ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

এদের প্রতিহত করুন

এদের প্রতিহত করুন
×

প্রতীকী ছবি

হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:৪৩ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:০৪

সম্প্রতি কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চম্পকনগর সাব-সেন্টারের এক চিকিৎসক। করোনায় আক্রান্ত সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করতেন তিনি। কভিড-১৯ ফল পজিটিভ আসার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী ময়মনসিংহে তার স্বামীর (তিনিও চিকিৎসক) সঙ্গে হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। কিন্তু এলাকাবাসীর চাপে নববর্ষের দিন (১৪ এপ্রিল) পরিবারসহ বাসা ছাড়তে হয় তাকে। দেশে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রায়ই এমন ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছেন। করোনা রোগীর সেবা না দিলেও শুধু হাসপাতালে চাকরি করেন বলেই অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে বাসা ছাড়তে বলছেন বাড়ির মালিকরা। অনেক স্থানে গ্যারেজে গাড়ি রাখার ক্ষেত্রেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের হেনস্তা ও বিরূপ আচরণ করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রথম সারিতে থাকা এই যোদ্ধাদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মন্তব্য সংশ্নিষ্টদের। শুধু স্বাস্থ্যকর্মীরাই নন, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য যারা এ দুর্যোগকালীন মাঠে কাজ করছেন, তাদের এমন দুরবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য বাইরে যেতে হয় বলে অনেক সংবাদকর্মীও বাড়ি ছাড়ার নোটিশ পেয়েছেন।

বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির বিরুদ্ধে সবাই যখন একযোগে কাজ করছে, প্রথম সারির যোদ্ধা স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য যেখানে অন্যরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন, সেখানে বাংলাদেশে তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে, যা কখনোই কাম্য হতে পারে না। সরকারকে এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। প্রশাসন বলছে, করোনায় আক্রান্তদের সেবায় নিয়োজিতদের বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

ফেরদৌস আহমেদ রাফি কাজ করেন যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, যুক্তরাজ্যে যারা হাসপাতালে করোনা আক্রান্তদের সেবা দিচ্ছেন, জনগণ তাদের নানাভাবে সম্মানিত করছে। কেউ চিকিৎসক-স্বাস্থ্য কর্মীদের বাসায় নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার পৌঁছে দিচ্ছে। উবার চালকরা বিনামূল্যে রাইড দিচ্ছেন। রেস্টুরেন্টগুলো হাসপতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করছে। ফেরদৌস আহমেদের এমন পোস্ট শেয়ার দিয়ে তার এক বন্ধু লিখেছেন, 'যুক্তরাজ্যে চিকিৎসকদের সহযোগিতার জন্য সবাই এগিয়ে এসেছেন। আর বাংলাদেশে বাসা ছাড়তে হচ্ছে। কত অমানবিক আমরা?'

গত মাসে রাজধানীর মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের করোনা রোগী শনাক্তের পর ওই হাসপাতালের অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মী বাসা ছাড়ার নোটিশ পেয়েছেন। অনেকেই বাসা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ওই হাসপাতালের এক অ্যাম্বুলেন্স চালক সমকালকে বলেন, 'মিরপুরের পাইকপাড়ায় থাকতাম আমি। আমাদের হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি ছিল, এটা জানার পর আমার বাড়িওয়ালা আমাকে বাসায় প্রবেশ করতে দেয়নি। পরে কয়েকদিন হাসপাতালেই রাত কাটিয়েছি। এ মাসে নতুন বাসায় উঠেছি। তবে হাসপাতালে কাজ করেন জানার পর অনেকেই বাসা ভাড়া দিতে চাননি।'

টাঙ্গাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক পরিবার নিয়ে ঢাকার বাসাবোতে থাকেন। সম্প্রতি তিনি বাসা ছাড়ার নোটিশ পেয়েছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকজন নেতা সমকালকে জানিয়েছেন, তারা প্রায়ই এমন অভিযোগ পাচ্ছেন। চিকিৎসক নেতারা বলেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা দেশের ক্রান্তিলগ্নে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। তাদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ অমানবিক।

