ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

বেড়ে উঠছে হুছাইয়ের স্বপ্ন

বেড়ে উঠছে হুছাইয়ের স্বপ্ন
×

হাসনাইন ইমতিয়াজ আলীকদম থেকে ফিরে

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:০৪

বান্দরবানের লামা থেকে আলীকদমের দিকে যে পথটি চলে গেছে তার মাঝামাঝি রেফারপাড়ি। এখানে সড়কের দুই পাশে বৃক্ষ ছাওয়া সবুজ টিলা আর পাহাড়। আলীকদমের রেফারপাড়ি পাড়ায় হুছাই মারমার বাড়ি। শরীরজুড়ে খেটে খাওয়ার ছাপ স্পষ্ট। দেখা হতেই সরল হাসি দিয়ে স্বজনের মতো আপন করে নিলেন। এরপরই শোনালেন নিজের স্বপ্ন-সাফল্য আর বেদনার কথা। বললেন, কীভাবে গাছ তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। মানুষের নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে দেশ তথা বিশ্বের পরিবেশ যখন বিপর্যয়ের মুখে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে সবাই, বেড়ে চলছে বেকারত্ব, তখন চল্লিশ বছর বয়সী হুছাই মারমা বৃক্ষরোপণেই স্বাবলম্বিতার স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছেন। পেশায় কৃষক হুছাই গাছপালা কাটার কারণে পাহাড়ধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় যে বাড়ছে, সেটি অনুধাবন করেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ গভীর চিন্তায় ফেলেছে তাকে। তাই বনায়নকে জীবিকার পাশাপাশি সামাজিক কর্তব্য হিসেবে বেছে নেন।

তিনি সমকালকে বলেন, আমাদের প্রয়োজনেই বনকে টিকিয়ে রাখতে হবে। যেভাবে বন উজাড় হচ্ছে, তাতে পাহাড় ও পরিবেশ টিকবে না। তাই আমাদেরই এই বন গড়তে হবে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয়দের জীবিকার একটি বড় অংশই আসে বনের কাঠ সংগ্রহ করে। তবে এখন কাঠ সংগ্রহের পাশাপাশি বনায়নও হচ্ছে।

তিন বছর আগে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি থেকে আট হাজার চারা নিয়ে বনায়ন শুরু করেন হুছাই মারমা। আলীকদমের রেফারপাড়ির মহাসড়কে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রায় তিন বছর আগে বনায়ন প্রকল্প থেকে গাছের চারা নিয়ে বাগান করি। এখন বেশ বড় হয়ে উঠেছে গাছগুলো। কাঠের গাছ কাটতে আরও ৩ থেকে ৪ বছরের মতো লাগবে। তবে গাছের ডালপালা কেটে যে লাকড়ি আসছে, তা দিয়ে দৈনন্দিন জ্বালানির চাহিদা মিটছে, পাশাপাশি তামাক পোড়ানোর কাজেও ব্যবহার হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক বনের ওপর চাপ কমছে। হুছাই অনুমান করে জানান, প্রায় আট থেকে ১০ লাখ টাকার গাছ রয়েছে তার বাগানে। এরপরও প্রতি বছরই নতুন গাছ রোপণ করা হচ্ছে।

পাত্তাখাইয়াতে নিজের পাঁচ একর পাহাড়ি বাগানে গাছগুলো লাগিয়েছেন তিনি। সেখানে বেলজিয়াম, একরাশি, রেইনট্রির মতো কাঠের গাছ রয়েছে। রয়েছে কলা, পেঁপে, কমলালেবুর মতো ফলের গাছ।

হুছাই বলেন, দেশে আসবাব, ইটভাটার জ্বালানি, নির্মাণসহ বিভিন্ন শিল্পে কাঠের যে চাহিদা, এর একটা বড় অংশই মেটে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বন থেকে। দিন দিন এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা সবাই মিলে যদি বৃক্ষরোপণ করি, তবে অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বনের ভারসাম্য আবার আগের মতো ফিরে আসবে।

এক মেয়ে ও এক ছেলের বাবা হুছাই মারমা বলেন, নিজের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য পাইনি। তবে ছেলেমেয়েকে ভালোভাবে বড় করতে চাই। ভালো স্কুল-কলেজে পাঠাতে চাই। সে ক্ষেত্রে এই গাছগুলোই আমার সম্বল।

বিএটি বাংলাদেশের এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুধু হুছাই মারমাদের স্বপ্নই গড়ে দিচ্ছে না, সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে। টেকসই বনায়ন এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার অগ্রযাত্রায় সহযোগিতা করছে। আগামী ৫ বছরে দেশে ২০ শতাংশ বনায়ন তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ভূমিকা রাখছে হুছাই মারমাদের বনায়ন।

হুছাই মারমার প্রতিবেশী সবজি বিক্রেতা রুবেল বলেন, এখন রেফাড়পারি, তারাবুনিয়া ও কাঁকড়াঝিড়ি এলাকার অনেকেই গাছ লাগানোয় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। কৃষিকাজের পাশাপাশি বনায়ন তাদের নতুন স্বপ্ন বুনতে সহায়তা করছে।


আরও পড়ুন

×