ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিপিডির সংলাপ

পোশাক খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিকল্প নেই

পোশাক খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিকল্প নেই
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:২৭

বিশ্ববাজারে দেশের তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে সবুজ শিল্পায়ন বা ‘ডিকার্বনাইজেশন’ এর বিকল্প নেই। সরকারও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামে শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা বলেছে। তবে বাস্তবে উদ্যোক্তাদের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হচ্ছে। শতাধিক সোলার প্যানেল ভর্তি কন্টেইনার বন্দরে পড়ে আছে স্রেফ শুল্কায়ন জটিলতায়। এনবিআর ও কাস্টমস যদি প্রথাগত ধারায় চলে, তাহলে তৈরি পোশাক শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর হবে না।

আজ রোববার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে এমন মত উঠে আসে।

সংলাপের মূল বিষয় ছিল ‘পোশাক খাতের শিল্প কারখানায় কার্বন নিঃসরণ কমানো: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ’। অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঞ্চালনায় পোশাক খাতের উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং গবেষকরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।

আলোচকরা বলেন, তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে সবুজ শিল্পায়ন বা ‘ডিকার্বনাইজেশন’ এর বিকল্প নেই। 

তবে এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর কাঠামো, উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে বড় বাধা হয়ে আছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সমন্বিত নীতি সহায়তা এবং সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

সংলাপে সিপিডির পক্ষ থেকে ৩৫০টি পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত একটি গবেষণার ফল উপস্থাপন করেন সংস্থার প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট সামী মোহাম্মদ। তিনি জানান, দেশের পোশাক কারখানাগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ করা গেলে গড় মাসিক জ্বালানি ব্যয় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমানো সম্ভব। এমনকি বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলেও গড় মাসিক ব্যয় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে।

সামী মোহাম্মদ বলেন, আমদানি করা এলএনজি ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পোশাকশিল্পের ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাপও বাড়ছে। এ কারণে পোশাকশিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার গতি বাড়ানো জরুরি।
গবেষণা থেকে তিনি জানান, দেশের পোশাক কারখানাগুলো বর্তমানে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক কিছু পদক্ষেপ নিলেও কাঠামোগত রূপান্তরের ক্ষেত্রে এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। বিশেষত, ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে আধুনিক ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির অভাব প্রকট।

গবেষণায় বলা হয়, যথাযথ প্রযুক্তি ও নীতি সহায়তা পেলে এই খাতের কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব, যা জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে।

বিজিএমইএর সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার ভিদিয়া অমৃত খান বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কেবল পণ্যের মান দেখছেন না, তারা দেখছেন পণ্যটি কতটুকু পরিবেশবান্ধব পরিবেশে তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘গ্রিন ডিল’ এবং ‘ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট’ এর মতো নতুন আইনগুলো আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। 
তিনি সতর্ক করে বলেন, আমরা যদি এখনই কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথে না হাঁটি, তবে বিশ্ববাজারে আমাদের পণ্যের চাহিদা কমে যাবে। ভিয়েতনাম বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের এখানে সৌর বিদ্যুৎ বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের ওপর এখনো উচ্চহারে শুল্ক ও ভ্যাট দিতে হচ্ছে।

বিএসআরইএর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, সরকার বাজেট বক্তৃতায় সোলার প্যানেলের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা বললেও বাস্তবে আমদানির সময় আমাদের নানা ধরনের কর দিতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১০০টির বেশি সোলার প্যানেলের কন্টেইনার বন্দরে আটকে আছে এবং বিপুল পরিমাণ জরিমানা গুনতে হচ্ছে।
এ ধরনের বাধা দূর করা না গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। তিনি শিল্প কারখানার জন্য ‘মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট’ এর লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানান।

সংলাপে উঠে আসা বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে কর ও অর্থায়ন ছাড়াও আরও বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জের কথা আলোচনায় উঠে আসে। বক্তারা জানান, ইপিজেডভুক্ত কারখানাগুলোতে নেট মিটারিং সুবিধা না থাকা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন পেতে যেখানে ১৫-২০ দিন লাগার কথা, সেখানে প্রায় ছয় মাস সময় লেগে যাচ্ছে।

এছাড়া ওয়াশিং ও ডাইংয়ের মতো তাপ-নির্ভর প্রক্রিয়ায় সৌরবিদ্যুৎ গ্যাস বা কয়লার বিকল্প হতে পারছে না। কারণ, বর্তমান প্রযুক্তিতে ইলেকট্রিক বয়লার অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পাশাপাশি ব্র্যান্ড বা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দিলেও তারা এই রূপান্তরের বিনিয়োগে কোনো অংশীদারিত্ব বা দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, বড় কারখানাগুলো কিছুটা সক্ষম হলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো প্রযুক্তিগত তথ্যের অভাব এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে ‘গ্রিন ট্রানজিশন’-এ পিছিয়ে পড়ছে।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, আমাদের গ্রিন ফান্ড বা সবুজ অর্থায়নের সুবিধা থাকলেও তা পাওয়া অত্যন্ত জটিল। ব্যাংকগুলোর সুদের হার এখন ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ছোট কারখানাগুলোর জন্য বহন করা অসম্ভব।

এছাড়া ইডকলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তিনি পরামর্শ দেন, নতুন শিল্প অঞ্চলে কেন্দ্রীয়ভাবে বয়লার ও এনার্জি ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম গড়ে তুললে কার্বন নিঃসরণ অনেক কম হবে।

ইডকলের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার জানান, ছোট কারখানাগুলোর জন্য তারা বিশেষ ঋণের ব্যবস্থার করার চেষ্টা করছেন। তবে কারখানাগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং পেমেন্ট গ্যারান্টির অভাবে অনেক সময় ঋণ ছাড় করতে দেরি হয়। এক্ষেত্রে বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর মতো সংগঠনগুলোর গ্যারান্টি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। 

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক শামীম মুনির উদ্দিন এবং পোশাক খাতের রপ্তানিকারক আশরাফ জামান দিপু।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ‘জরুরি জ্বালানি উন্নয়ন কমিটি’ গঠন করা প্রয়োজন। 

তিনি আরও বলেন, এই কমিটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে, যাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর এই রূপান্তর ত্বরান্বিত হয়। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সংকট আগামী এক দশকেও সহজে যাবে না। তাই, প্রতিটি কারখানাকে নিজস্ব সামর্থ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস খুঁজে নিতে হবে।

আরও পড়ুন

×