ঢাকার উত্তরখানের এক চালক তার গাড়িতে বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের আনা-নেওয়ার কাজ করেন। তিনি জানিয়েছেন, তার গাড়ি যে গ্যারেজে রাখতেন সেখানে আর রাখতে দিচ্ছেন না বাড়ির মালিক। বাসা থেকে দূরে নতুন একটি গ্যারেজে কয়েকদিন থেকে গাড়ি রাখছেন বলে জানিয়েছেন ওই চালক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এক চিকিৎসক কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার পর শান্তিনগর এলাকায় বসবাসরত তার পরিবার স্থানীয় লোকজনের দ্বারা হেনস্তার শিকার হয়। ওই ভবনে থাকা অন্য চিকিৎসকদের নিজেদের বাসায় প্রবেশে বাধা দেয় স্থানীয় লোকজন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ভবনটি লকডাউন ঘোষণা করে।

একটি বেসরকারি টেলিভিশনের এক কর্মী সম্প্রতি করোনায় আক্রান্ত হন। এটা জানার পর ওই টেলিভিশনের কয়েক কর্মী বাসা ছাড়ার নোটিশ পেয়েছেন বলে জানা গেছে। টেলিভিশনটির এক সংবাদ কর্মী সমকালকে বলেন, তাদের সহকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন জানার পর কর্তৃপক্ষ নানা ব্যবস্থা নিয়েছে। ওই কর্মীর সংস্পর্শে যারা ছিলেন তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়েছে। এর পরও তাদের কিছু সহকর্মীকে বাসা ছাড়াতে বলেছে তাদের বাড়ির মালিকরা, যারা কখনোই আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসেননি। একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ কর্মী সমকালকে বলেন, সংবাদ সংগ্রহের কাজে প্রতিদিন বাসার বাইরে যেতে হয় বলে বাড়িওয়ালা তাকে বাড়ি ছাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন।

জানতে চাইলে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি মনজিল মোরসেদ শুক্রবার সমকালকে বলেন, 'করোনার মতো দুর্যোগের সময় সবার উচিত মানবিক আচরণ করা। এমন সময়ে যারা জরুরি পেশার মানুষদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ আইনের ৬ ধারায় একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের কথা বলা আছে। সরকার এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করতে পারে। ওই উপদেষ্টা কমিটির কাছে অভিযোগ করলে তারা এ ধরনের অন্যায় কার্যক্রম ও হয়রানির বিরুদ্ধে সংক্রামক রোগ আইনের ২৪, ২৫, ২৬ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সমকালকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বলেন, 'করোনা মহামারির সময় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা সামনে থেকে লড়াই করছেন। এমন দুর্যোগের সময় হাসপাতালে কর্মরতদের সঙ্গে কেউ অন্যায় আচরণ করলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালেই আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, কোনো বাড়িওয়ালা তার ভাড়াটে কোনো চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করলে ওই বাড়ি নির্মাণের অর্থের উৎসের অনুসন্ধান করা হবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার তার এক বার্তায় চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী ভাড়াটিয়াদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হলে সংশ্নিষ্ট থানায় অভিযোগ করতে বলেছেন। অভিযোগ পেলে সংশ্নিষ্ট বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সংবাদ কর্মী, ব্যাংকারসহ জরুরি সেবায় নিয়োজিত পেশাজীবীরাও এমন আইনি সুরক্ষা পাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রাম জেলা প্রসাশন ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) এমন ঘোষণা দিয়ে বলেছে, করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও অ্যাম্বুলেন্স চালকসহ সংশ্নিষ্টদের কোনো বাড়িওয়ালা বাসাছাড়া করতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদারকির জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে পুলিশকে জানাতে হটলাইন চালু করেছে সিএমপি।

আরও পড়ুন

×