ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বহুজাতিক বিষের বোতলে বন্দিত্ব

অমর একুশে ২০২৫

বহুজাতিক বিষের বোতলে বন্দিত্ব
×

পাভেল পার্থ

পাভেল পার্থ

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভাষার প্রান্তিকতা, জখম ও মুক্তি নিয়ে যখন আলাপ ওঠে তখন ক্ষমতা, বাজার, করপোরেট, বাইনারি, উপনিবেশিকতা, কর্তৃত্ব, লুণ্ঠন, জাত্যাভিমান, দেমাগ নানাভাবে আলাপে আসে। কিন্তু চলমান করপোরেট রাসায়নিক কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা কীভাবে বাংলা ভাষাকে চুরমার করে দিচ্ছে এই আলাপ এখনও রাষ্ট্রীয় বয়ান হয়ে ওঠেনি। রাস্তা, বিদ্যায়তন কিংবা সংসদে এসব নিয়ে কোনো বিবাদ-বাহাস নেই। কৃষক-সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের বার্তা ছিল বঞ্চনা ও বৈষম্যকে রুখে দাঁড়ানো। সময়, আধেয় ও চরিত্রগতভাবে এসব জনলড়াইয়ের ভাষাও ভিন্ন ছিল। সংগ্রামের ভাষা ছিনতাই হলে আমরা নানাভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাই। একুশ এলেই হরেদরে ‘মাতৃভাষার’ তরে আমরা বিচলিত ও বিগলিত হয়ে ওঠি। অথচ বছরজুড়ে ভাষার খুনখারাবিকে বৈধতা দিয়ে রাখি। 

