ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

বিডিবিও-সমকাল জীববিজ্ঞান উৎসব

জাতীয় পর্যায়ে চট্টগ্রামের ৩৯১ ময়মনসিংহের ২৪৩ শিক্ষার্থী

জাতীয় পর্যায়ে চট্টগ্রামের ৩৯১ ময়মনসিংহের ২৪৩ শিক্ষার্থী
×

শুক্রবার চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে জাতীয় জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অতিথিদের সঙ্গে বিজয়ীরা সমকাল

চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ ব্যুরো

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:৩৭

জীবন কী? করোনাভাইরাস কী? ডাইনোসরের ডিএনএ থেকে কি আরেকটি ডাইনোসর বানানো সম্ভব? থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত মা-বাবার সন্তানও ওই রোগ নিয়ে জন্ম নেবে কিনা? মানুষের রং কেন সাদা-কালো? যমজ সন্তানের চেহারা কেন অভিন্ন হয়? অটিস্টিক শিশু কেন জন্ম নেয়? জ্বর হলে শরীর কেন ব্যথা করে, সৃষ্টির আদিতে ভাইরাসের পোষকদেহ না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বংশবিস্তার হলো, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য মানুষের দেহে আনা সম্ভব কিনা? এমন মজার ও বুদ্ধিদীপ্ত তবে শিক্ষণীয় বহু প্রশ্ন ছিল স্কুল-কলেজের হাজারো শিক্ষার্থীর। জীববিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের জবাবও ছিল তেমনি রসময় ও জ্ঞানগর্ভের। সব মিলিয়ে গতকাল শুক্রবার বিজ্ঞানে তারুণ্যের স্পন্দন ও জয়ধ্বনি শোনা গেল বিডিবিও-সমকাল বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান উৎসবে চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের আয়োজনে। এবার চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার টিকিট পেয়েছে ৩৯১ জন। অন্যদিকে ময়মনসিংহ থেকে সুযোগ পেয়েছে ২৪৩ খুদে জীববিজ্ঞানী। বাংলাদেশে অলিম্পিয়াডের চূড়ান্ত পর্বে বিজয়ীরা জাপানে অনুষ্ঠেয় এবারের আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নেবে।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম অঞ্চলের উৎসব। বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান উৎসব, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আল ফোরকানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. রাখহরি সরকার। প্রধান আলোচক ছিলেন অধ্যাপক ডা. সুযত পাল। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. জি এম জাকির হোসেন, অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কথাপ্রকাশের প্রোগ্রাম অফিসার শাহরিয়ার মাহমুদ, আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাহেদ মাহমুদ, সমকাল চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান সারোয়ার সুমন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিটির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আদনান মান্নান, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক রেহেনা আক্তার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. লায়লা খালেদা, ড. সৌমিত্র চক্রবর্তী প্রমুখ। প্রশ্নোত্তর পর্বে অতিথি হিসেবে শিক্ষার্থীদের জীববিজ্ঞান নিয়ে জানা-অজানা মজার মজার প্রশ্নের উত্তর দেন অধ্যাপক ডা. বাসনা রানী মুহুরী, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজওয়ানুল হকসহ অতিথিরা।
দিনব্যাপী বিশাল এ আয়োজনে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৯৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুই হাজার ৬৬ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তিন ক্যাটাগরিতে প্রতিযোগিতা শেষে ঢাকায় জাতীয় পর্বে টিকিট পেয়েছেন ৩৯১ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে সেরাদের সেরা হয়েছে জুনিয়র ক্যাটাগরিতে কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল নাঈম, মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের শিক্ষার্থী তালহা জুবায়ের, উচ্চ মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে মহসীন কলেজের শিক্ষার্থী অতুন রায় চৌধুরী। ঢাকার টিকিট পাওয়া প্রত্যেক বিজয়ীর হাতে সার্টিফিকেট, মেডেল ও পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। এর আগে সকাল ৮টায় অতিথিদের নিয়ে বেলুন উড়িয়ে প্রতিযোগিতার বর্ণাঢ্য উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক দেবব্রত দাশ। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের পারবতী মডেল স্কুলের প্রবীণ শিক্ষক অরুণ কান্তি মজুমদারকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জীববিজ্ঞানী ড. রাখহরি সরকার বলেন, আমরা আমাদের জাতিকে গবেষণায় এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছি না। প্রতি বছর বিশ্বের ৭৫টি দেশ থেকে প্রতিযোগীরা বিশ্ব জীববিজ্ঞান উৎসবে অংশ নেন। সেখানে প্রতি দেশ থেকে চারজন করে শিক্ষার্থী অংশ নেন। এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতের জীববিজ্ঞানী তৈরি করা। এ খুদে জীববিজ্ঞানীরাই গবেষণার মাধ্যমে বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
