সাফল্য
দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে সবুজের বনসাই
ইজাজ আহমেদ মিলন, গাজীপুর
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:০৬
বনসাই নিয়ে মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল কে এম সবুজের মাতামাতিটা। অতিষ্ঠ হয়ে
উঠেছিল পুরো পরিবার। একপর্যায়ে পরিবার থেকেও কিছুদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে
পড়েছিলেন। কিন্তু থেমে যাননি। বনসাই শিল্পকর্ম সাধনায় ছেদ ঘটাননি এক দিনের
জন্যও। বনসাইয়ের প্রেমে পড়েছিলেন সবুজ কৈশোরে পা রাখার আগেই। এরই মধ্যে
পেরিয়ে গেছে দুই যুগ। গাজীপুরের কোনাবাড়ীর আমাবাগ এলাকায় তার নার্সারিতে
বর্তমানে সাড়ে চারশ' দেশি-বিদেশি প্রজাতির ২০ হাজারের ওপরে বনসাই ও চারাগাছ
রয়েছে। রয়েছে অন্যান্য গাছের চারাও। সফলতার আকাশ তিনি স্পর্শ করেছেন বহু
আগেই। দেশসেরা বৃক্ষগবেষক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্বীকৃতিও
পেয়েছেন এরই মধ্যে।
তার পুরো নাম খান মুহাম্মদ সবুজ। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বনসাই তৈরি
করছেন। তার হাতে তৈরি লাখ লাখ বনসাই ছড়িয়ে আছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে।
মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ার চরপাথালিয়া গ্রামের নূর মুহাম্মদ খানের ছেলে কে
এম সবুজ ছোটবেলায় সিলেটে বেড়াতে গিয়েছিলেন একবার। ঘটনাটি ১৯৯৬ সালের গোড়ার
দিকে। সিলেট শহরে এক নার্সারিতে একটি বনসাই দেখেন তিনি। সেটার প্রেমে পড়ে
যান তখন। বাসায় ফিরে ভাইয়ের কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে চারটি তেঁতুলের চারা
কিনে বনসাই চর্চার যাত্রা শুরু করেন। পৈতৃক ভিটা গজারিয়া হলেও তার পুরো
পরিবার ঢাকায় থাকে অনেক আগে থেকেই। পড়াশোনার পাশাপাশি বাসার ছাদ, বারান্দা ও
আঙিনা একসময় ভরে যায় বনসাইয়ে। কিন্তু লাভবান হতে পারছিলেন না। এরই মধ্যে
১০-১২ বছর চলে যায়। পরিবারের সদস্যরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন একসময়। পরিবার থেকে
একপর্যায়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তিনি। ঠিক সে সময়টাতে একটা বনসাই ৪০ হাজার
টাকায় বিক্রি করে বদলে যায় তার ভাগ্যের চাকা। এর পর আর পেছন ফিরে তাকাতে
হয়নি। পরিবারের কাছে আবার ফিরে যান। তাদের কাছে বেড়ে যায় সবুজের কদরও। বৃহৎ
পরিসরে নতুনভাবে শুরু করেন বনসাই উৎপাদন। এরই মধ্যে একটি বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করে ফেলেন। প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ঢাকা, মালয়েশিয়া
ও চীন থেকে। কে এম সবুজ বলেন, 'প্রথম দিকে সমাজ ও পরিবার থেকে উৎসাহ না
পেলেও পরবর্তী সময় সফলতা দেখে সবাই অনুপ্রেরণা দেয় আমাকে। লাখ লাখ টাকায়
বিক্রি করতে থাকি বনসাই। বনসাই একটি শিল্পকর্ম। বছরের পর বছর ছোট একটি
পাত্রে রেখে পরিচর্যা করা হয় গাছ। পর্যায়ক্রমে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়।'
একসময় গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী এলাকায় শ্বশুরের জমিতে বাণিজ্যিকভাবে
বনসাই উৎপাদন শুরু করেন সবুজ। কয়েক বছরের মধ্যেই বাগান বাড়তে থাকে তার।
বর্তমানে বাড়ির উঠান থেকে শুরু করে দুই বিঘা জমি ও দুটি ভবনের ছাদে বনসাই
উৎপাদন করছেন তিনি। এ বাগানে প্রায় সাড়ে চারশ' দেশি-বিদেশি প্রজাতি গাছের
২০ হাজারেরও ওপরে বনসাই ও গাছের চারা রয়েছে। তিনি বলেন, 'এরই মধ্যে চীন,
মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে বনসাই যেতে শুরু করেছে আমার। লাখ লাখ
টাকা মূল্যের বনসাই রয়েছে আমার বাগানে। প্রতিদিন অন্তত ১০ জন শ্রমিক কাজ
করেন এখানে।'
নিজের বাগানে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের চারা তিনি বিনামূল্যেও বিতরণ করেন।
ভ্যানগাড়ি নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তিনি এসব চারা বিতরণ করে পরম
তৃপ্তি পান।
চলতি বছর ২০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন
কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ মেলা ও বৃক্ষরোপণ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে
সবুজকে বৃক্ষ সংরক্ষণ, উদ্ভাবন ও গবেষণা ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করেন।
এই বনসাই নিয়ে বহুদূর যেতে চান সবুজ। এই বনসাই-ই যে তার
ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা।
- বিষয় :
- সাফল্য
