ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইতিহাসের বাঁক ও মোড়

অমর একুশে ২০২৬

ইতিহাসের বাঁক ও মোড়
×

ফারুক সুমন

ফারুক সুমন

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, এটি একটি আত্মজিজ্ঞাসার নাম। এই দিনটি আমাদের বারবার প্রশ্ন করে–আমরা কারা, কীভাবে আমাদের পরিচয় গড়ে উঠেছে, এবং কোন মূল্য দিয়ে সেই পরিচয় রক্ষা করা হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি মূলত বাঙালির আত্মপরিচয়ের সেই প্রথম স্পষ্ট রেখা, যা ইতিহাসের বুকে রক্ত দিয়ে আঁকা হয়েছিল। এই রেখা ধরেই বাঙালি ধীরে ধীরে একটি সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী থেকে রাজনৈতিক জাতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। ভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার, কিন্তু উপনিবেশিক ও আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভাষা হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও এই রাষ্ট্রের ভেতরেই বাঙালির পরিচয় সংকটে পড়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হয়েও বাঙালি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পরিণত হয় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সেই বৈষম্যের সবচেয়ে স্পষ্ট ও নির্মম প্রকাশ। ভাষার প্রশ্নটি তখন কেবল শিক্ষাব্যবস্থা বা দাপ্তরিক ব্যবহারের বিষয় ছিল না; এটি সরাসরি যুক্ত ছিল রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে। যে ভাষা রাষ্ট্র চালাবে, সেই ভাষার জনগোষ্ঠীই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে–এই বাস্তবতা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভালোভাবেই জানত। তাই বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা ছিল বাঙালিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল রাখার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। এই প্রেক্ষাপটে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় ছাত্রসমাজের হাত ধরে, কিন্তু দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে রাজপথে যে রক্ত ঝরে, তা কোনো আকস্মিক আবেগের ফল ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, অপমান ও অবদমনের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। ভাষার দাবিতে জীবন দেওয়ার সেই ঘটনা ইতিহাসে বিরল, কারণ এখানে ভাষা হয়ে উঠেছিল অস্তিত্বের প্রতীক।

একুশের শহীদরা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন ভাষা হারানো মানে নিজেকে হারানো। তাদের আত্মদান বাঙালির মনে একটি মৌলিক রাজনৈতিক সত্য স্থাপন করে দেয়–অধিকার কেউ দান করে না, অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়। এই উপলব্ধিই পরবর্তী সময়ের সব রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রের চরিত্র বুঝতে শেখে। পাকিস্তান যে একটি বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র, এ ধারণা ভাষা আন্দোলনের আগ পর্যন্ত এতটা স্পষ্ট ছিল না। একুশ সেই মুখোশ খুলে দেয়। ফলে ভাষা আন্দোলন ছিল ভবিষ্যৎ স্বাধীনতার বীজ রোপণের প্রথম ধাপ।
এরপরের ইতিহাস মূলত একুশের ধারাবাহিক বিস্তার। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, যেখানে ভাষা আন্দোলনের চেতনা রাজনৈতিক ম্যান্ডেট পায়; ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, যেখানে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি উঠে আসে; এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান–সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল একুশে ফেব্রুয়ারিতে জন্ম নেওয়া আত্মপরিচয়ের চেতনা। একুশ আমাদের শিখিয়েছে সংগঠনের শক্তি, ঐক্যের মূল্য এবং রাজনৈতিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা। এই শিক্ষা ছাড়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কল্পনাও করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিজের ভাষা ও পরিচয়কে স্বীকৃতি দিতে সক্ষম হয়। বাংলাভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়, জাতীয় সংস্কৃতি পায় প্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু একুশ এখানেই থেমে যায়নি। বরং স্বাধীনতার পর একুশ আমাদের সামনে নতুন দায়িত্ব হাজির করেছে। আমরা কি এই রাষ্ট্রকে একুশের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পেরেছি?
রাজনৈতিকভাবে একুশ আমাদের সতর্ক করে দেয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মতপ্রকাশের সংকোচন এবং সাংস্কৃতিক একরূপতার বিরুদ্ধে। একুশের শিক্ষা হলো, রাষ্ট্রকে মানুষের ভাষায় কথা বলতে হবে। যদি রাষ্ট্র জনগণের ভাষা, মত ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করে, তবে সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের ভিত্তি হারায়। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় এই চেতনা আজ বৈশ্বিক রূপ পেয়েছে। এটি প্রমাণ করে, বাঙালির ভাষা আন্দোলন কেবল স্থানীয় কোনো ঘটনা নয়; এটি বিশ্বজুড়ে ভাষাগত ন্যায়ের এক অনন্য উদাহরণ। তবে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের আত্মতুষ্টির সুযোগ দেয় না। বরং প্রশ্ন তোলে–নিজের ভাষার ব্যবহার, শুদ্ধতা ও মর্যাদা রক্ষায় আমরা কতটা সচেতন? 

