সময়ের সঙ্গে নেই জনপ্রশাসন
বাহরাম খান
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০
সময়ের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে ছুটতে পারছে না জনপ্রশাসন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে দেশজুড়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটেছে অনেক বেশি। সে তুলনায় জনবল কাঠামো বিন্যাসে জনপ্রশাসনে এখনও লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া। বাঁকে বাঁকে পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। যেন বাতির নিচে আঁধার! প্রতি বছর ব্যাচ ধরে গণহারে পদোন্নতি দেওয়ার আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে জনপ্রশাসনের কার্যক্রম। প্রশাসনের তিন শীর্ষ পদ উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবের অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) বিশ্নেষণ করে এমনই বিশৃঙ্খল চিত্র উঠে এসেছে।
অর্গানোগ্রামের চেয়ে এখন তিন থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব কর্মরত। এদের মধ্যে কে বা কারা কোন বিষয়ে পারদর্শী তা চিহ্নিত করার কার্যকর প্রক্রিয়া জনপ্রশাসনের নেই। মন্ত্রণালয় কিংবা বিভাগে মুখে মুখে খোঁজ নিয়ে কর্মকর্তা বাছাই করা হয়। ফলে সঠিক সময়ে, ঠিক জায়গার দক্ষ কর্মকর্তা খুঁজে পেতে নির্ধারকদের খেই হারাতে হচ্ছে। উদাহরণ টেনে জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খোদ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বেশ কয়েকটি অনুবিভাগ কয়েক মাস ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে চালাতে হয়েছে। কারণ যোগ্য কর্মকর্তার খোঁজ মিলছিল না। সম্প্রতি দু'জনকে নিয়োগ দেওয়া হলেও এখনও একাধিক অনুবিভাগ ভারপ্রাপ্তদের দিয়েই চলছে। অন্য অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগে প্রয়োজনের চেয়ে তিন-চার গুণ কর্মকর্তা কাজ করছেন।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী অতিরিক্ত সচিবের পদ আছে মাত্র দুটি। তবে এ বিভাগে কর্মরত রয়েছেন ১৪ অতিরিক্ত সচিব। স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগেও দুই অতিরিক্ত সচিবের জায়গায় কর্মরত আছেন ছয়জন। সড়ক পরিবহন বিভাগের অর্গানোগ্রামে অতিরিক্ত সচিবের একটি পদ থাকলেও দায়িত্ব পালন করছেন পাঁচজন।
পদ কম, পদোন্নতি বেশি: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলিয়ে বর্তমান প্রশাসনে অর্গানোগ্রামভুক্ত অতিরিক্ত সচিবের পদ আছে ১০০, যুগ্ম সচিবের পদ ২৭২ ও উপসচিবের পদ ৩৫০। এর বিপরীতে অতিরিক্ত সচিব পদে কর্মরত আছেন ৪২৭, যুগ্ম সচিব ৭১৬ ও উপসচিব হিসেবে ১ হাজার ৬৩৩ কর্মকর্তা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক বছরে একাধিক মন্ত্রণালয় ভেঙে নতুন বিভাগ হয়েছে। সেগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে থাকা সমন্বিত হিসাবে যোগ হয়নি। তাই বিদ্যমান অর্গানোগ্রামভুক্ত উল্লিখিত পদগুলোর সঙ্গে আরও কিছু পদ যোগ হয়েছে। তবে ঠিক কত পদ যুক্ত হয়েছে এর সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনিক কাঠামোতে যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদ দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদের কোনটিতে কত কর্মকর্তা প্রয়োজন, এর বিপরীতে কোন বছর কত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া প্রয়োজন তার পরিকল্পিত রূপরেখা জনপ্রশাসনের নেই। পদোন্নতির বহর বড় হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে ১০০ জনের বেশি পদোন্নতি না দেওয়ার রীতি চালু হয়েছে। তবু বড় পদোন্নতি থামানো যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একই ব্যাচকে দুই ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে পদোন্নতি। শেষ দুটি অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পদোন্নতির সময় এমন কৌশল নিতে দেখা গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাহীনতার বিষয়টি অনুভব করছেন নীতিনির্ধারকরাও। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সমকালকে বলেন, 'প্রশাসনে পিরামিড আকৃতিকে আদর্শ ধরা হয়। সে অনুযায়ী আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।' তবে প্রশাসনের পেট মোটা আকৃতি কেন দাঁড়িয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'প্রশাসনের কয়েকটি বড় ব্যাচের কারণে কিছুটা এমন মনে হতে পারে। এখন অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা দ্রুত অবসরে যাচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে এটা ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তি পদায়ন করতে পরিকল্পিত কাঠামো করা হচ্ছে। ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ের কাজ চলছে। এটা হলে এ ধরনের সমস্যা থাকবে না।'