লাল, সবুজ, কালো, সাদা, চিকন, চ্যাপ্টা, মোটা, লকলকে, বেগুনি, খুদে, ঝুপড়ি কত জাতের শিম। শিম গাছের গোড়ায় যেমন অণুজীব নডিউল তৈরি করে, লতায় পাতায় থাকে এফিড নামের খুদে পোকা। এই পোকা খেয়ে বাঁচে দোয়েল, টুনটুনি, বাবুই, শালিক পাখির জীবন। বিস্ময়করভাবে জাতীয় পাখি দোয়েলের হত্যাকারী আজ ‘দোয়েল’। ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর শিমের এফিড পোকা মারার জন্য এসএস ভিশন লিমিটেড কোম্পানির ‘দোয়েল’ নামে একটি বালাইনাশকের অনুমোদন দেয় রাষ্ট্র (নিবন্ধন নং-এপি ১৯৮৮)। জাতীয় পাখি ও প্রতীককে এভাবে কোনো সর্বনাশা বিষ-পণ্যের নাম হিসেবে ব্যবহারে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পোক্ত না খানখান হয় তা অন্য আলাপ। কিন্তু বহুজাতিক কৃষি বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো কীভাবে কৃষিপণ্য বাণিজ্যের নামে রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে প্রশ্নহীনভাবে খুন করে চলেছে চলতি আলাপটি তা নিয়েই। সিনজেনটা, মনস্যান্টো, বায়ার ক্রপ সায়েন্স, এসিআই, লাল তীর, ইনতেফা, ইস্পাহানি, ম্যাকডোনাল্ড বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড কিংবা সেমকো এমন অধিকাংশ বহুজাতিক কৃষি বাণিজ্যিক কোম্পানি লাগাতার রাষ্ট্রভাষা বাংলার নানা ঐতিহাসিক প্রত্যয় ও রূপকল্প ব্যবহার করে তাদের বিষ কি বিনাশী বীজের নাম দিয়ে যাচ্ছে। এই নামকরণ মারদাঙ্গা রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক তৎপরতা বা অধিপতি রাজনৈতিক পক্ষকেই আহত করেনি। মাতৃভাষার জমিন সুরক্ষায় কেবল ফেব্রুয়ারিতে তোলপাড় হয়ে ওঠা কোনো কসরতেই আমরা এ বিষয়ে কোনো আওয়াজ দেখিনি। ভাবা যায়, প্রিয় দোয়েল আজ হয়ে গেছে বোতলবন্দি বিষ। শুধু কি দোয়েল? গ্রাম-বাংলার আরও পাখিকে এভাবেই বহুজাতিক বিষের ‘প্রতিরূপ’ করে তোলা হয়েছে। লাল তীর কোম্পানি চীন থেকে আমদানীকৃত হাইব্রিড ধানের নাম দিয়েছে ‘টিয়া’ ও ‘ময়না’। ইস্পাহানি কোম্পানি ম্যাগনেসিয়াম সালফেট সারের নাম দিয়েছে ‘শক্তি’, ম্যাকডোনাল্ড বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড কোম্পানির পাইরাজোসালফিউরান ইথাইল ঘাসমারা বিষের নাম ‘পরিষ্কার’, সেমকো কোম্পানির একই বিষের নাম ‘সাথী’, স্ট্যান্ডার্ড ক্রপ কেয়ার (বাংলাদেশ) লিমিটেড এসিটাক্লোর ও বেনসালফিউরান মিথাইল বিষের নাম দিয়েছে ‘নিড়া’। এভাবেই দেশের পাখপাখালি, নদী, বাদ্যযন্ত্র, দেশ, মাতৃভূমি, দেশজ শিকার অস্ত্র, সম্পর্ক, বিশ্বাস, ধর্ম, মূল্যবোধ, দুর্যোগ ও বিপর্যয়, দৃষ্টিভঙ্গি মোটকথা জীবনপ্রবাহের সব ভাষিক আঙ্গিক কি রূপকল্প সবই বিষ বিক্রির ধান্ধায় ব্যবহার করে চলেছে বহুজাতিক কোম্পানি। রাষ্ট্রভাষার ঐতিহাসিক রূপকল্প ও বিন্যাস এভাবে বদল ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে কৃষি এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। 
বাংলাদেশে বালাইনাশক আইন (২০১৮) বিদ্যমান এবং এর বিধিমালা তৈরি হচ্ছে। নতুন বিধিমালায় বাংলাসহ দেশের প্রচলিত ভাষার কোনো শব্দ কোনো সংহারি বিষ ও বীজের বাণিজ্যিক নাম হিসেবে ব্যবহার না করার ধারা যুক্ত করতে হবে। কোনো শব্দ/রূপকল্প ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা–তা নিয়মিত দেখভাল করা, আইন অমান্যকারীকে বিচার ও দণ্ডের আওতায় আনা জরুরি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার ‘কৃষককেন্দ্রিক এক আত্মনির্ভর কৃষির’ অঙ্গীকার করেছে নির্বাচনী ইশতেহারে। কৃষি ও জনজীবনের পরিভাষা যদি বহুজাতিক বিষের বোতলে বন্দি হতে থাকে তবে সেই অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আশা করি সরকার দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে এবং বাংলা ভাষার শব্দ ও রূপকল্প যেসব বহুজাতিক বিষ/বীজের বাণিজ্যিক নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তা বাতিল করবে। 

