বিদ্যুৎ-গ্যাস নিয়ে সংসদে বাহাস, জেরার মুখে মন্ত্রী
সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১১:৪৬
গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে বলে সংসদ সদস্যরা (এমপি) জানালেও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু তা নাকচ করেছেন। লোডশেডিং নিয়ে সংসদে এমপিদের প্রশ্নের মুখে তিনি দাবি করেন, দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি নেই। বিভিন্ন কারণে মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়। লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট এক নয়।
সংসদে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানা সচল করতে গত ১ মে থেকে গ্যাস সরবরাহ না করায় মন্ত্রীকে সতর্ক করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে পর্যালোচনা করে নেবেন। এর আগে সংসদকে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, গ্যাসের অভাবে সার কারখানা চালানো যাচ্ছে না। গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করেন জ্বালানিমন্ত্রীও।
গতকাল রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনে স্পিকারের সভাপতিত্বে বৈঠকে এসব বিতর্ক হয়। এক মাস আট দিনের বিরতিতে শুরু হওয়া দ্বিতীয় অধিবেশনে কোরআন তিলাওয়াতের পর শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। যশোর-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এমপি গোলাম রছুল প্রশ্ন করেন, নোয়াপাড়া শিল্প এলাকায় বিদ্যুতের অভাবে কলকারখানা বন্ধ রয়েছে। ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে? জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দাবি করেন, লোডশেডিং নেই।
সম্পূরক প্রশ্নে গোলাম রছুল বলেন, ‘গ্রামে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রী বলছেন, লোডশেডিং নেই!’ এ বক্তব্যের সময় বিরোধীদলীয় এমপিরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান।
স্পিকার তখন জানতে চান, বিদ্যুতের ঘাটতি কেন? জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘আগেও বলেছি, আবারও বলছি, বিদ্যুতের ঘাটতি নেই। লোডশেডিং নেই। ঝড়-বৃষ্টিতে গাছ পড়ে গেলে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হয়।’
এরপর প্রশ্ন করতে দাঁড়িয়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানা মন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘লোডশেডিং বলি আর মেরামত শেডিংই বলি, গ্রামাঞ্চলে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এটাই হলো বাস্তবতা।’ এই বক্তব্যেও বিরোধীদলীয় এমপিরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান।
এ পর্যায়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘সংসদে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী কথা দিয়েছিলেন, ১ মের মধ্যে আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হবে। এর পরে আরও এক মাস তিন-চার দিন পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও আশুগঞ্জ কারখানায় গ্যাস পাইনি।’
ইকবাল হাসান মাহামুদ টুকু বলেন, ‘১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, এটার সঙ্গে একমত নই। তিনি বিদ্যুৎ চাইছেন, আবার সার কারখানাও চালাতে বলছেন! গ্যাসের তো সংকট আছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। তাই সার কারখানায় গ্যাস দিতে পারছি না। গ্যাসের অবস্থার উন্নতি হলে সরবরাহ দেওয়া হবে। গত ১৭ বছরে গ্যাসের অনুসন্ধানে কূপ খনন হয়নি। বিএনপি সরকার এসে খনন শুরু করেছে। আশা করি, গ্যাস পাব। তারপর আশুগঞ্জসহ সব সার কারখানায় গ্যাস দিতে পারব।’
এই পর্যায়ে স্পিকার মন্ত্রীকে সংসদে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করান। স্পিকার বলেন, ‘আপনি কিন্তু সংসদে বলেছিলেন, ১ মে থেকে গ্যাস যাবে। সেটি বোধ হয় পাওয়া যায়নি।’ ভবিষ্যতে সংসদে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার বলেন, ‘সংসদে যে প্রতিশ্রুতি দেবেন, তা খনন বা অন্যান্য যাবতীয় আনুষঙ্গিক বিষয় পর্যালোচনা করে সংসদে দেবেন।’
মন্ত্রীর দাবি, বিদ্যুৎ ঘাটতি নেই
কুমিল্লা-৯ আসনের বিএনপির এমপি আবুল কালামের প্রশ্নে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুতের ঘাটতি না থাকলেও সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন-বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে মাঝেমধ্যে কিছুটা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।