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, 'প্রেষণ, লিয়েন, শিক্ষা ছুটি, অসুস্থতাসহ অনেক বিষয় বিবেচনায় কিছু কর্মকর্তা বাড়তি রাখতে হয়। সেসঙ্গে সরকারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ার কারণে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করতে হয়। এসব পদ অর্গানোগ্রামে যুক্ত নেই। এ কারণে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কর্মকর্তা মনে হচ্ছে।'
উপসচিব ও যুগ্ম সচিব পদোন্নতি শিগগির: বিদ্যমান অর্গানোগ্রামে উল্লিখিত তিনটি পদে তিন থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত কর্মকর্তা আছেন। এরপরও উপসচিব ও যুগ্ম সচিব স্তরে ব্যাচ ধরে পদোন্নতির কার্যক্রম চলছে। অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনের চেয়ে বাড়তি কর্মকর্তা থাকার পরও তাঁদের পদোন্নতি থেমে নেই। ২৬ ক্যাডারের মধ্যে প্রশাসন, পুলিশসহ কয়েকটি ক্যাডারে এভাবে পদোন্নতি হলেও অধিকাংশ ক্যাডারে পদ খালি থাকলেও পদোন্নতি হয় শামুকগতিতে।
পদোন্নতিপ্রত্যাশী প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁদের পদোন্নতির শর্ত পূরণ হয়েছে, তাই পদোন্নতি পাওয়া তাঁদের অধিকার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, 'যাঁরা পদোন্নতির শর্ত পূরণ করেছেন তাঁদের পদোন্নতি হওয়া উচিত। আগের গণহারের পদোন্নতির কারণে বর্তমান কর্মকর্তারা কেন বঞ্চিত হবেন?' তিনি আরও বলেন, 'প্রশাসনিক কাঠামোর পরিকল্পনা অনুযায়ী কতজন কর্মকর্তার প্রয়োজন সে অনুযায়ী যোগ্যতরদের পদোন্নতি দেওয়ার নিয়ম করা প্রয়োজন।'
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'পদোন্নতির সঙ্গে কৃচ্ছ্র সাধনের সম্পর্ক নেই। যাঁরা যোগ্য তাঁরা পদোন্নতি পাবেন।' প্রয়োজনের বেশি কর্মকর্তা থাকার পরও কেন পদোন্নতি প্রয়োজন, এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
তবু আক্ষেপ: গত ২৯ জুন যুগ্ম সচিব পদে এক দফা পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। দুই মাস না ঘুরতেই ২১ ব্যাচের উপসচিবদের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির তোড়জোড় শুরু হয়। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ব্যাচটির পদোন্নতি হতে পারে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একই বছরে দু'বার যুগ্ম সচিব পদোন্নতি হওয়ার বিষয়টিতে প্রশাসনের সিনিয়র-জুনিয়র দুই স্তরেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এরই মধ্যে প্রশাসনের ২৮তম ব্যাচের সিনিয়র সহকারী সচিবদের উপসচিব পদে পদোন্নতির কাজও চূড়ান্ত হয়ে আছে। কিছুদিনের মধ্যে উপসচিব পদে পদোন্নতি হতে পারে। কোনো কোনো সূত্র বলছে, উপসচিব ও যুগ্ম সচিব উভয় পদে একসঙ্গেও পদোন্নতি হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র সহকারী সচিব সমকালকে বলেন, 'প্রশাসনে পদোন্নতিতে যে ব্যাচের জোর যত বেশি, তারা তত দ্রুত পদোন্নতির লবিংয়ে এগিয়ে থাকে। কোনো কোনো ব্যাচ পদোন্নতির যোগ্য হওয়ার দেড়-দুই বছর পার হয়ে গেলেও ফাইল নড়ে না। আবার কারও ক্ষেত্রে পদোন্নতির যোগ্য হওয়ার পরপরই তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়'। এ কর্মকর্তা আরও বলেন, 'যদি প্রতি বছর উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবের পদোন্নতির একটি রূপরেখা থাকত তাহলে এসব বিষয় নিয়ে টেনশন করতে হতো না। এখন পদোন্নতির যোগ্য হওয়ার পর ব্যাচভিত্তিক সংগঠনগুলো মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ এসএসবির সদস্যদের কাছে বারবার দেখা করে সুপারিশ করতে থাকে। শীর্ষ প্রশাসনে এ ধরনের চর্চা ভালো লক্ষণ নয়।'
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) আব্দুস সবুর মণ্ডলের কাছে উপসচিব ও যুগ্ম সচিব পদোন্নতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, 'এসব পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলমান। কবে হবে সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়।'
- বিষয় :
- জনপ্রশাসন
