যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় মরুভূমিতে চীনের পারমাণবিক ঘাঁটি
চীনের দীর্ঘপাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাইলো ঘাঁটিগুলোর আশপাশে নতুন করে বিস্তৃত একটি প্রতিরক্ষা ও সহায়ক নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
রয়টার্স
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬ | ১৫:১১
চীনের প্রত্যন্ত এক মরুভূমিতে বিশাল এক সামরিক অবকাঠামো গড়ে উঠছে, যা ঘিরে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্মাণযজ্ঞের মূল উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য মার্কিন আগাম হামলা থেকে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারকে সুরক্ষিত রাখা এবং পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা নিশ্চিত করা।
রয়টার্সের বিশ্লেষিত স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, চীনের দীর্ঘপাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাইলো ঘাঁটিগুলোর আশপাশে নতুন করে বিস্তৃত একটি প্রতিরক্ষা ও সহায়ক নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে।
মরুভূমিতে গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা কাঠামো
চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হামি অঞ্চলের পারমাণবিক সাইলো ঘাঁটির কাছে ইতোমধ্যেই ৮০টির বেশি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র বা লঞ্চ প্যাড এবং তিনটি অষ্টভুজাকৃতির বড় সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব লঞ্চ প্যাড ভবিষ্যতে ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, এমনকি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। পাশাপাশি কমান্ড ও কন্ট্রোল কার্যক্রম পরিচালনার জন্যও এসব স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
_1780132155.jpg)
এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি আগে প্রকাশ্যে আসেনি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের পারমাণবিক স্থলভিত্তিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করার একটি বড় পদক্ষেপ।
সেকেন্ড স্ট্রাইক সক্ষমতার লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীন তার 'দ্বিতীয় আঘাত' বা সেকেন্ড স্ট্রাইক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে চাইছে-অর্থাৎ প্রথম হামলা হলেও যেন দেশটি পাল্টা পারমাণবিক জবাব দিতে সক্ষম থাকে।
_1780132169.jpg)
চীনের সামরিক নীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই 'প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করা' অবস্থান বজায় রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, তাইওয়ান ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়লে এই সক্ষমতা কৌশলগত চাপ তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে।
অষ্টভুজ ঘাঁটির ভেতরের কাঠামো
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, অষ্টভুজাকৃতির স্থাপনাগুলোর ভেতরে রয়েছে সেনা সদস্যদের থাকার জায়গা, বড় সামরিক যান এবং সুরক্ষিত বাংকার। এসব স্থাপনার সঙ্গে রেললাইন, এয়ারফিল্ড ও অন্যান্য লজিস্টিক অবকাঠামোও যুক্ত রয়েছে।
_1780132180.jpg)
চলতি মাস ও এপ্রিলের ছবিতে এসব এলাকার আশপাশে সামরিক যান চলাচল এবং মহড়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, এগুলো ছদ্মবেশী লঞ্চ সাইট বা আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
হাওয়াইভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক ফোরামের বিশ্লেষক আলেকজান্ডার নিল বলেন, মরুভূমির হাজার হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে এমন বিস্তৃত অবকাঠামো নির্মাণ 'চীনের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ' নির্দেশ করে।
ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন বলেন, এত বড় পরিসরে এমন প্রতিরক্ষামূলক নির্মাণ তিনি আগে কখনও দেখেননি। তাঁর মতে, এই কাঠামো চীনের পারমাণবিক সক্ষমতাকে আরও বহুমুখী ও দুর্ভেদ্য করে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনার প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুকে কেন্দ্র করে ক্রমেই জটিল হচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, ভুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে 'বিপজ্জনক দিকে' ঠেলে দিতে পারে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করলেও তাইওয়ান তা প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক প্রতিযোগিতা
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চীন দ্রুতগতিতে তার পারমাণবিক ওয়ারহেড ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি প্রায় এক হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের পথে এগোচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন মরুভূমি অবকাঠামো শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং চীনের দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
'অভূতপূর্ব নির্মাণযজ্ঞ'
বিশ্লেষকদের ভাষায়, চীনের এই উদ্যোগ আকার ও বিস্তারে 'অভূতপূর্ব'। মরুভূমির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এই সামরিক নেটওয়ার্ক বিশ্ব পারমাণবিক ভারসাম্যে নতুন করে প্রতিযোগিতা ও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
- বিষয় :
- চীন
- মরুভূমি
- যুক্তরাষ্ট্র