বাদ্যযন্ত্র আজ বহুজাতিক বিষ
একতারা, দোতারা বহুল চর্চিত বাদ্যযন্ত্র। গগন হরকরা এমন বাদ্যের তারেই জন্ম দিয়েছেন ‘কোথায় পাবো তারে’ গানের, যে সুর ধরে রবীন্দ্রনাথ পরে জন্ম দেন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। শিতালং শাহ, দূরবীন শাহ, লালন, হাসন রাজা, রাধারমণ, বিজয় সরকার, শাহ আবদুল করিম, জালাল, কাঙ্গালিনী সুফিয়া–এভাবেই বাংলার নানা প্রান্তে পুরুষ কি নারীর হাতে বাদ্যযন্ত্রের শরীর ও মন বিকশিত হয়েছে। এসব নিয়েই ভাষার রূপকল্প, ভাষিক ব্যাকরণ। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানি এ ব্যাকরণ উল্টেপাল্টে ফেলছে। সুইজারল্যান্ডের কোম্পানি সিনজেনটা তাদের একটি কীটনাশকের নাম দিয়েছে ‘একতারা’। ২০০৩ সালের ২৫ অক্টোবর কলার বিটল পোকা মারার জন্য ‘একতারা’ নামে সিনজেনটার একটি কীটনাশককে অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ (নিবন্ধন নং-এআর০৫২১)। ধানের গাছফড়িং, সরিষার জাব পোকা, আখের উই, তুলার এফিড, আমের হপার মারার জন্য সিনজেনটার মোট ১০টি বিষকে ‘একতারা’ নামে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে সাদিক এগ্রো কেমিক্যালস কোম্পানির ধান ও তুলার রোগ দমনে ব্যবহৃত বালাইনাশকটি ‘দোতারা’ নামে নিবন্ধিত হয়েছে (নং-এপি ২২০২)। চা বাগানের উইপোকা ও আলুর বালাই দমনে এশিয়া ট্রেড কোম্পানির ‘সেতার’ নিবন্ধন পায় একই সালে। এভাবেই তবলা, তানপুরা, বাঁশি, প্লুং, খ্রাম, দামা, ঝুমুর, করতাল, আদুরি, মাদলও একসময় বহুজাতিক বিষের অনিবার্য মানে হয়ে দাঁড়াবে? বাংলার বাদ্যযন্ত্রের রূপকল্প এভাবে বদলে দেওয়ার অনুমতি কে সিনজেনটাকে দিয়েছে? একতারা কি হত্যাকারী? বাদ্যযন্ত্রের সৃষ্টিময়তা কি কোনো একক প্রাণসত্তার বিনাশ কিংবা কোনো একক প্রাণসত্তার একতরফা লাভালাভের বিষয়কে উস্কে দেয়? তাহলে যে বহুজাতিক বিষ ব্যবহার করে প্রকৃতির প্রাণসত্তার বৈচিত্র্যকে হত্যা করা হয় তা কেন বাংলার বাদ্যযন্ত্রের নামে হবে। কারণ একতারা কেবল একটি শব্দ প্রত্যয় নয়, এটি ঐতিহাসিকভাবে নানা ব্যঞ্জনা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বহমান। এভাবেই বাংলার ভাষিক ময়দানে তার বিকশিত অবস্থান। জোর করে এর মানে ও প্রকরণ বদলে দেওয়া যায়। তাতে ভাষার বিস্তৃত ব্যাকরণ উল্টেপাল্টে যায়। মাতৃভাষার গণিতে গভীর জখমের দাগ লাগে। ভাষা তখন আর আপন ভাষা থাকে না, অন্যের চাপিয়ে দেওয়া মুখস্থ বুলি হয়ে ওঠে। 

নদী কি বিষের ধারা?
বাংলাদেশ অন্তরে ধারণ করে আছে নদীসভ্যতার আখ্যান। বহুজাতিক কোম্পানির কাছে এখন দেশের সব নদীই বিষধারা। অভিন্ন নদী তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক দরবার না থামলেও ‘তিস্তাকে’ কীটনাশক বানিয়েছে সালহীন অ্যাগ্রো কেমিক্যালস লিমিটেড। বেগুনের লাল মাকড়সা মারার জন্য এই কীটনাশক ব্যবহৃত হয়। কুশিয়ারা-সুরমা-মেঘনা দেশের দীর্ঘ নদীপ্রণালি। দীর্ঘ এই জলধারার উজান ও ভাটি দখল করেছে কৃষি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ও সিনজেনটা কোম্পানি। ‘সুরমা’ নামে সিনজেনটার একটি হাইব্রিড ধান আছে। কৃষি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের একটি হাইব্রিড ধানের নাম ‘মেঘনা’। আরেকটির নাম ‘পদ্মা’। এসিআই অ্যাগ্রো কেমিক্যালসের হাইব্রিড ধানের নাম ‘চিত্রা’। ‘যমুনা’ নামে একটি ধান বীজ আছে অটো ক্রপ কেয়ারের। ইউনাটেড সিড স্টোরের একটি হাইব্রিড ধানের নাম ‘মধুমতি’। এসব হাইব্রিড বীজ জমি ও জীবনের ক্ষয় ও ক্ষতি করছে নিরন্তর। যেমন ২০১২ সালে যশোরের অভয়নগরের কালিশাকুল গ্রামের কৃষকরা মধুমতি ধান লাগিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এভাবেই দেশের সব নদীই আজ বহুজাতিক কোম্পানির বিষ কি বিনাশী বীজের রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এভাবেই নদীকেন্দ্রিক ভাষিক চিন্তা কাঠামোয় তৈরি হচ্ছে নয়া মেরূকরণ। 
সোনার বাংলা, রূপসী বাংলা!

