ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুঃসময়ে কৃষকের কাঁধে খরচের ভারী বোঝা

দুঃসময়ে কৃষকের কাঁধে খরচের ভারী বোঝা
×

কোলাজ

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:৩৫

সিরাজগঞ্জের তাড়াশের চলনবিলের মাঠজুড়ে এখন কেবলই সবুজের সমারোহ। বিস্তীর্ণ জনপদ ঢেকে আছে বোরো ধানের চাদরে। কৃষকের নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা এ ফসলে স্বপ্ন থাকলেও সেই স্বপ্নের গায়ে বিঁধছে খরচের কাঁটা। এই সময়ে ধানের যত্নের শেষ ধাপ সেচ, রোগবালাই দমন, তারপর কাটাই-মাড়াই। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে এসে সেই স্বপ্নের ওপর চেপে বসেছে জ্বালানি সংকট আর দাম বাড়ার চাপ। মাঠে ফসল আছে, কিন্তু সেই ফসল ঘরে তুলতে গিয়ে কৃষক পড়েছেন অনিশ্চিত হিসাবের ফাঁদে।

দুই মাস ধরে ডিজেলের ঘাটতি চলছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কৃষকরা বলছেন, দিনের পর দিন পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে সেচ, ধান কাটা, মাড়াই ও কৃষিপণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে লিটারে ১৫ টাকা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো ফসল কাটার আগেই ডিজেলের দাম বাড়ায় তা যেন মড়ার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত শনিবার প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। হিসাব বলছে, এতে কৃষকের ব্যয় আগের চেয়ে বাড়বে প্রায় এক হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। আগের দামে কৃষকের বছরে ডিজেলে খরচ হতো ১০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। নতুন করে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা দাম বাড়ায় এখন ব্যয় হবে ১২ হাজার ৬ কোটি টাকা।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারণে কেবল বোরো মৌসুম নয়, সামনের আমন মৌসুমের উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটাবে। খাদ্যশস্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা বাড়বে। দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ না নিলে সংকট আরও গভীর হবে।

খরচ বাড়ছে পদে পদে

সিরাজগঞ্জের তাড়াশের তাড়াশ উপজেলার বিলপাড়ের মাঝিড়া গ্রামের কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এই সময়টায় পানি না দিলে ধান ঠিকমতো ভরবে না। কিন্তু ডিজেলই পাচ্ছি না। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। এখন যদি ফলন কমে যায়, তাহলে পুরো খরচই উঠবে না। তাড়াশের কুন্দইল গ্রামের জাহিদুল ইসলাম বলেন, এক বিঘা জমিতে পুরো মৌসুমে ৩৫-৪০ লিটার ডিজেল লাগে। আগে থেকেই ঘাটতির কারণে বেশি দামে কিনতে হয়েছে। এখন নতুন দামে হিসাব করলে শুরু থেকে ধরলে বিঘাপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা খরচ বেড়ে যায়।

বোরো মৌসুম এখন শেষের দিকে। এমন একটা সময় যখন অনেকেই ভাবেন খরচ কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো। কারণ এখন সামনে ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই এবং পরিবহন– এই পুরো প্রক্রিয়াটাই যন্ত্রনির্ভর এবং সব ক্ষেত্রেই ডিজেল লাগে।

ঢাকার মানিকগঞ্জের চাষি মাহমুদুর রহমান বলেন, গত বছর এক বিঘায় ১৬ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছিল। এবার ২০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এখনও ধান কাটা বাকি। কাটা-মাড়াই করলে আরও খরচ বাড়বে। শেষে লাভ তো দূরের কথা, খরচ উঠবে কিনা, সেটাই চিন্তা।

