প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও নির্মোহ ইতিহাস
অমর একুশে ২০২৬
নাভিদ সালেহ
নাভিদ সালেহ
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে আমাদের পরিচয় একটি প্যারাডক্সের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে চলেছে। একদিকে, বাংলাদেশ সৃষ্টির আন্দোলন শুরু যেমন হয়েছে ভাষাকে ভালোবেসে, ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়ে, তেমনি অন্যদিকে, ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অভাবে আমাদের প্রকৃত ইতিহাস হয়ে রয়েছে ব্যক্তি বা দলের মীমাংসা-নির্ভর বা নেগোশিয়েবল। ইতিহাস তো কেবল লিখিত তারিখের ফর্দ নয়, বরং ইতিহাসে ঘটে যাওয়া ঘটনা একটি জাতির বর্তমানকে প্রভাবিত করে, সংস্কৃতিকে নাড়া দেয় এবং ভবিষ্যৎ নির্দিষ্ট করে। ইতিহাসের জয়-পরাজয়, অর্জন-বিসর্জন, আত্মত্যাগ আর গণহত্যার সঠিক রেকর্ড যদি জাতির হিসাবের খাতায় অনুপস্থিত থাকে তবেই ব্যক্তি কিংবা দলের আবেগ, উচ্চাশা, কিংবা দুরভিসন্ধি সত্যকে করে তোলে প্রশ্নবিদ্ধ, অতীত হয়ে দাঁড়ায় নেগোশিয়েবল। এর অন্যতম সমাধান হলো ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে, ইতিহাস ও সংস্কৃতির নির্মোহ রক্ষকের ভূমিকায় তার স্থান করে দেওয়া। এটি মেনে নেওয়া, যে ইতিহাস আপেক্ষিক হতে পারে না। ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হতে পারে, তবে তা ঘটে যাওয়ায় ঘটনার তথ্য বা রেকর্ডকে বাইরে রেখে নয়।
ভাষা তাই কেবল মতপ্রকাশের উপায়মাত্র নয়। ভাষার গুরুত্ব ব্যক্তির মুহূর্তের অনুভূতি, প্রয়োজন বা নির্দেশনার বর্ণনাতে শেষ হয়ে যায় না। আদতে, ভাষার গুরুত্ব ব্যক্তি এবং সময়কে ছাপিয়ে ইতিহাস ধারণ ও সংরক্ষণ পর্যন্ত বিস্তৃত। মুখের ভাষা যেমন সংস্কৃতি তৈরি করে, লিখিত ভাষা সেই সংস্কৃতিকে, তার ইতিহাসকে নথিভুক্ত করে, তার প্রভাবকে করে দীর্ঘায়িত। পৃথিবীর এমন অনেক ভাষাভাষী মানুষ রয়েছেন, যাঁদের সংস্কৃতি ও ইতিহাস হারিয়ে গেছে লিখিত স্ক্রিপ্ট না থাকার কারণে। যেমন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের মানুষ, যাঁরা ১০-এর অধিক ভাষায় (একত্রে যা গ্রেট আন্দামানিজ ভাষা বলে পরিচিত) কথা বলতেন, লিখিত স্ক্রিপ্ট না থাকায় তাঁদের সুগঠিত পুরাণ, কৃষ্টি ও চর্চা ব্রিটিশ উপনিবেশের পর দুই প্রজন্মের ভেতরই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ, বহিঃসংস্কৃতির আঘাত এলে ব্যক্তি বা সমষ্টির প্রতিরোধের বাইরে লিখিত লিপি এক অদৃশ্য ঢাল হয়ে সংস্কৃতি আর ইতিহাসকে ধরে রাখে। এ কারণেই ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ একান্ত জরুরি।
ভাষার প্রমিতকরণ বা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বলতে কী বোঝায়? এ ক্ষেত্রে লিখিত লিপির গুরুত্বই বা কতটুকু? ষাটের দশকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস প্রকাশিত ‘ভাষাগত দ্বন্দ্ব ও পরিকল্পনা’ শীর্ষক গ্রন্থে নরওয়েজিয়ান ভাষাবিদ আইনার হাওগেন ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বিষয়ে চার ধাপের একটি মডেল উপস্থাপন করেন। তিনি বলছেন যে, ভাষা তখনই প্রমিত হয়ে দাঁড়াবে যখন সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে একটি নির্বাচিত ভাষা বিধিবদ্ধ (বা কডিফাইড) হবে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তা প্রয়োগ করা হবে এবং তা বিস্তার লাভ করবে দেশের বিজ্ঞানচর্চা, আইনচর্চা এবং জনজীবনে। আর প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বের কথা তো আমরা জেনেছি ম্যাক্স ওয়েবার ও ডগলাস নর্থের মতো সমাজতাত্ত্বিকদের লেখায়, যেখানে আধুনিক রাষ্ট্রের ফালক্রাম হিসেবে দেখা হচ্ছে তথ্য ও ঘটনার অবিচ্ছিন্ন লিখিত রেকর্ড বা আর্কাইভকে। কেননা
রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজে বর্তমানে নিয়োজিত একটি
