ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা

বেসরকারি হাসপাতালও যুক্ত করতে হবে

বেসরকারি হাসপাতালও যুক্ত করতে হবে
×

রাজবংশী রায়

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:০৭ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার নতুন করে আরও ৪১ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে আরও পাঁচজনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ার ফলে দেশব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৬ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে তা দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে। পুরো দেশে বর্তমানে কার্যত 'লকডাউন' চলছে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলায় সবার আগে সামনে আসছে চিকিৎসার দিকটি। তবে চিকিৎসার অপ্রতুলতার বিষয়টি এখন সবার মুখে মুখে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাণঘাতী এই ভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ যে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে তা অপ্রতুল। স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৮০ শতাংশজুড়ে অবস্থান করা বেসরকারি ব্যবস্থাপনাকে এখনও কাজে লাগানো হয়নি। অন্যদিকে দেশে করোনা সংক্রমণের পর পরই বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল রোগীশূন্য হয়ে পড়েছে। আবার কোনো কোনো হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিকরা নিজ উদ্যোগে তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছেন।
এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা চিকিৎসকরাও তাদের চেম্বার বন্ধ রেখেছেন।
এ অবস্থায় সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবায় যুক্ত করার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক সমকালকে বলেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবার ৭০ থেকে ৮০ ভাগ চাহিদা বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের মাধ্যমে পূরণ হয়। তবে করোনা রোগীদের চিকিৎসার বিষয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে এখনও তেমনভাবে যুক্ত করা হয়নি। কেন করা হয়নি, তা স্বাস্থ্য বিভাগ ভালো বলতে পারবে। তবে আমার প্রস্তাব হচ্ছে, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মালিকদের সংগঠনের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হাসপাতাল মালিকরাই সরকারকে জানাবে, কোন হাসপাতালগুলোকে তারা করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবার জন্য ছেড়ে দিতে চান। এভাবে সারাদেশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও যুক্ত করতে হবে। কারণ বিশ্বব্যাপী পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ পদ্ধতি চালু আছে। সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত ভাবতে হবে।
ডা. মোজাহেরুল হক আরও বলেন, করোনায় গুরুতর সংক্রমণের শিকার রোগীদের চিকিৎসার এক পর্যায়ে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশেও অনেক রোগীর জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। সরকারকে সে বিষয়েও ভাবতে হবে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কী পরিমাণ আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা আছে, সেগুলোর তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। এরপর প্রয়োজন হলে ঋণ সুবিধা অথবা বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ট্যাক্স মওকুফ করে বিদেশ থেকে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাদেশের আটটি বিভাগে মোট পাঁচ হাজার ৯২৬টি সাধারণ শয্যা ও ৯৮টি আইসিইউ শয্যার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় এক হাজার ৫৫০টি সাধারণ শয্যা এবং ৬৭টি আইসিইউ শয্যা এবং ঢাকার বাইরে সাতটি বিভাগে চার হাজার ৩৭৬ সাধারণ শয্যা এবং ৩১ শয্যাবিশিষ্ট আইসিইউর প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলো এখনও প্রস্তুত হয়নি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৬৫৪ হাসপাতালে ৫১ হাজার ৩১৬টি শয্যা রয়েছে। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পাঁচ হাজার ৫৫ হাসপাতাল-ক্লিনিক মিলিয়ে মোট শয্যা ৯০ হাজার ৫৮৭টি। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে মোট এক হাজার ১৭৬টি আইসিইউ শয্যা আছে। সরকারিতে আছে ৪৩২টি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখের মতো শয্যা রয়েছে। এখান থেকে এক-তৃতীয়াংশ শয্যা করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবার জন্য প্রস্তুত করা যেতে পারে। কারণ চীন, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, ওই সব দেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এবং মহামারি আকার ধারণ করেছে। আমরাও কিন্তু সেদিকে যাচ্ছি। সুতরাং প্রস্তুতি নিতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যবস্থাপনাকে দ্রুত কাজে লাগানোর বিষয়ে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। দেশে অনেক বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল আছে। সেখানে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধাও রয়েছে। তবে সব মিলিয়ে যে পরিমাণ আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর আছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এগুলো কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্তও দ্রুতই নিতে হবে।
সরকারের পদক্ষেপ : করোনা সংক্রমণের বিষয়টি সামনে রেখে স্বাস্থ্য বিভাগ সারাদেশে চিকিৎসা পরিধি বিস্তৃত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত ৩০ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য এ-সংক্রান্ত একটি তালিকাও তৈরি করা হয়। আটটি বিভাগের তালিকায় থাকা হাসপাতালগুলো হলো-
ঢাকায় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, কমলাপুর রেলওয়ে হাসপাতাল, বাবুবাজারের মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, মিরপুর লালকুঠি হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। এই ছয়টি হাসপাতালে এক হাজার ৪০০ শয্যা রয়েছে। একই সঙ্গে আইসিইউ শয্যা আছে মাত্র ৫৬টি। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখা এবং কাঁচপুরের সাজেদা ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ১৫০ সাধারণ শয্যা এবং ১১টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জে কোনো হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
এছাড়া চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ব্রা?ণবাড়িয়া, ফেনী, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চাঁদপুর, নোয়াখালী প্রভৃতি এলাকায় সর্বমোট ৮২৮ শয্যার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই হাসপাতালগুলোর মধ্যে একমাত্র চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে। এই বিভাগে কোনো আইসিইউ শয্যা নেই।
ময়মনসিংহে ৮৫০ শয্যার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি আইসিইউ রয়েছে। এই বিভাগের নেত্রকোনো ও জামালপুরে কোনো হাসপাতাল নেই।
বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী মিলে ৫৪১ শয্যার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বিভাগে কোনো আইসিইউ সুবিধা নেই। একই সঙ্গে পিরোজপুর জেলায় কোনো হাসপাতাল নেই।
সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জের নাম থাকলেও কোনো শয্যা উল্লেখ নেই। এমনকি কোনো হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার কথাও উল্লেখ নেই।
রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বগুড়া মিলে মোট এক হাজার ২০০ শয্যার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বিভাগে মাত্র পাঁচটি আইসিইউ শয্যার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
খুলনার ১৫০ শয্যার ডায়াবেটিক হাসপাতাল এবং পাঁচ শয্যার আইসিইউ প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বাইরে বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, যশোর, নড়াইল ও মাগুরা জেলায় কোনো হাসপাতালের নাম প্রস্তাব করা হয়নি।
রংপুর কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, লালমনিহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, গাইবান্ধা মিলে ৭৮৭ শয্যার প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আট বিভাগে চার হাজার ৩৭৬ সাধারণ শয্যা এবং ৩১ আইসিইউ শয্যার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য কিছু হাসপাতালের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মালিকদের একটি সংগঠন আছে, তাদের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।




আরও পড়ুন

×