ফেনীর সোনাগাজীর কৃষক আবুল হোসেন বলেন, সেচের খরচ আগেই বেড়েছে। এখন যন্ত্রের ভাড়া বাড়বে। গতবার রিপার দিয়ে ধান কেটেছি ৮০০ টাকায়, মাড়াই ১৮০০ টাকা। এবার সবকিছু বাড়বে। বিঘাপ্রতি কমপক্ষে তিন হাজার টাকা বেশি খরচ হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট ডিজেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় কৃষি খাতে। বিশেষ করে নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল– এই সময়টায় বোরো মৌসুমকে ঘিরে ডিজেলের চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বাংলাদেশে ধান উৎপাদনের সবচেয়ে বড় অংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, যা পুরোপুরি সেচনির্ভর। দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে। শুধু সেচই নয়– জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, ফসল কাটা, মাড়াই, পরিবহন– সব ধাপেই ডিজেলের প্রয়োজন হয়। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম এখনও ডিজেলনির্ভর।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) জানায়, ধান ছাড়াও কৃষির বিভিন্ন খাতে সেচযন্ত্রের ব্যবহার রয়েছে। সবজি চাষ, পুকুর ও ঘেরে মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে পানি তোলার জন্য সেচযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। সারাদেশে প্রায় ১৬ লাখ ডিজেলচালিত ছোট সেচযন্ত্র বা শ্যালো মেশিন রয়েছে। শুধু সেচ নয়, জমি চাষ, পণ্য পরিবহন এমনকি নৌযান চালাতেও এসব যন্ত্র ব্যবহৃত হয়, যার প্রায় সবই ডিজেলনির্ভর।

কৃষক ও কৃষিবিদরা বলছেন, ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে কৃষি উৎপাদন খরচ অন্তত ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কৃষকদের মতে, নতুন দামে সেচ খরচ বিঘাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের পূর্বচরবাটা গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমানের অভিজ্ঞতা এই চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে। কাঠফাটা রোদে মাঠে কাজ করলেও তার বড় অংশের খরচ চলে যাচ্ছে সেচে। আগে এক একর জমিতে চাষ ও সেচ মিলিয়ে খরচ হতো প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা। এখন জ্বালানির দাম বাড়ায় সেই খরচ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার টাকা বেশি। একই সঙ্গে পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষের খরচ বিঘাপ্রতি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কৃষক– সবাই তেলের ওপর নির্ভরশীল। সামনে আমন মৌসুমে ধান কাটার সময় হারভেস্টার চালাতে বিপুল পরিমাণ ডিজেল লাগবে। তেলের দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই সব খরচ বাড়বে।

বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, শুধু শ্যালো পাম্প ও লো-লিফট পাম্পের সেচ খরচ বাড়ায় কৃষকদের অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে।

উৎপাদন খরচ বাড়ার ধারাবাহিক চাপ

গত কয়েক বছর ধরেই কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়ছে। সার, কীটনাশক, বীজ– সবকিছুর দাম বেড়েছে। কৃষি শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। সরকারি হিসাবে, গত মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ২৭ টাকা। 

বাংলাদেশে মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। এই মৌসুমটি পুরোপুরি সেচনির্ভর। ফলে এখানে খরচ বাড়া বা উৎপাদন ব্যাহত হওয়া মানেই সরাসরি চালের বাজারে প্রভাব পড়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, চালের দাম বাড়লে তা শুধু খাদ্য খরচই বাড়াবে না, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকেও উস্কে দেবে। নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সব খাতে পড়ে; কিন্তু কৃষিতে এর প্রভাব সবচেয়ে গভীর। এতে কৃষকের খরচ বাড়বে, আবার ভোক্তার জন্য চালের দামও বাড়বে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, কৃষি খাতকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। অন্য খাতের সঙ্গে একভাবে বিবেচনা করলে হবে না। উৎপাদন ধরে রাখতে হলে কৃষকের খরচ সমন্বয় করা জরুরি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল মনে করেন, কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থেকে অর্থ সাশ্রয় করে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ানো যেতে পারে।

কৃষি সচিব ড. রফিকুল-ই-মোহামেদ বলেন, সরকার কৃষকের পাশে আছে। সরকার বিনামূল্যে বীজ ও কীটনাশকসহ নানা কৃষি উপকরণ দিচ্ছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিতে কিছুটা প্রভাব পড়বে। তবে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল ও দোহার (ঢাকা) প্রতিনিধি মাহবুবুর রহমান টিপু)

আরও পড়ুন

×