ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও পুশইন বন্ধে পদক্ষেপ চায় বাংলাদেশ

দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফের চার দিনব্যাপী সম্মেলন শুরু আজ

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও পুশইন বন্ধে পদক্ষেপ চায় বাংলাদেশ
×

 সমকাল প্রতিবেদক ও কলকাতা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬ | ১২:৪০

বেশ কয়েকটি সীমান্তে দিয়ে নারী-পুরুষ ও শিশুদের বাংলাদেশে পুশইনের (ঠেলে পাঠানো) চেষ্টা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বাধার মুখে প্রবেশ করতে পারেননি তারা। কয়েকটি সীমান্তে অনেকে এখনও শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। সীমান্তের এমন পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ সোমবার দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সম্মেলন শুরু হচ্ছে। এবারের সম্মেলনে পুশইন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ চাইবে বাংলাদেশ। বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী এ সম্মেলন আগামী বৃহস্পতিবার শেষ হবে। 

গতকাল রোববার ঢাকায় সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং বিশেষ করে অবৈধ পুশইনের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হবে। বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক নিয়মিতভাবে একবার বাংলাদেশে এবং পরেরবার ভারতে অনুষ্ঠিত হয়। 

তিনি বলেন, সেখানে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা কূটনৈতিক চ্যানেলে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছি এবং আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। সরকার সব ধরনের অবৈধ পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। তবে এসব সমস্যা প্রাথমিকভাবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ চলমান রয়েছে এবং আসন্ন বৈঠকেও এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

বৈঠকে যা আলোচনা হতে পারে 

বিজিবি সূত্র জানায়, এবারের সম্মেলনে বিএসএফ, ভারতীয় নাগরিক বা দুষ্কৃতকারীদের হাতে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে আলোচনা হবে। এ ছাড়া অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ, ভারত থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান রোধ, মানব পাচার প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়াসহ অন্যান্য অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধের বিষয় থাকছে। এ ছাড়া চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের নিষ্পত্তি, তিন বিঘা করিডোর দিয়ে পাটগ্রাম থেকে দহগ্রাম পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার কেবল স্থাপনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। আগরতলা থেকে আখাউড়াগামী চারটি খালের বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের জন্য প্লান্ট স্থাপন, মুহুরীর চর এলাকায় স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণ, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর তীর সংরক্ষণ কার্যক্রম, আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ও তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত তথ্য আদান-প্রদানের বিষয় এজেন্ডায় আছে। 

এদিকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমান্ত-সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, আকাশসীমা লঙ্ঘন করে অবৈধ ড্রোন বা হেলিকপ্টার উড্ডয়ন বন্ধের বিষয়টি তোলা হবে। এ ছাড়া ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল সম্পর্কে নেতিবাচক অপপ্রচার বন্ধ এবং উভয় বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বন্দুক দেখিয়ে নারী-শিশুদের ঢোকাচ্ছে বিএসএফ

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বিএসএফ বাংলাদেশি সন্দেহে অনেক মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর)। এই ঘটনায় এপিডিআর ১১ জুন মালদা শহরে একটি প্রতিবাদ মিছিল আহ্বান করেছে বলে জানিয়েছে সংগঠনের সহসভাপতি রঞ্জিত শূর।

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে লিখেছিল, ক্ষমতায় এলে তারা ‘ডিটেক্ট, ডিপোর্ট, ডিলিট’-এর (চিহ্নিতকরণ, ফেরত পাঠানো এবং মুছে ফেলা) নীতি নেবে। ক্ষমতা গ্রহণের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের পাশাপাশি কথিত বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করে সেখানে পাঠানোর জন্য আটক কেন্দ্র চালু করেন। পাশাপাশি শুরু হয় বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’। এর জেরে অসংখ্য মানুষ দুই দেশের মধ্যবর্তী অঞ্চলে আটকে রয়েছেন বলে গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে এপিডিআর।

এই ঘটনাকে গভীর উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করে মানবাধিকার সংগঠনটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিএসএফ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশি সন্দেহে অনেক মানুষকে, বিশেষত নারী ও শিশুদের বিভিন্ন জেলার সীমান্তে নিয়ে গিয়ে জোর করে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তবে বিজিবি তাদের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এপিডিআর বলেছে, এর ফলে সীমান্তের বহু জায়গায় ‘নোম্যান্স ল্যান্ডে’ দিনের পর দিন এই মানুষরা পড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশু রয়েছেন। তারা খাবার ও পানি পাচ্ছেন না। রোদ, বৃষ্টি ও ঝড়ে এক ভয়ংকর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে তারা। ভয়ংকর এক অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

বিএসএফ ঠেলে নোম্যান্স ল্যান্ডে ঢুকিয়ে দিয়ে দায়িত্ব অস্বীকার করছে জানিয়ে মানবাধিকার সংগঠনটি বলেছে, ওরা বাংলাদেশি, তাই বিএসএফের কোনো দায়িত্ব থাকতে পারে না। অন্যদিকে বিজিবি বলছে, ওরা যে বাংলাদেশি তার কোনো প্রমাণ নেই। বিজিবির মতে, ওরা ভারতীয়। ফলে তাদের কোনো দায়িত্ব নেই। ফলে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর বন্দুকের সামনে খাবার ও পানীয় জলহীন এক ভয়ংকর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে বেশ কিছু মানুষ।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বেশ কয়েকটি জায়গায় এই অবস্থা বলে জানিয়ে এপিডিআর বলছে, আমরা মনে করি, ভারতের ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট (থ্রিডি) নীতিটাই অসাংবিধানিক, বেআইনি এবং সংবিধানবিরোধী। এই নীতিই বর্তমান সংকটের উৎস। 

রঞ্জিত শূর বলেন, জিরো পয়েন্টে বিএসএফের ফেলে আসা সব মানুষকে অবিলম্বে ফিরিয়ে নিতে হবে। আমরা চাই, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সৃষ্টিকারী পুশব্যাক নীতি অবিলম্বে বাতিল করুক ভারত সরকার। আমরা এই বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের (ইউএনএইচআরসি) দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি।

জাতিসংঘ ও আইওএমের হস্তক্ষেপ আহ্বান

পঞ্চগড় সীমান্তের শূন্যরেখায় বিএসএফের ঠেলে দেওয়া নারী-শিশুসহ ১০ জনের ৬০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অমানবিকভাবে আটকে থাকার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তাদের খাদ্য, পানি ও আশ্রয় নিশ্চিতে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী এবং আইওএমের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান।

তিনি বলেন, আমি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অবৈধ পুশইনের এই অমানবিক প্রবণতা বন্ধের জোর আহ্বান জানাই। একই সঙ্গে দুই দেশের প্রতি অনুরোধ করছি, পরিচয় ও দায় নির্ধারণের প্রশ্ন মীমাংসার আগেই যেন এই মানুষগুলোর কাছে অবিলম্বে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি আশ্রয় ও চিকিৎসা পৌঁছানো নিশ্চিত করা হয়। 

আরও পড়ুন

×