ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

তিন ঘণ্টা ও ১০০ নম্বরে ধরাশায়ী পরীক্ষার্থী

তিন ঘণ্টা ও ১০০ নম্বরে ধরাশায়ী পরীক্ষার্থী
×

এসএসসিতে ভালো ফলের খবরে উচ্ছ্বসিত ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা- সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৩ | ২৩:১৭ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৩ | ২৩:১৭

গেল বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষা হয়েছিল ছোট সিলেবাসে। পূর্ণমান ছিল ৫০ নম্বর। পরীক্ষার সময়ও ছিল কম, দুই ঘণ্টা। অল্প সিলেবাস ও নম্বরের স্বল্প সময়ের এ পরীক্ষায় অনেকটা অনায়াসেই বেশি নম্বর তুলেছিল গতবারের পরীক্ষার্থীরা। তবে এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার চিত্র ভিন্ন। এবার কিছুটা পুনর্বিন্যাস করা সিলেবাসে পরীক্ষায় বসতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। পূর্ণমান ১০০ নম্বরই ছিল। পরীক্ষাও হয়েছে তিন ঘণ্টা। পূর্ণ সময়ের ১০০ নম্বরের পরীক্ষাতেই এবার ধরাশায়ী হয়েছে শিক্ষার্থীরা। গতবারের চেয়ে এবার পাসের হার কমেছে ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ। আর জিপিএ ৫ কমেছে ৮৬ হাজার ২৪ জন। বহু মেধাবী শিক্ষার্থী এবার জিপিএ ৫ পায়নি। কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে তাদের মন ভার।

পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করেছিল, তাদের পরীক্ষাও আগের ব্যাচের মতো ছোট সিলেবাস এবং সংক্ষিপ্ত নম্বরে নেওয়া হবে। তবে করোনা কেটে যাওয়ায় সে পথে আর হাঁটেনি শিক্ষা বোর্ড। পুনর্বিন্যাস করা সিলেবাস হলেও ১০০ নম্বরের তিন ঘণ্টার পরীক্ষার কারণে তারা আগের বছরের শিক্ষার্থীদের মতো বেশি নম্বর তুলতে পারেনি।

গতকাল প্রকাশিত পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফল বিপর্যয় ঘটেছে। পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে মানবিকের ফল। প্রতিটি বোর্ডেই পিছিয়ে আছে তারা। সব বোর্ড মিলে মানবিক বিভাগের মোট শিক্ষার্থীর মাত্র শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ ছাত্রছাত্রী এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে। বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগের ২৭ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ২ দশমিক ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছে। গড় পাসের হারেও মানবিক বিভাগ সবচেয়ে পিছিয়ে। জাতীয়ভাবে এবার পাসের হার ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ হলেও মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৭১ দশমিক ৭২ শতাংশ।

পাসের হারে এবার সবচেয়ে পিছিয়ে সিলেট শিক্ষা বোর্ড। কেন এ অবস্থা জানতে চাইলে সিলেট বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রমা বিজয় সরকার সমকালকে বলেন, মানবিকের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি খারাপ করেছে। বিশেষ করে গণিত বিষয়ে তারা দুর্বল। মানবিকের শিক্ষার্থীদের গণিতভীতি দূর করতে আমি পদক্ষেপ নেব।

গত বছরের চেয়ে পাসের হার ও জিপিএ ৫ কমলেও এটাকে ‘স্বাভাবিক ফল’ বলেই মনে করছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি বলেন, করোনার আগের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাসের হার ও জিপিএ ৫ দুটি এমনই ছিল। মহামারির কারণে ২০২১ ও ২০২২ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও কম বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছিল। তাই শিক্ষার্থীরা এক ধরনের সুবিধাও পেয়েছিল। যেটা এ বছর ছিল না। এ জন্য পাসের হার ও জিপিএ ৫ কমেছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার সমকালকে বলেন, করোনার পর এবারই পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা হয়েছে। এ জন্য পাসের হার স্বাভাবিক সময়ের মতো হয়েছে। করোনার আগে ২০২০ সালে পাসের হার এ রকমই ছিল। এটাই স্বাভাবিক ধরা হয়। গত দুই বছর সংক্ষিপ্ত সিলেবাসসহ নানা ধরনের ছাড় দেওয়ায় পাসের হার বেশি ছিল। এবার সেই সুযোগ হয়নি।

