাঁচালি, মঙ্গলকাব্য, গীতিকা নানান আঙ্গিকের কাব্যধর্মী গীতাশ্রয়ী রচনা বাংলা ভাষাকে জনসম্পৃক্ত নান্দনিক রসায়নে সমৃদ্ধ করেছে। ব্রিটিশ আসার আগ পর্যন্ত বাংলা ভাষা ছন্দে-সুরে তার নান্দনিক অভিপ্রকাশের ধারাটিকে নানান আখ্যানে কাহনে ধরার চেষ্টা করেছে। উৎপাদনশীল সমাজের শিল্পায়নে সিদ্ধ ব্রিটিশরা যখন উপনিবেশ গাড়ল, তখন থেকে ধীরে ধীরে নিরেট গদ্যের ভাষাও তৈরি হতে শুরু করল। ছন্দ-সুর-তালের গ্রন্থি থেকে মুক্ত হলেও সেই গদ্যভাষার ভেতরে ভেতরে একটা সাংগীতিক সুষমা, অন্তর্লীন ছন্দ বয়েই চলেছে। নাট্যকার সেলিম আল দীন এবং কবি মোহাম্মদ রফিক একদিন আলোচনাসূত্রে একমত হয়েই বলেছিলেন, বাংলা গদ্যের চলনে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ছাঁচটা অনেকাংশেই রয়ে গেছে। গণিতের নামতা শিখতেও যে দেশের স্কুলে সুরে সুরে পড়তে হয় সে দেশে ভাষার নান্দনিক প্রকাশ সুর আর ছন্দমুক্ত হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ ভাষা নিয়ে চিন্তা করেছেন, ভাষার সংস্কার বা আধুনিক রূপকাঠামো তৈরির ধারায় সাধু থেকে চলিত পর্যন্ত এসেছেন। সাধু ভাষার মৃত্যু যে আসন্ন, সেটা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন প্রায় শতবর্ষ আগে। চলতি বা চলিত ভাষাটাকে তিনি প্রয়োজনের ভাষা হিসেবে দেখেছেন। ‘স্বদেশী বিদেশী হালকা ভারী সব শব্দই ঘেঁষাঘেঁষি করতে পারে তার আঙিনায়।’ নদীয়া-কৃষ্ণনগর ও তৎপরবর্তী কলকাতাকেন্দ্রিক যে ভাষার বিকাশ, তাকেই চলতি ভাষা বলতে চাইলেও সেখানে পূর্ববঙ্গের শব্দের কথনের অনুপ্রবেশকেও তিনি রোধ করতে চাননি। বলেছেন, ‘কোনো বিশেষ কারণে বিশেষ প্রদেশের ভাষা স্বতই সর্বজনীনতার মর্যাদা পায়। যে-সকল সৌভাগ্যবান দেশে কোনো একমাত্র ভাষা বিনাতর্কে সর্বদেশের বাণীরূপে স্বীকৃত হয়েছে, সেখানেও নানা প্রাদেশিক উপভাষা আছে।’ কী কারণে সেই উপভাষাগুলো থেকে কোনো একটি ভাষা সমস্ত দেশের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় তার সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রবীন্দ্রভাষ্যে মেলে নাই, তার একটা কারণ হতে পারে যে পূর্ববঙ্গের ভাষায় তখন রাষ্ট্রিক জাতিগত বিকাশের সেই লক্ষণ স্পষ্ট ছিল না, ছিল না ভাষা-সাহিত্যের নাগরিক চর্চার বেগবান ধারা। তবে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন–কলকাতাকেন্দ্রিক “এই ভাষায় ক্রমে পূর্ববঙ্গেরও হাত পড়তে আরম্ভ হয়েছে, তার একটা প্রমাণ এই যে আমরা দক্ষিণের লোকেরা ‘সাথে’ শব্দটা কবিতায় ছাড়া সাহিত্যে বা মুখের আলাপে ব্যবহার করি নে। আমরা বলি ‘সঙ্গে’। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কানে যেমনি লাগুক, ‘সঙ্গে’ কথাটা ‘সাথে’র কাছে হার মেনে আসছে।” ‘কিন্তু তারপরও’ তিনি বলছেন, ‘যে দক্ষিণী বাংলা লোকমুখে এবং সাহিত্যে চলে যাচ্ছে তাকেই আমরা বাংলা ভাষা বলে গণ্য করব। এবং সাধু ভাষা তাকেই আসন ছেড়ে দিয়ে ঐতিহাসিক কবরস্থানে বিশ্রামলাভ করবে। সেই কবরস্থান তীর্থস্থান হবে, এবং অলংকৃত হবে তার স্মৃতিশিলাপট।’ ততদিনে সেই সংস্কৃত-ঘেঁষা সাধু ভাষার ওপর তাঁর যে বৈরাগ্য কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে জানতে অসুবিধা হচ্ছে না আশা করি।
