ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

কৃষিপণ্যে চাঁদাবাজি

'আমার মাল আমি বেইচব তোমারে চাঁদা দেব ক্যা'

'আমার মাল আমি বেইচব তোমারে চাঁদা দেব ক্যা'
×

তরমুজের ফলন ভালো হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলে। তবে চাঁদা ছাড়া ঢাকায় আসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে - সংগৃহীত

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০

'আমার মাল আমি বেইচব, তোমারে চাঁদা দেব ক্যা'- এ প্রশ্ন বরগুনা জেলার এক গ্রামের তরমুজ চাষির। করোনার এ দুর্দিনে গ্রামাঞ্চলে চাঁদাবাজ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎপাত বেড়েছে। এক চাঁদাবাজের দাবি, তার কাছ থেকে টাফি (তরমুজ বহনের জন্য ট্রাক্টরের পেছনে বসানো এক ধরনের ব্যবস্থা) ভাড়া নিতে হবে। এ রকম অনেক দাবি তাদের। এভাবে প্রতি তরমুজে ৬-৭ টাকা করে নিয়ে যাচ্ছে এই মধ্যস্বত্বভোগী চাঁদাবাজরা। এতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে তরমুজ চাষিদের। শুধু তরমুজ নয়, বিভিন্ন খাদ্যপণ্য চাষিরা নানাভাবে মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের শিকারে পরিণত হচ্ছে। বরগুনা সদরের ৪ নম্বর বালিয়াতলী ইউনিয়নের মনশাতলী এলাকার কৃষক মোস্তফা খাঁ গতকাল সোমবার সমকালের কাছে এ অভিযোগ করেন।
মোস্তফা খাঁ জানান, আড়াই কানি জমিতে এবার তরমুজ চাষ করেছেন তিনি। চাঁদাবাজরা প্রতি তরমুজে লেবার খরচ ২ টাকা, টাফি ভাড়া ২ টাকা ও আড়ত খরচ ২ টাকা দিতে বাধ্য করে। তাদের সিন্ডিকেট ছাড়া তরমুজ বিক্রি করা যায় না। ফলে স্থানীয় কৃষকরা একজোট হয়ে বিষয়টি বরগুনার পুলিশ সুপারকে জানান। পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের পর ওই গ্রামের তরমুজ চাষিরা আপাতত রেহাই পেয়েছেন। তবে পাশের এলাকা বানাইতে এখনও মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় লোকজন সমকালকে জানান, তরমুজ চাষিদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বালিয়াতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ সেলিমের ভাই স্থানীয় যুবলীগ নেতা আবদুল হালিম। এই অপকর্মে তার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন নূর হোসেন ও এসহাক মেম্বার। হালিমের বিরুদ্ধে এর আগেও চাঁদাবাজির মামলা হয়েছিল।
ওই ইউনিয়নের আরেকজন কৃষক সমকালকে জানান, সাধারণত পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি খেতে এসে তরমুজের দাম করে থাকে। মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজ চক্রের সদস্যরা পাইকারদেরও অভিনবভাবে জিম্মি করে। নিজেদের পছন্দের ট্রাকে
ওই পাইকারকে তরমুজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিতে বাধ্য করে। প্রতি ট্রাকে ৫-৭ হাজার টাকা আদায় করে চাঁদাবাজরা। এ ছাড়া নিজেদের ভাড়া করা শ্রমিক ও টাফিতে তরমুজ পরিবহন করতে বাধ্য করা হয়। প্রতিটি তরমুজ বাবদ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ তাদের দিতে হয়। কৃষক যদি স্বাধীনভাবে নিজের খেতের তরমুজ নিজে বিক্রি ও টাফিতে তোলা এবং কাটার সুযোগ পেত তাহলে প্রতি হাজার তরমুজে ২০-৩০ হাজার টাকা বেশি পেত। ওই কৃষক বলেন, 'যারা কৃষকদের ওপর জুলুম করছে তারা অনেক প্রভাবশালী। ভয়ে এলাকার কেউ কিছু বলে না।'
স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তরমুজ ছাড়াও বরগুনার বিষখালী নদীতে মাছ ধরার জন্য জাল ফেলতেও চাঁদা দিতে হয়। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাকে শারীরিক নির্যাতনও করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভোলায়ও তরমুজ কেনাবেচায় একই ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয় আছে। একেকটি ইউনিয়নকে একেকটি চক্র ভাগ করে নিয়ে চাঁদাবাজি করছে।
সম্প্রতি বরগুনা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান হোসেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, কৃষকসহ স্থানীয় জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য রাখছেন তিনি। তিনি বলছেন, 'কষ্ট করে তরমুজ চাষ করছে কৃষক, মাঝখান থেকে একজন টাকা নিয়ে চলে যাবে- এটা হতে পারে না। এই বাটপারদের দেখে নেব। কেউ যদি কৃষককে জোরপূর্বক কারও কাছে তরমুজ বিক্রি করতে বাধ্য করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, যার তরমুজ সেই বিক্রি করবে। সে শাহজাহান, সেলিম, হালিম নাকি নয়ন বন্ডকে দেবে সেটা তার বিষয়। তরমুজ চাষ করে না- এসব লোকজন নিয়ে কোনো সমিতি চলবে না। সমিতি হবে মানুষের কল্যাণের জন্য। মানুষকে জিম্মি করার জন্য নয়। তরমুজ কার কাছে বিক্রি করবে সেটার জন্য কারও অনুমতি লাগবে না। ঢাকা থেকে পার্টি আসবে, তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে কৃষক। আমি পুলিশ, বেতন পাচ্ছি আমি, মাঝখান থেকে চাঁদাবাজি করে যাব, এটা হতে পারে না। বাটপারি করে করে ১ লাখ পিস তরমুজে তিন লাখ টাকা নিয়ে যাচ্ছে সিন্ডিকেট। এটা হতে দেব না।'
স্থানীয় একাধিক কৃষক সমকালকে জানান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের এমন কঠোর বার্তা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর সিন্ডিকেটের সদস্যরা এখন চুপচাপ। এতে আপাতত কৃষকরা স্বস্তিতে আছেন।
যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান হোসেন সমকালকে বলেন, বরগুনায় এবার ৭০০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। তরমুজ কেনাবেচায় একটি মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে। যাদের কারণে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিচ্ছি। এলাকায় পোশাকে ও সিভিল ড্রেসে পুলিশ রাখা হয়েছে। হটলাইন নম্বর রয়েছে। সেখানে প্রতিমুহূর্তে কৃষক অভিযোগ জানাতে পারবে।
ঢাকায় কৃষিপণ্য আসার আরেকটি বড় এলাকা বগুড়ার শিবগঞ্জ। শিবগঞ্জ কাঁচামাল আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বাবুল মিয়া বাবু সমকালকে বলেন, মাল পরিবহনে তাদের এ ধরনের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।'
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা সমকালকে বলেন, পণ্য পরিবহনের চেইন যাতে বিঘ্নিত না হয়, এ ব্যাপারে পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। এ ছাড়া ট্রাক যাতে খালি না আসে সে ব্যাপারে পুলিশকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, কৃষিপণ্য পরিবহনে যাতে ব্যাঘাত না হয়, সে ব্যাপারে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কৃষক যাতে পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়, সে ব্যাপারে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু উদ্যোগ।

আরও পড়ুন

×