আর্থকোয়াক অ্যালার্ট
ভূমিকম্পের আগেই সংকেত
সাব্বিন হাসান
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১১:২২ | আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ | ১১:২২
হঠাৎ করেই মোবাইল জানান দিল– রেড অ্যালার্ট, টেক অ্যাকশন, আর্থকোয়াক! বিপর্যয়ের আগে এমনই বার্তা পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার হাজারো বাসিন্দা। ভূমিকম্প নাকি আগে থেকে বোঝা যায় না। তবে কেমন করে এমন আগাম সতর্কবার্তার কথা বলল গুগল?
কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে জোড়া ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে পুরো ভেনেজুয়েলা। স্থানীয় সময়ের হিসাব বলছে, ২৪ জুন, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে প্রথম যে কম্পন অনুভূত হয়, রিখটাল স্কেলে তার মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২। আর দ্বিতীয়বারেরটা ছিল ৭ দশমিক ৫ মাত্রার।
মাত্র ৩৯ সেকেন্ড থেকে এক মিনিটের মধ্যে তছনছ হয়ে গেছে রাজধানী কারাকাস, লাগুয়েরা ছাড়াও কয়েকটি প্রদেশ। সর্বশেষ হিসাব বলছে, মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে; নিখোঁজ ৫০ হাজার। ধ্বংসযজ্ঞের কয়েক সেকেন্ড আগে অনেকেই এই আগাম বিপর্যয়ের উপস্থিতি জানতে পেরেছিলেন। ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগেই গুগল থেকে জানানো হয় সেই সতর্কবার্তা। এতেই প্রশ্ন উঠেছে– ভূমিকম্প হওয়ার আগে কীভাবে এই বার্তা অনুমান করল গুগল? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর রহস্য লুকিয়ে আছে স্মার্টফোনের ভেতরেই। এখন প্রায় সব স্মার্টফোনেই বিশেষ সেন্সর রয়েছে, যার নাম অ্যাক্সেলেরোমিটার। ভূমিকম্পের আগে এই অ্যালার্ট দেওয়ার নেপথ্যে কাজ করে এই সেন্সর।
কীভাবে কাজ করে সেন্সর
আসলে অ্যান্ড্রয়েড ফোনের অ্যাক্সেলেরোমিটার সেন্সর এমন কোনো কম্পন– যা স্বাভাবিক নয়, ভূমিকম্পের প্রাথমিক কম্পনের মতো মনে হয়– সেটি বুঝতে পারলেই তাৎক্ষণিক অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়াক অ্যালার্ট সিস্টেম গুগলকে বিপদ সংকেত প্রেরণ করে। শুধু সংকেত নয়; বরং কোন জায়গা থেকে তা আসছে, তাও ট্র্যাক করতে পারে ওই সেন্সর।
এ রকম একটি জায়গা থেকে একই সময়ে একাধিক সংকেত এলে গুগলের সার্ভার তা বিশ্লেষণ করে ও বুঝতে পারে, ওই এলাকায় ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। এরপর সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যারা সিস্টেমে যুক্ত থাকেন, তাদের কাছে দ্রুত আর্থকোয়াক অ্যালার্ট পৌঁছে দেওয়া হয়। সারাবিশ্বে এখন ২০০ কোটির বেশি অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে এই ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এটি কার্যত বিশ্বের বৃহত্তম ডিস্ট্রিবিউটেড সিসমোগ্রাফ বা ভূমিকম্প শনাক্তকরণ নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। আগাম কম্পনের ডেটা বিশ্লেষণ করার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু জটিল পদ্ধতি। ভূমিকম্প কখনোই একবারে হয় না; বরং কম থেকে বেশি কয়েক ধরনের তরঙ্গের ধাক্কায় ভূমিকম্প হয়।
প্রাইমারি ওয়েভ
প্রথমেই আসে পি-ওয়েভ। এই তরঙ্গের গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ছয় কিলোমিটার। দ্রুতগতির হলেও তুলনামূলকভাবে এটি কম শক্তির।
সেকেন্ডারি ওয়েভ
এরপর আসে এস-ওয়েভ। এর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার হলেও এটি খুব ধ্বংসাত্মক ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী।
এবার স্মার্টফোনের সেন্সর প্রথমে পি-ওয়েভ শনাক্ত করে গুগলকে সংকেত পাঠায়। সেই সংকেত আলোর গতিতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সার্ভারে পৌঁছে যায়। অন্যদিকে, ভূমিকম্পের ধ্বংসাত্মক এস-ওয়েভ তুলনামূলক ধীরগতিতে এগোয়। ফলে গুগল কয়েক সেকেন্ড সময় পায় ডেটা বিশ্লেষণ করে সতর্কবার্তা পাঠানোর জন্য।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল যদি আপনার অবস্থান থেকে ৩৪১ কিলোমিটার দূরে হয়, তবে আশপাশের ডিভাইসের অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়াক অ্যালার্ট সিস্টেম প্রথমে ‘পি’ ওয়েভ শনাক্ত করে গুগলের কাছে তার ডেটা পৌঁছে দেয়। গুগল ভূমিকম্পের শক্তিশালী ‘এস’ আকৃতির তরঙ্গ আপনার কাছে পৌঁছানোর আগেই সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেয়।
অ্যান্ড্রয়েডে সতর্কবার্তা
অ্যান্ড্রয়েড সিস্টেমে আর্থকোয়াক অ্যালার্ট সিস্টেম মূলত দুটি পদ্ধতিতে সতর্কবার্তা জানায়। কোনো জায়গায় হালকা কম্পন অনুভূত হলে ‘বি অ্যাওয়ার অ্যালার্ট’ বার্তা পাঠানো হয়। এর উদ্দেশ্য, আগাম ভূমিকম্পের সংকেত দিয়ে সতর্ক করা। অন্যটি পাঠানো হয় মাঝারি বা শক্তিশালী কম্পনের ক্ষেত্রে। টেক অ্যাকশন অ্যালার্ট পাঠানোর মাধ্যমে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সতর্কতা দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়; সতর্কবার্তার মেসেজে ক্লিক করলে ভূমিকম্পের অবস্থান, সম্ভাব্য মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে জানা যেতে পারে।
আর্থকোয়াক অ্যালার্ট সিস্টেম
গুগলের অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়াক অ্যালার্ট সিস্টেম ২০২৩ সাল থেকেই সক্রিয়। অ্যান্ড্রয়েড ফাইভ বা তার পরের আপডেটে এই পরিষেবা পাওয়া যায়। কিন্তু আগাম সতর্কবার্তা পেতে হলে অবশ্যই স্মার্টফোনে মোবাইল ডেটা বা ওয়াই-ফাই সংযোগ সক্রিয় থাকতে হবে।
আগাম বার্তা কেন জরুরি
ভূমিকম্প কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের আগাম সতর্কতা জীবন রক্ষায় অনেক সহায়ক হতে পারে।