প্রজন্মের প্রস্থানের পরেও রেকর্ডকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। যদি তা ঘটতে দেওয়া হয়, তখনই ইতিহাসের সত্য ঘোলাটে হবার আশঙ্কা দেখা দেয়।
পশ্চিমের আধিপত্যের পেছনে অন্যতম শক্তি হিসেবে দেখা হয় রেকর্ড নথিবদ্ধকরণ ও বিজ্ঞানে এদের প্রসারকে। পাশ্চাত্যে, যে কেউ চাইলেই যে কোনো নিবন্ধ বা গ্রন্থ প্রকাশ করে ফেলতে পারে না। তাদের অতিক্রম করতে হয় একাধিক বিশেষজ্ঞভিত্তিক যাচাই-বাছাইয়ের। একইভাবে, তাই নথিবদ্ধ রেকর্ড কেউ চাইলেই পাল্টে দিতে পারে না। কে রেকর্ড লিখল, কখন লিখল, কোথায় বসে লিখল, তা দলিল হয়ে রয়ে যায় নথিভুক্ত রেকর্ডের পাশাপাশি, এই তথ্য থাকে আইনি উপায়ে সংরক্ষিত। তাই থাকে তথ্যের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা। কোনো তথ্যই উপেক্ষা করা যাবে না। যা দেখা হবে তাই লিখতে হবে নির্মোহ পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকে। এর যে ব্যত্যয় ঘটে না তা নয়, তবে রেনেসাঁ-পরবর্তী সময় থেকেই, মোটাদাগে, এই চর্চা পাশ্চাত্যে অব্যাহত রয়েছে।
ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্যে ফরাসি বিপ্লবের উদাহরণ ঘেঁটে দেখা যেতে পারে। রেনেসাঁর আগে যেখানে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটনা নথিবদ্ধ করা হতো, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নেয় যে সকল ঘটনা এবং সম্পৃক্ত ব্যক্তির নাম-পরিচয়, হোক তা বিপ্লবের পক্ষের বা বিপক্ষের, সব নথিবদ্ধ করা হবে। বিপ্লবীদের অপরাধ থাকলে তাও বাদ পড়বে না। এখানেই ছিল ফরাসি ভাষার আর তার সঙ্গে সঙ্গে সত্যের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। ১৭৯০ সালে জাতীয় আর্কাইভ স্থাপনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইতিহাস নথিবদ্ধের যাত্রা শুরু। একদিকে, বিপ্লব থেকে লেখা হয়েছে জাতীয় পরিষদের কার্যবিবরণী, বিচারের প্রতিলিপি, মৃত্যুদণ্ডাদেশ, নিন্দিতদের তালিকা এবং সকল দলের রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো; কিছুই মুছে ফেলা হয়নি–এমনকি বিপ্লবীদের নাম পর্যন্ত নয়। অন্যদিকে, গিলোটিনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদালতের রেকর্ড, মৃত্যুদণ্ডের রেজিস্টার, সংবাদপত্র, ব্যক্তিগত ডায়েরি, পুলিশ রিপোর্ট, দণ্ডপ্রাপ্তের নাম, দণ্ডের তারিখ, অবস্থান এবং অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আজ তাই আমরা জানতে পারছি কাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, কেন আর কোন আইনের অধীনে। বিপ্লবের এই নথিবদ্ধকরণ ভাষার শক্ত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। প্রমিতকৃত ফরাসি ভাষার এই প্রয়াস বোদলেয়ার, ভিক্টর হুগো কিংবা ফ্লভেয়ারের জন্ম দিয়েছিল কিনা জানি না তবে একথা হলপ করে বলা চলে, যে ইতিহাসের সত্যাসত্য নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সে দেশে।
ব্রিটিশ উপনিবেশের কারণে প্রায় পুরো উপমহাদেশেই ইংরেজি আইনের ভাষা, বিজ্ঞানের ভাষা, নথিপত্রের ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীন ভারতবর্ষ এবং তদপরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় ভাষাকে ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে প্রণয়ন করার চেষ্টা করা হয়। স্বাধীনতার প্রায় ১৬ বছর পর, ১৯৮৭ সালে, সর্বস্তরে বাংলা প্রয়োগের জন্যে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ প্রণীত হলেও, বাংলার প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এখনও অসম্পূর্ণ। যেমন, প্রথমত নিম্ন আদালতের ভাষা বাংলা হলেও, ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ আদালতের ভাষা ইংরেজি; আর এ কারণে, সুপ্রিম কোর্টের রায় আজও অনেক ক্ষেত্রেই দেওয়া হয় ইংরেজিতে, যা জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে যায়।