শুক্রবার সকাল ৯টায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের উৎসব ও প্রতিযোগিতা। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. রনি মিয়া আঞ্চলিক জীববিজ্ঞান উৎসবে অংশ নেবে বলে সাইকেল চালিয়ে এসেছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অদম্য রনি মিয়ার মতো জীববিজ্ঞানের আকর্ষণে উৎসবে সামিল হয়েছিল ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা (জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ) এবং কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাড়ে ৮০০ শিক্ষার্থী। এখান থেকে ২৪৩ শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ে অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে উৎসবের উদ্বোধনকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. ইকরামুল হক টিটু। বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন বিডিবিও সভাপতি অধ্যাপক শহীদুর রশীদ ভূইয়া ও সমকালের পতাকা উত্তোলন করেন ময়মনসিংহ ব্যুরোর স্টাফ রিপোর্টার মীর গোলাম মোস্তফা। অলিম্পিয়াডের আঞ্চলিক আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. ছোলায়মান আলী ফকির, প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল হক প্রমুখ। আমন্ত্রিত অতিথিরা বেলুন উড়িয়ে উৎসবের সূচনা করেন।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. ইকরামুল হক টিটু প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বলেন, আমরা আধুনিক বিশ্বের যে সুযোগ-সুবিধাগুলো ভোগ করছি, তা সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমেই। আর এ বিজ্ঞানের অন্যতম বিষয় হলো জীববিজ্ঞান, যার অবদান অপরিসীম। আজ সারাদেশে খাদ্য ঘাটতি দূর হয়েছে জীববিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমেই। এ জীববিজ্ঞান উৎসব খাদ্য ঘাটতি ও পুষ্টির চাহিদা নিরসনে নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশ বায়োলজি অলিম্পিয়াডের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশিদ ভূঁইয়া বলেন, মানুষ বিজ্ঞানের মধ্যেই বসবাস করছে। আমরা বিজ্ঞানময় পরিবেশে থেকে প্রতিনিয়ত বিজ্ঞান চর্চা করতে চাই। বিজ্ঞানের নন্দনতত্ত্বকে উন্মোচন করতে চাই। সে জন্যই এমন আয়োজন অবশ্যই দরকারি।
পরে অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা এক ঘণ্টার পরীক্ষায় অংশ নেয়। পরীক্ষা শেষে দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেডিয়ামে সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মো. জসিমউদ্দিন খান। তিনি বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন শিক্ষার্থীদের মনন ও চিন্তায় বিজ্ঞানমস্ক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে অতিথি ছিলেন অধ্যাপক শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া, বিশেষ অতিথি ছিলেন ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. ছোলায়মান আলী ফকির, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. আমিনুল হক ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার।
ময়মনসিংহ অঞ্চলে জুনিয়র ক্যাটাগরিতে ১০৫ নম্বর পেয়ে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন নেত্রকোনার আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আশরাফুল মীর মাহিন। এ ছাড়া জুনিয়র ক্যাটাগরিতে নেত্রকোনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের রুফাইদা ফাতেমা, জেনিফা জাফরিন নুহা, দেবশ্রী তালুকদার ও সামিয়া রহমান রিতু, ময়মনসিংহ জেলা স্কুলের অর্ণব দাশ, বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সুমাইয়া সাদাত রদিয়া, ফুলপুর পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নাজমুন নাহার, ইফফাত আরা ইমা ও আনিকা তাবাসসুম, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ বিদ্যালয়ের মুবাচ্ছিরা রিয়ান এবং দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের মো. আরিয়ান কবীর সরকার চ্যাম্পিয়ন হয়। এ ছাড়া জুনিয়র ক্যাটাগরিতে ৩১ জন প্রথম রানার্সআপ এবং ৫২ জন দ্বিতীয় রানার্সআপ হয়েছে।
সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে ১১২ নম্বর পেয়ে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ফুলপুর পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের মো. ফিজুল কবীর জিশান। এ ছাড়া সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তাহেরা তাবাসসুম জেরিন, মাইশা মালিহা, নাফিসা আঞ্জুম অমি ও আদিবা আলাম আইভি, জামালপুর জিলা স্কুলের মো. মফিজুল হাসান, ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের স্বপ্নীল আচার্য, তাহশিন নেহাল ও মাশরুর মুরসালিন অর্ণব, ফুলপুর পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সাকিব আল মাহমুদ, জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের হাবিবা আক্তার রিমি এবং আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নোহান কবীর সরকার চ্যাম্পিয়ন হয়। এ ছাড়া সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে ৩৪ জন প্রথম রানার্সআপ এবং ৪৪ জন দ্বিতীয় রানার্সআপ হয়।
হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে ৭৯ নম্বর পেয়ে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের এম ফারহান ইসমাম। এ ছাড়া হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজের শ্রীয়া চক্রবর্তী, মুনিরা নাহার স্নিগ্ধা, তাসফিয়া রহমান উর্বী, মারিয়াম ইয়াসমিন, রামিসা ফারিহা ঐশী, তাসফিয়া তাবাসসুম তিবা ও মাইশা রহমান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হুমাইরা ইসলাম, গুরুদয়াল সরকারি কলেজের নওশিন আনবির মাইশা, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজের মো. আরিফুর রহমান, নেত্রকোনা সরকারি কলেজের সাদিয়া জাহান পুনম এবং ময়মনসিংহের নটর ডেম কলেজের মো. আতিক হাসান চ্যাম্পিয়ন হন। এ ছাড়া হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে ২০ জন প্রথম রানার্সআপ এবং ২৫ জন দ্বিতীয় রানার্সআপ হয়েছেন।
এ আয়োজনে বিশেষ সহযোগী কথাপ্রকাশ ও কারিগরি সহযোগী ল্যাববাংলা। সার্বিক সহযোগিতা করেছেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনজাইমের সদস্যরা।



আরও পড়ুন

×