জুমে থেকে জমিনে ধারাবাহিক বিবর্তনের ভেতর দিয়েই প্রকৃতির অনেক প্রাণসত্তা নানা সমাজে পেয়েছে নানা নাম। তৈরি হয়েছে শস্যফসলের সঙ্গে এক জটিল সম্পর্ক। এক একটি শস্যফসলের নাম শুধু নামমাত্র নয়। নামেই এর পরিচয়, পরিধি ও প্রকাশ। বরেন্দ্র অঞ্চলের আমন মৌসুমের এক ধানের নাম আমড়াঝুলি। ধানের শীষে আমড়া ফলের মতো গুটি গুটি ধানগুলো থোকা থোকা ধরে বলে এমন নাম। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া কালচে রঙের ধান বলেই রাংটিয়া শালবনের কোচদের একটি ধানের নাম পোড়াবিনি। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানি শস্য ফসলের বীজ বিক্রির ক্ষেত্রে নামকরণের লোকায়ত কি বিদ্যায়তনিক কোনো ধারাই মানছে না। যে কোনো নামে তারা শস্যফসলের বীজ বিক্রি করছে। বহুজাতিক কোম্পানির ধান কি ফসলের জাত তখন আর নাম পরিচয় হারিয়ে এক উদ্বাস্তু বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হচ্ছে। ১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পর দেশে হাইব্রিড ধান ব্যবসাকে বৈধতা দেওয়া হয়। ওই সময় মল্লিকা সিড কোম্পানি চীন থেকে আমদানীকৃত একটি হাইব্রিড ধানের নাম দিয়ে দেয় ‘সোনার বাংলা’। গেটকো সিড কোম্পানি একটি ধানের নাম দেয় ‘রূপসী বাংলা’। বাংলাদেশকে নিয়ে রবীন্দ্র-জীবনানন্দের ঐতিহাসিক রূপকল্পগুলো এভাবেই বাণিজ্যিক পণ্যের নাম হয়ে যায়। দেশের স্বাধীনতা, জনসংগ্রাম, সার্বভৌমত্ব, সুরক্ষা– সবকিছুই পরপর বহুজাতিক কোম্পানি দখল করতে থাকে। আলোড়ন, জাগরণ থেকে শুরু বিজয় কি মুক্তি সবই আজ বহুজাতিক জিম্মায়। আলোক, লোকনাথ, অমরশ্রী, হীরা, সুফলা, তিনপাতা, শক্তি, কৃষাণ, অগ্রণী, সারথী, মানিক, লিলি, রাজকুমার, সম্পদ, সেরা, পান্না, ধানী, মালতী, সচল, শংকর, মণিহার, সাফল্য, মিতালী, রূপালী, বঙ্গবীর, নায়ক, হিরো, কনক, রোপা, রবি, তেজ, সচ্ছল, দুর্বার, জনকরাজ, নবীন, কল্যাণীয়া, দৌলত–এগুলো সবই বহুজাতিক কোম্পানির হাইব্রিড বীজের নাম। সিনজেনটার একটি হাইব্রিড টমেটো বীজের নাম ছিল ‘সবল’। ২০১০ সালে বীজ প্রতারণার জন্য কৃষক আন্দোলনের ফল কোম্পানি বাধ্য হয়ে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে এই বীজ বিক্রি বন্ধ করে। উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চলে ‘সবল’ বলতে একসময় গ্রামীণ জনপদে শক্তিসামর্থ্য, সুস্থ, নিরোগ, কর্মক্ষম বোঝালেও সিনজেনটার বীজ প্রতারণার পর থেকে স্থানীয় ভাষায় ‘সবলের’ মানে পাল্টে গেছে। সবল মানে হলো ‘বীজ প্রতারণা’ কিংবা ‘খারাপ বীজের নাম’। আলমগীর সিড কোম্পানির একটি হাইব্রিড ধানের নাম ‘চমক’। চীনের উইনাল হাইটেক কোম্পানির এক বিনাশী হাইব্রিড ধানের নাম ‘ঝলক’। ২০১১ সালে দেশব্যাপী ঝলক ধান কৃষকের জীবন ঝলসে দিয়েছিল। নোয়াখালী, সিলেট, জামালপুর, ময়মনসিংহ, চুয়াডাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, নেত্রকোনা, কুমিল্লা সর্বত্র ঝলক বীজ লাগিয়ে কৃষক নিঃস্ব হয়েছিল। ঝলক প্রত্যয়টি এসব অঞ্চলের গ্রামীণ ভাষা পরিসরে আর ‘ঝলকানি’ মানে হিসেবে নেই। ঝলক মানেই ঝলসানো প্রতারণা ও নিঃস্বতার এক রূপকল্প। এভাবেই বহুজাতিক বীজ-বাণিজ্য বলপ্রয়োগের ভেতর দিয়ে ভাষিক পরিসরে নানা শব্দের অন্তর্গত মানে বদলে যাচ্ছে; বদলাচ্ছে ভাষার গাঁথুনি ও রূপকল্প। 
রাখালও আজ জল-মাটির শত্রু?