দ্বিতীয়ত, ১৯৭৩ সালে জাতীয় আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকলেও বরাবরই তা ছিল সরকারি নিয়ন্ত্রণে। যেমন, বর্তমানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। পাশ্চাত্যেও আর্কাইভ রাষ্ট্র পরিচালিত তবে কিছুটা তফাৎ রয়েছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় আর্কাইভ একটি স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান; যার নথি সংরক্ষণের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা রয়েছে এবং এই আর্কাইভিং ১৯৫০-এর ‘ফেডারেল রেকর্ডস অ্যাক্ট’ দ্বারা আইনিভাবে সংরক্ষিত। কেউ রেকর্ড পরিবর্তন করতে চাইলে তা দণ্ডনীয় হবে। ফ্রান্সে, বিপ্লব-পরবর্তী সময় থেকেই সকল ঘটনার আর্কাইভিং রাষ্ট্রের নয়, বরং জনগণের সম্পত্তি বলে মানা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে নথি সম্পৃক্তি এবং সংরক্ষণের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন জরুরি, যা ইতিহাসকে ব্যক্তি বা দলের প্রভাবমুক্ত রাখবে।
তৃতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বাংলাদেশের অস্তিত্বের আকর আর তাই এই গণমানুষের যুদ্ধের নির্মোহ ও অরাজনৈতিক ইতিহাস সংরক্ষণ অবশ্যই কাম্য। কারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন আর কারা গণহত্যা চালিয়েছে, কারা বীরাঙ্গনা হয়েছেন আর কারা ধর্ষকের পাশবিকতা করেছে, কাদের ঘর পুড়েছে আর কারাই বা পুড়িয়েছে–এই সব তথ্য নথিবদ্ধ থাকতে হবে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বর্ণনাও লিখিত থাকতে হবে নির্মোহভাবে।
চতুর্থত, শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষভাবে বিজ্ঞান শিক্ষায় জনযোগ বাড়ানোর জন্যে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের প্রমিত, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অপরিবর্তনশীল বাংলা পরিভাষার বাস্তবায়ন জরুরি। এই পরিভাষা ক্ষণে ক্ষণে বদল করা চলবে না। পরিশেষে, দেশে গ্রন্থ বা নিবন্ধ প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোহীন শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি, প্রতিনিয়ত বানান পরিবর্তনের ফলে বানান-বিভ্রাট বাড়ছে বই কমছে না। ভাষাগতভাবে দুর্বল এবং ধারণাগত দিক দিয়ে অনুন্নত লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন; তেমনি প্রয়োজন বানানের স্থায়ী রূপ ও অপ্রয়োজনীয় পুনঃবদল। তাই প্রকাশনার ক্ষেত্রে সংস্থার স্বায়ত্তশাসন যেমন দরকার, তেমনি জরুরি প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি অপরিবর্তনশীল বা স্থায়ী মানদণ্ড বাস্তবায়ন করা।
জর্জ অরওয়েল তাঁর ১৯৮৪ উপন্যাসে দেখিয়েছেন যে ভাষা যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট না থাকে, তবে ইতিহাসের দায়বদ্ধতাও থাকে না। তিনি বলছেন যে ভাষার প্রমিতকরণ না ঘটলে অতীতের বক্তব্য বর্তমান বক্তব্যের সঙ্গে তুলনা করা যায় না, ইতিহাস অসংরক্ষিত থেকে যায়। আর হয়তো সে কারণেই ক্ষমতাভোগীরা ভাষার অস্থায়িত্ব ও অপ্রমিতিতে প্রণোদনা দেয়। আজ অরওয়েলের ডিস্টোপিয়ার কল্পনা প্রায় বাস্তব হলে প্রতীয়মান হয় বৈকি! এবারের অমর একুশে আমাদের জন্যে নতুন শপথ নিয়ে আসুক। বাংলা আমাদের গর্ব, অহংকার। বাংলা আবেগের, প্রতিবাদের ভাষা। তবে, প্রমিতকরণের প্রায়োগিক বাস্তবায়ন না হলে, বাংলা কেবল অন্তরেই রয়ে যাবে, আমাদের ইতিহাসের প্রহরী হয়ে উঠতে বেগ পেতে হবে তাকে। বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ভেতর দিয়ে ইতিহাসের অস্বচ্ছতার কুয়াশা কেটে যাক, আজ এটাই প্রত্যাশা।
লেখক যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন-এ পুরঃ, স্থাপত্য ও পরিবেশ কৌশল অনুষদের অধ্যাপক।
প্রাবন্ধিক
শিক্ষাবিদ
- বিষয় :
- ২১ ফেব্রুয়ারি