বক্তব্যের ব্যাখ্যায় মন্ত্রী বলেন, ঝড়-বৃষ্টি, গাছ পড়ে লাইন ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের ত্রুটির কারণে সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট হতে পারে, তবে সেটিকে লোডশেডিং বলা ঠিক নয়। লোডশেডিং হলো, ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ না থাকা।
সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী জানান, গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। সাত হাজার ৯২৮ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৩২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। এ ছাড়া ৬৬৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন মোট ১৫টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এগুলো পর্যায়ক্রমে চালু হবে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।
বিএনপির এমপি খায়রুল কবীর খোকনের প্রশ্নে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে এক হাজার ১৭২ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ২৬টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।
বিএনপির এমপি খোন্দকার আবু আশফাকের প্রশ্নে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১৬ হাজার থেকে সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে ১৫ হাজার ৫০০ থেকে ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
জামায়াতের এমপি রাশেদুল ইসলাম রাশেদ দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি তাপদাহের আশঙ্কার তথ্য তুলে ধরে বিদ্যুৎ খাতের প্রস্তুতি জানতে চান। জবাবে মন্ত্রী বলেন, সে ক্ষেত্রে হয়তো কিছু কিছু জায়গায় লোডশেডিং দিতে হতে পারে।
জামায়াতের শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রশ্ন তোলেন, ট্রান্সফরমার চুরি হলে দায় কেন গ্রাহককে নিতে হবে? জবাবে মন্ত্রী বলেন, পল্লী বিদ্যুতের দীর্ঘ নেটওয়ার্কে ট্রান্সফরমার চুরি রোধ করা কঠিন। এলাকার মানুষকেও এ ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে।
গ্যাস সংকটে কারখানা বন্ধ
জামালপুর-৪ আসনের বিএনপির এমপি ফরিদুল কবির তালুকদারের প্রশ্নে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, যমুনা সার কারখানার উৎপাদন সক্ষম রয়েছে। তবে গ্যাসের অভাবে চালানো যাচ্ছে না। গ্যাস প্রাপ্তি সাপেক্ষে চালু করতে কোনো সমস্যা নেই। সার কারখানাগুলোর জন্য আলাদা গ্যাস নেটওয়ার্ক তৈরির সম্ভাবনাও সরকার বিবেচনা করছে।
জামালপুর-৩ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নে শিল্পমন্ত্রী বলেন, ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকলকারখানা বন্ধ রয়েছে। ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলে মাড়াই স্থগিত রয়েছে।
শিল্পমন্ত্রী জানান, চট্টগ্রাম জেলায় বিসিকের পাঁচটি শিল্পনগরীতে গত ১৭ বছরে ৪৩টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে।
এর আগে জামায়াতের এমপি জাহাঙ্গীর হোসেন হেলালের প্রশ্নে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, রূপসায় দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। ভোলা থেকে গ্যাস এনে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
‘সংসদ কালারফুল দেখাচ্ছে’
গতকাল সংসদের বৈঠকে প্রথমবারের মতো যোগ দেন সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ এমপি। নারী এমপিরা প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার চার দিন পর ৩ মে শপথ নেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নারী এমপিদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, আজ সংসদ খুব কালারফুল দেখাচ্ছে। নারী সদস্যদের আগমনে পূর্ণতা পেয়েছে।
এই পর্যায়ে স্পিকার বিএনপিদলীয় নারী এমপি রেহেনা আক্তার রানুকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেন। সংরক্ষিত আসনে তৃতীয়বারের মতো সংসদে আসা রেহেনা আক্তার প্রশ্নের আগে বলেন, ‘ফুল ফুটক আর নাই ফুটুক, এই সংসদে আজ বসন্ত, আমাদের ৫০ জনের।’ স্পিকার তাঁকে থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করতে বলেন। স্পিকারের সঙ্গে কথোপকথনের এক পর্যায়ে রেহেনা আক্তার বলেন, ‘স্পিকার, আপনাকে কড়া হেড মাস্টার নয়, নারীবান্ধব হিসেবে দেখতে চাই।’
এই পর্যায়ে রেহেনা আক্তার বলেন, ‘স্পিকার যদি সুযোগ দেন, তাহলে ৫০ নারী সদস্য অলংকার নয়, নারী সমাজের অহংকার হবেন। আপনি সাতবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আপনার মতো আমিও সাতবার এমপি হতে চাই।’
এর পর স্পিকার বলেন, বক্তৃতা করে সাতবার এমপি হতে পারবেন না। এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশে কাজ করুন। সাতবার নয়, ২৭ বার এমপি হতে পারবেন– ইনশাআল্লাহ।