‘রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে, শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে’। জুম-জমিনের সঙ্গে সম্পর্কের সেতুগুলো নানা ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়েই রূপান্তরিত হচ্ছে। উদ্বাস্তু হচ্ছে অনেক পেশা, নিখোঁজ হচ্ছে অনেক প্রাণসত্তা। ভাবা যায় যে রাখাল সারাজীবন কৃষিজীবনের জন্য জান উজাড় করেছে, সেই রাখাল আজ বহুজাতিক কীটনাশক। তাও আবার ভাষার মাসেই। ২০০৬ সালে ২ ফেব্রুয়ারি ‘ম্যাপ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর একটি ধান বালাইনাশককে রাখাল নামে অনুমোদন দেয় রাষ্ট্র (নিবন্ধন নং-এপি ০৮১৭)। ২০১১ সালে ‘স্মার্ট এগ্রোভেট’ কোম্পানি ধান বালাইনাশকের নাম দেয় কৃষকবন্ধু। ২০১২ সালে আনন্দ এগ্রোভেট একটি কীটনাশকের নাম দেয় সৈনিক। রাখাল, সৈনিক বা কৃষকবন্ধু মানে কি রাসায়নিক বিষ? এরা কি প্রাণসত্তাকে হত্যা করে? নিম্নবর্গের ভাষিক অভিধানে উল্লিখিত তিন পক্ষই জানজমানার সুরক্ষা দেয়। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানি তাদের মানে পাল্টে দিতে চাইছে। সবকিছুতে খুন করে যারা কেবল একক কোনো প্রাণ বাঁচায় তাদেরই নাম আজ রাখাল, সৈনিক বা কৃষক। বহুজাতিক এই বাণিজ্য বলপ্রয়োগ মনস্তাত্ত্বিকভাবে হত্যাকে বৈধতা দিচ্ছে, অস্থিরতাকে ভাষার শরীর ও রূপকল্পে প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে। অস্থির সময়ে তাই সহিংস হয়ে উঠছে চারদিক। সহিংস মানুষ। কারণ রাখাল, সৈনিক কি কৃষক যখন প্রাণহত্যাকারী কীটনাশকের প্রতিরূপ হয়ে দাঁড়ায় সেসব ব্যবহার ও উচ্চারণে তা মনোজগতে ‘সহিংসতার রূপকল্প’ তৈরি করে নেয়। সহিংসতা তখন মনস্তাত্ত্বিকভাবে বৈধ হয়ে যায় শব্দের প্রকরণগত চর্চার ভেতর দিয়ে। পতঙ্গ থেকে মানুষ কি সমাজের ওপরও তাই মানুষ সহিংস হতে বাধ্য হয়। ভাষা তাই কেবল পুস্তকি ভাষা, প্রমিত উচ্চারণ কি শুদ্ধ ব্যাকরণের বিষয় হিসেবে আটকে থাকে না। ভাষার ময়দানে চলমান বাহাদুরি ও সংঘর্ষ; যা ভাষার বিন্যাস ও আবেদনকে নানাভাবে ব্যবহার করে ভাষাচর্চাকারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মাতৃভাষার সুরক্ষা কি সামগ্রিক ভাষা পরিসর নিয়ে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাকাঠামো পাল্টে আজ সমাজে লাগাতার চলমান এমনতর সব বাহাদুরি ও মাস্তানি ঠাহর করতে হবে। কারণ ভাষা জাদুঘর বা চিড়িয়াখানায় আটকে রাখার কোনো বিষয় নয়। ভাষা সচল পরিবর্তনশীল এক লড়াকু প্রাণধারা। কিন্তু বহুজাতিক কৃষি কোম্পানির প্রশ্নহীন বাণিজ্য বাহাদুরির কারণে বাংলাদেশে বিশেষত রাষ্ট্রভাষা বাংলার শরীর ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভাষা পরিসরের সামগ্রিক আলাপে নিদারুণভাবে নিশ্চুপ এদিকটায় নজর দেওয়া জরুরি। কারণ দেশের গ্রামীণ নিম্নবর্গের ভাষিক ময়দান রক্তাক্ত হওয়া মানে বাংলাদেশের ভাষাজগতের এক ব্যাপক ক্ষয় ঘটতে থাকা। 
দুর্যোগ নিয়ে বাণিজ্য ঝড়-তুফানের আখ্যান নিয়েই বাংলাদেশ। এখানকার ভাষাজগৎও তাই সাক্ষ্য দেয়। সমসাময়িককালে সিডরের পর ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলায় বিপর্যস্ত হয় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। 