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পর দাঁড়িয়ে আজ একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সামনে নতুন এক বাস্তবতা নিয়ে আসে। আমরা কি কেবল ভাষার জন্য জীবন দেওয়া ইতিহাসেই আটকে আছি, নাকি ভাষাকে জীবনের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাষানীতি ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিকে সংখ্যালঘু মানসিকতায় আবদ্ধ রাখাই ছিল এর লক্ষ্য। একুশে ফেব্রুয়ারি সেই প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দেয়। ভাষার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান বাঙালির রাজনৈতিক বোধকে শাণিত করে এবং পরবর্তীকালে স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত রচনা করে। এই রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভাষা কখনও নিরপেক্ষ নয়। ভাষা ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত, রাষ্ট্রের চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত।
আজকের বাংলাদেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষা, সংবিধানস্বীকৃত। কিন্তু বাস্তব জীবনে ভাষার ব্যবহার নিয়ে একধরনের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। একদিকে আমরা ভাষাশহীদদের স্মরণ করি, অন্যদিকে প্রশাসন, উচ্চশিক্ষা, করপোরেট জগৎ ও ডিজিটাল পরিসরে বাংলার ব্যবহার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ইংরেজি আজ দক্ষতার প্রতীক, আধুনিকতার মানদণ্ড। ফলে ভাষার প্রশ্নে একধরনের শ্রেণিভেদ তৈরি হয়েছে। যারা ইংরেজিতে পারদর্শী, তারা সুযোগের কাছাকাছি; যারা নয়, তারা পিছিয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা একুশের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ ভাষা আন্দোলনের মূল দর্শন ছিল, ভাষা কোনো বৈষম্যের হাতিয়ার হতে পারে না। ডিজিটাল যুগে ভাষার ব্যবহার আরও জটিল হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে বাংলা লেখা হচ্ছে, কিন্তু সেই বাংলা অনেক সময় ভাঙা, বিকৃত ও ইংরেজি-নির্ভর। এটি ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন নাকি সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণ–এই নিয়ে এখন আমাদের ভাবতে হবে। 

একুশের চেতনা কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না; এর প্রয়োগ দরকার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে। আজও অনেক সরকারি নথি, উচ্চ আদালতের কার্যক্রম, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি খাতে বাংলার ব্যবহার সীমিত। ফলে সাধারণ মানুষ ভাষাগতভাবে বঞ্চিত হয়। ভাষার প্রায়োগিক দিক মানে হলো–মানুষ যেন নিজের ভাষায় রাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলতে পারে। স্বাস্থ্য নির্দেশনা, আইনি সহায়তা, প্রযুক্তি সেবাসহ সবকিছু যদি মানুষের ভাষায় না হয়, তবে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্বই একুশ আমাদের কমাতে শিখিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায়ও ভাষার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক স্তরে বাংলা থাকলেও উচ্চশিক্ষায় বাংলা গবেষণা ও পাঠ্য বইয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। ফলে জ্ঞান উৎপাদনের ভাষা হিসেবে বাংলা এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয়। এটি একুশের অসম্পূর্ণ কাজের একটি বড় দিক।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একুশ আমাদের সতর্ক করে দেয় ক্ষমতার ভাষা নিয়ে। যখন রাষ্ট্রীয় ভাষা হয়ে ওঠে একমুখী, প্রশ্নহীন, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়। অথচ একুশের শিক্ষা হলো ভিন্নমত, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন সংস্কৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করা। একুশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভাষার স্বাধীনতার সঙ্গেই যুক্ত। যদি মানুষ নিজের ভাষায় কথা বলার সাহস না পায়, তবে ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই একুশ আজও একটি রাজনৈতিক মানদণ্ড। একুশে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষা রক্ষার প্রতীক। এটি বাঙালির সংগ্রামকে বৈশ্বিক মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু এই স্বীকৃতির সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে। নিজের ভাষার ব্যবহার যদি আমরা নিজেরাই অবহেলা করি, তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষার অধিকার নিয়ে কথা বলার নৈতিক শক্তি ক্ষয় হয়। ভাষা রক্ষার অর্থ ভাষাকে জাদুঘরে বন্দি করা নয়; বরং তাকে সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে জীবন্ত রাখা। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্যসহ সব ক্ষেত্রে বাংলাকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই একুশের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য মনে করি। আজকের সময়ে প্রযুক্তি, বাজার ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির চাপে ভাষা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। এই বাস্তবতায় একুশ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ভাষা রক্ষা মানে কেবল অতীতকে স্মরণ নয়; বরং বর্তমানকে সচেতনভাবে নির্মাণ করা।
সবশেষে বলা যায়, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের আত্মপরিচয়ের একটি চলমান পথরেখা; যা অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলে। এই পথ আমাদের শিখিয়েছে প্রতিবাদ, ঐক্য ও আত্মমর্যাদার ভাষা। স্বাধীন বাংলাদেশের নেপথ্যে যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, তার প্রথম স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল একুশ। একুশ তাই কেবল স্মৃতির দিন নয়; এটি চর্চার দিন, দায়িত্বের দিন এবং নিজের সঙ্গে সৎ থাকার দিন। ভাষা যতদিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, ততদিন একুশ বেঁচে থাকবে আমাদের কথায়, লেখায় ও রাষ্ট্রচিন্তায়। 

কবি প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

×