কিন্তু আজ সেই কলকাতা ও তার চারপাশের ভাষাবৈশিষ্ট্যের সংশ্লেষিত রূপের কথিত চলতি ভাষাটাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে, বা বলা হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষার কথা, অর্থাৎ সাহিত্য নানান অঞ্চলের প্রচলিত ভাষায় নানানভাবে রচিত হবে ইত্যাদি। আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা প্রভৃতি ধারণা আজ রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক সূত্রগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে ভাষা-এলাকার জটিল বিষয়াবর্তে পাক খেতে শুরু করেছে। ‘মান ভাষা’র ধারণাটিও আজ নিশ্চিত চ্যালেঞ্জের মুখে। ভাষার বিষয়টা এখন অধিকতর রাজনৈতিক। অর্থাৎ ভাষা মানুষের অস্তিত্বের একটি চিহ্ন হিসেবে মানুষটির বা মানববর্গের টিকে থাকার, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার শর্তের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে, যা রাবীন্দ্রিক ভাষাচিন্তায় হয়তো অনুপস্থিতই ছিল। কারণ রবীন্দ্রনাথের চর্চার ভাবনার সেই ভাষা মানুষের অন্তর্গত তৃষ্ণার সৃষ্টিশীলতার চর্চার সাথেই মূলত যুক্ত ছিল। ভাষা নিয়ে আমাদের উপমহাদেশের প্রধান আন্দোলনগুলো রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে সংঘটিত। ফলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্যকে জনসংস্কৃতির ভেতর থেকে চেনার কিংবা চেনানোর কাজটা রবীন্দ্রনাথ করে যেতে পারেননি। আজ ইতি হোক নেতি হোক ভাষার সেই ধারণামণ্ডলে অনেক পরিবর্তন এসেছে। নোয়াম চমস্কি থেকে শুরু করে মিশেল ফুকো, জাঁক দেরিদা পর্যন্ত অনেক মনীষী ভাষাকে ক্ষমতাকাঠামোর সাথে আপেক্ষিক করে মিলিয়ে দেখানো অভিনব প্রয়াস চালিয়েছেন। সারাবিশ্বে এখন ভাষার প্রশ্নটি নানান প্যারাডক্সে দ্বিধা-আন্দোলিত। বাংলা ভাষাও নিশ্চয় তার বাইরে নয়।
ভাষা, বিশেষত শিল্পসাহিত্যের ভাষা আদতে বর্ণচোরা কিংবা মুখোশপরা। তা নিজেই এক আবিশ্ব প্রতীকমণ্ডল।
বলার মধ্য দিয়েই যে ভাষা নিরন্তর সৃষ্টি হয়ে চলে, তার সাথে বলার আকাঙ্ক্ষা ও না-বলতে পারার মধ্য দিয়ে যে স্নায়ুচাপের ভাষা অস্পষ্ট থাকে, তার একটা পার্থক্য তো আছে। সেখানেই সাহিত্যের ভিন্নতল।
বাংলা ভাষার প্রবহমানতাও ভাষার অন্তর্গত এই দ্বান্দ্বিকতাকে নিয়েই তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। ক্রমশ গোষ্ঠী বা কৌমসমাজের কৃত্য-বিশ্বাস-আস্থা-ভরসার সম্মিলিত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেঁচে থাকা ভাষা বিচ্ছিন্ন, একাকী সত্তার অন্তর্পীড়ন-যন্ত্রণা-রতি-আত্মরতির সংক্ষুব্ধ ও ন্যুব্জ দ্ব্যর্থক ভাষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অভিযোজিত হতে হতে খুঁজে নিচ্ছে নতুন প্রকরণ। ‘আধুনিক’ জীবনের বিচ্ছিন্নতা বাংলা ভাষার আবেগঘন-যূথবদ্ধতার রসায়ন সঞ্জাত রূপটিকে এখন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, ভাষার নান্দনিক-সাহিত্যিক প্রকাশে সেই সুর-ছন্দ-অন্ত্যমিলের বাঁধভাঙা প্রবাহ এখন প্রতিরোধের মুখে বারবার আটকে যায়, তবু দিশা হারায়নি, কারণ বাংলা এখনও নগর ও প্রান্তীয় অঞ্চলকে একই সূত্রে বেঁধে রেখেছে, এ দেশের নগরায়ণ এখনও পল্লীকে পুরোপুরি ছেদ করে তার ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি। গ্রাম এখানে নানান প্রয়োজনে প্রতিদিনই নগরের সাথে যুক্ত হয়, বোঝাপড়া সেরে নেয়। সেজন্য বাংলা ভাষার মেটো গন্ধও ইটসুরকির মাঝে হারিয়ে যায় না। তাই সেই চর্যা-পাঁচালি-মঙ্গলকাব্য-বৈষ্ণবপদাবলি-প্রণয়কাব্য-গীতিকার ধারাবাহী বাংলা ভাষা আলাওল-মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দের চেতনাস্রোতে পলিবাহিত হয়ে একেবারে অধুনার কবিরও কাব্যজমিনে ফলিয়ে তুলছে প্রাণের ফসল, আয়োজন করছে হৃৎ-অঙ্কুরের নবান্ন।
কবি
নাট্যকার
- বিষয় :
- ২১ ফেব্রুয়ারি