বহুজাতিক বোতল থেকে ভাষার মুক্তি
ভাষা জান কি জবান পায় চারপাশের বিস্তার ও কারিগরি থেকেই। চারপাশই যদি বদলে যায়, জবরদস্তি করে বদলে দেওয়া হয় তখন ভাষার আর কী তাকে? কয়েকটা খরখরে হাড্ডি ছাড়া। মেঘনা ফার্টিলাইজার অ্যান্ড অ্যাগ্রোকেম ইন্ডাস্ট্রিজের চায়ের উইপোকা মারার একটি বিষের নাম ‘আস্থা’। সিলেট অঞ্চলের চাবাগানিদের কাছে ‘আস্থা’ মানে সমষ্টির বিষয়। মানুষ, মাটি, পতঙ্গ, জল, মালিক, চাগাছ কি বৃষ্টি সকলে মিলেই আস্থার রূপকল্প। বহুজাতিক কোম্পানিরা ‘আস্থা’ শব্দটির মানে ও ধারণাকে বিষের বোতলে বন্দি করবার ভেতর দিয়ে আস্থার আদি মানে পাল্টে দিচ্ছে। এখন আস্থা মানে হলো কোম্পানির বিষের বোতল, যদি তাতে উইপোকা না মরে তবে আস্থা হয়ে যাচ্ছে ‘অনাস্থা’। 