করোনার আগের ফল বিশ্লেষণ করেছে সমকাল। দেখা যায়, ২০১৮ সালে গড় পাসের হার ছিল ৭৭.৭৭ শতাংশ। সে বছর জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন। ২০১৮ সালের ওই পাসের হার ছিল এর আগের ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার। সেবার সারাদেশে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৪৭০ শিক্ষার্থী ফেল করেছিল।

২০১৯ সালে পাসের হার আগের বছরের চেয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ। তবে ধস নামে জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে। ২০১৮ সালের চেয়ে সারাদেশে জিপিএ ৫-প্রাপ্ত শিক্ষার্থী কমে যায় ৫ হাজার ৩৫ জন। ওই বছর মোট জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৫ হাজার ৫৯৪ জন। ২০১৯ সালের ফলে দেখা যায়, ছয় বছরের মধ্যে সেবারই প্রথম আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের জিপিএ ৫ প্রাপ্তি লাখের নিচে নেমে আসে।

২০২০ সালের ফলে দেখা যায়, করোনার দুর্যোগের মধ্যেও বড় সাফল্য এনেছিল শিক্ষার্থীরা। মোট গড় পাসের হার ছিল ৮২.৮৭ শতাংশ। আর জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন। আগের বছরের চেয়ে ২০২০ সালে পাসের হার যেমন বাড়ে, জিপিএ ৫ প্রাপ্তি বাড়ে প্রায় ৩০ হাজার। ওই বছর জিপিএ ৫ প্রাপ্তি আগের পাঁচ বছরের রেকর্ড ভাঙে।

ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেই এ বছর ফেল করেছে সবচেয়ে বেশি। আবার জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতেও শীর্ষে এই বোর্ড। এর কারণ, এ বোর্ডে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এবারের ফলে বেশ নির্ভার। কয়েক বছরের মতো এবারও ছেলেদের পেছনে ফেলেছে মেয়েরা। সব বোর্ড মিলে ছাত্রদের চেয়ে ৪৮ হাজার ৩৩২ জন মেয়ে বেশি পাস করেছে। ছাত্রদের চেয়ে ১৭ হাজার ২৭০ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ ৫ পেয়েছে। এত সাফল্যের মধ্যেও সারাদেশের ৪৮টি স্কুল ও মাদ্রাসার কেউ পাস করেনি।

বরাবরের মতো এবারও নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে ইংরেজি ও গণিতের ফল। যেসব বোর্ডের পরীক্ষার্থীরা এ দুটি বিষয়ে বেশি পাস করেছে, তারাই অন্য বোর্ডের চেয়ে ফলে এগিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি পাসের হার কমেছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে। এ বোর্ডের পাসের হার ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। এই বোর্ডে পাসের হার কম হওয়ায় এর ধাক্কা লেগেছে জাতীয় গড় পাসের হারেও।

যশোর বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহসান হাবীব বলেন, সব বোর্ডের সার্বিক ফলে আমি সন্তুষ্ট। কারণ, গতবারের চেয়ে পাসের হার কম মনে হলেও করোনার পর এবারই প্রথম শিক্ষার্থীদের সব বিষয়ে ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।

কুমিল্লা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জামাল নাছের জানান, ইংরেজি ও গণিতে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফল খারাপ করেছে তাদের এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সরকার এ সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। জামাল নাছের বলেন, শিক্ষার্থীরা ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়েছে। তাই তাদের বইমুখী করতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

দিনাজপুর বোর্ডের ফল খারাপ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চেয়ারম্যান অধ্যাপক স. ম. আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, রংপুর বিভাগের জেলাগুলো নিয়ে এই বোর্ড গঠিত, এই বিভাগের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, আত্রাই নদীর বিস্তীর্ণ চর এলাকায় দারিদ্র্যপীড়িত জনসংখ্যা বেশি। ফল খারাপের এটিও একটি কারণ।

আরও পড়ুন

×