তীর, চুম্বক, দূরবীন, পাঞ্জা, লাভা, মহাশক্তি, ত্রিশূল, নিমক, বিশাল, মাঞ্জা, গর্জন, কান্ডারী, দুরন্ত, সৃজনী, বারুদ, বর্ণিল, উত্তরণ, সীমান্ত, জামানা, পরিষ্কার, মুক্তি, গুল্লি, যোশ, প্রহার, পলাশ, চিতা, শিকারী, সুরক্ষা, প্রবাল, কুসুম, শুকরিয়া, সুন্দরী, বনমারা, টক্কর, কারিশমা, কাজল, সাফ, সাথী, টেক্কা, বিনাশ–এগুলো সবই নানান কোম্পানির রাসায়নিক বিষের নাম। কৃষিক্ষেত্রেই এসব ব্যবহৃত হয়। নয়া উদারবাদী করপোরেট পুরষালি এই বিশ্বায়িত দুনিয়ায় এসব বহুজাতিকায়ন শ্রেণীদ্বন্দ্বকে বাণিজ্য প্রসারে সর্বদা আমলে রাখে। তাই ‘রাখাল’ থেকে শুরু করে ‘মালিক’ (ম্যাপ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের তুলার বোলওয়ার্ম নাশক) কি ‘রাজা’ (সান করপোরেশনের চা বাগানে ব্যবহৃত বালাইনাশক) সবাইকে ‘বহুজাতিক বিষের’ প্রতিরূপ বানিয়ে ছেড়েছে। বহুজাতিক এই কৃষিপণ্য বাণিজ্যের ভেতর দিয়ে ভাষিক ময়দানে সাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্যের এক নয়া মেরূকরণ ঘটছে; যা রাষ্ট্রের তথাকথিত মূলধারায় কখনোই আলোচিত কোনো বিষয় হয়ে দাঁড়ায়নি এখনও। আলুর বিলম্বিত ধ্বসা রোগের জন্য মাহিন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড একটি বালাইনাশকের নাম দিয়েছে ‘মুসাফির’ (নিবন্ধন নং-এপি-২৫৩৩)। ভ্যালেন্ট টেক লিমিটেড আমের রোগদমনকারী একটি বিষের নাম রেখেছে ‘সুফি’ (নিবন্ধন নং-এপি ২৪৫৮)। 
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ২০১৮ সালের জরিপ মতে বাংলাসহ দেশে ৪১টি মাতৃভাষা আছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, আসামের বাংলা ভাষা আন্দোলন, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার আন্দোলনসহ অবিরাম দেশের আদিবাসী জাতিগুলোর ভাষিক সংগ্রাম সবকিছু নিয়েই এই ভূগোলের ভাষাজগৎ। কিন্তু নিদারুণভাবে দেশের সকল আদিবাসী ভাষার মতো আজ বাংলাও নানান ক্ষত ও জখম পাড়ি দিয়ে চলেছে। নির্দয়ভাবে রাষ্ট্রভাষার সুরক্ষা ও সীমানা বদলে যাচ্ছে। চলতি আলাপে আমরা কেবল বহুজাতিক কৃষিবাণিজ্যের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রভাষার রূপকল্প ও নিম্নবর্গের ভাষিক মনস্তত্ত্বে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে চলছে তার কিছু প্রাথমিক নমুনা হাজির করেছি মাত্র। নিঃসন্দেহে এ নিয়ে বড় আয়োজনের কাজ হওয়া জরুরি। চলতি আলাপটি মূলত রাষ্ট্রভাষার ওপর আলোচিত এসব বহুজাতিক জখমের ন্যায়বিচার দাবি করছে। আশা করবো নবনির্বাচিত কৃষিমন্ত্রী এবং সংস্কৃতিমন্ত্রী চলতি আলাপখানি বুকের গহীন থেকে পাঠ করবেন। নিশ্চয়ই আমরা কেউ কোনোদিনও চাইবো না কোনো রাসায়নিক কীটনাশকের নাম হবে ‘বিজয়’ (ইস্ট ওয়েস্ট কেমিকেলস লিমিটেডের আখ ও ধানে ব্যবহৃত বিষ) কিংবা ‘মুক্তি’ (ইয়ন অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চাবাগানে ব্যবহৃত বিষ)। কৃষি কি সংস্কৃতি অভিন্ন যমজ। বহুজাতিক বিষের নাম হিসেবে দেশের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে জড়িত প্রত্যয়সমূহ কৃষিক্ষেত্রে বহাল রেখে কোনোভাবেই কী দেশের ভাষা-সংস্কৃতির সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব? 

প্রাবন্ধিক  গবেষক

আরও পড়ুন

×