ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

স্বপ্ন কারিগর

স্বপ্ন কারিগর
×

জামিলুর রেজা চৌধুরী। ছবি: রাজিব পাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২০ | ০২:১৭ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২০ | ০২:১৯

জাতীয় অধ্যাপক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা জামিলুর রেজা চৌধুরী আর নেই। মঙ্গলবার ভোররাতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য ছিলেন। ২০০১-২০১০ সাল মেয়াদে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) তিনি ১৯৫৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রথমে শিক্ষার্থী এবং পরবর্তী সময়ে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। জামিলুর রেজা চৌধুরী ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয় একুশে পদক লাভ করেন। এই শিক্ষাবিদকে ২০১৮ সালে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। তার জন্ম ১৯৪২ সালে সিলেটে।

এ বছরের ১ মার্চ সমকালের প্রিন্ট সংস্করণের ফিচার পাতা 'প্রিয় পদরেখা'য় সিরাজুল ইসলাম আবেদের এই লেখাটি প্রকাশিত হয়। লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হলো-

বটবৃক্ষের মতো একজন মানুষ। তার ঘন সবুজ ছায়া আমাদের সিক্ত করে অহর্নিশ। বিলিয়ে চলেন অক্সিজেন অকৃপণ হাতে। বয়সকে হার মানিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেকে যুক্ত রেখেছেন আঁধার-ভেদী আলোর দুয়ার খুলতে। একাধারে খ্যাতিমান প্রকৌশলী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞানী এবং পরিবেশবাদী মানুষ তিনি। স্বপ্ন দেখান তরুণদের। স্বপ্ন দেখেন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো বিজ্ঞানমনস্ক সমাজের। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা এই মানুষটি জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। প্রিয় পদরেখার এবারের ব্যক্তিত্ব। লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম আবেদ

কারওয়ান বাজার সিগন্যাল পেরিয়ে আমরা দ্বিতীয়বারের মতো ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ি। আমরা মানে সমকালের ফটো সাংবাদিক রাজিব পাল এবং আমি। জ্যামে বসে সামনের গাড়ি নম্বর প্লেটে চোখ পড়তেই ভাবি- এ অবস্থায় জামিলুর রেজা স্যার হলে কী করতেন? নিশ্চয় নম্বর প্লেটের সংখ্যাগুলো নিয়ে অঙ্ক-অঙ্ক খেলায় মেতে উঠতেন। কিন্তু আমি তো স্যার না। তাই দু'বার বাতিল হয়ে সাক্ষাৎকারের জন্য আজকে পাওয়া এই সময়টুকু হারিয়ে ফেলার আতঙ্কে স্যারকে ফোন দিই। স্যার ফোন ধরেই বললেন- 'হ্যাঁ আমি তো অপেক্ষা করছি।' আমি আমার অবস্থান ও জ্যামের কথা জানালে, ছোট করে বললেন- 'ঠিক আছে'।

হ্যাঁ, জামিলুর রেজা স্যার আমাদের জন্য অপেক্ষায়। শুধু কি আমাদের জন্য? বিজ্ঞানমুখী একটা সমাজ গড়ে উঠবে, সেটা দেখে যাওয়ার জন্যও তিনি অপেক্ষা করছেন। শুধু কি অপেক্ষা? না, তার জন্য মাঠেও নেমেছেন। তার মতে, 'আর্থসামাজিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত জাতিকে বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা। শুধু বিজ্ঞান নয়; সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কেও ধারণা থাকতে হবে। আমরা চাই বিজ্ঞানমনস্ক একটা সমাজ।'

বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্মের জন্য লড়াই

জামিলুর রেজা চৌধুরী পালন করছেন রাষ্ট্রীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততাও কম নয়। কিন্তু তারপরও স্বপ্নের সেই সমাজ গড়তে, তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞানে আগ্রহী করতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজ্ঞান বিতর্ক, গণিত অলিম্পিয়াডসহ নানা রকমের বিজ্ঞানভিত্তিক অলিম্পিয়াড ও উৎসবের। কাজ করছেন পাঠ্যবইয়ের মান উন্নয়নেও। এত কাজ করেও তৃপ্ত নন তিনি। স্বপ্নিল চোখ মেলে তাকিয়ে থাকেন দূর গন্তব্যের দিকে। বলেন, 'সারাদেশে যে শিক্ষার্থী আছে, তার একটা ক্ষুদ্র অংশকেই আমরা এই সবে যুক্ত করতে পেরেছি। প্রায়ই অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে দেখছি। আমাদের সমাজে অনেক কুসংস্কার ছিল, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এখনও দেখি লাখ লাখ মানুষ ওইসব সংস্কারে বিশ্বাস করে অনেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কাজ করছে। এর সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপব্যবহারও যুক্ত রয়েছে। তখন তৃপ্ত হতে পারি না।'

'আমাদের ছোটবেলা বা কৈশোরে অনেক বন্ধুবান্ধব ছিল। আমরা আড্ডা দিতাম, খেলাধুলা করতাম কিন্তু এখন যেটা ঘটেছে, দিন-রাত তারা স্ট্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। পাবলিক প্লেসেও আমি দেখি তারা স্ট্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। ফলে দুর্ঘটনাও ঘটছে। এটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটা ভাবতে বলি। তরুণদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলেই আমি একটা কথা বলি, ফেসবুক ব্যবহার করবে, ঠিক আছে। কিন্তু একটা লিমিট থাকা প্রয়োজন। ২৪ ঘণ্টা অনলাইনে থাকা, একের পর এক স্ট্যাটাস দেওয়া এগুলো ক্ষতি করছে। আগে ছেলেমেয়েদের মনে যদি প্রশ্ন আসত, সেটা নিয়ে তারা চিন্তাভাবনা করত। এখন সেই সুযোগ যেন নেই। কিছু হলেই দেখি তো গুগল কী বলে? এটা কিন্তু ভয়ের একটা বিষয়। মনোবিজ্ঞানীরাও এটা নিয়ে শঙ্কিত। ক্যালকুলেটর যখন এলো, আমেরিকায় এ রকম হয়েছিল যে, দুটো ছোট সংখ্যা যোগ করতে হলেও তাদের ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে হতো। আমাদের এখানেও তেমনটা ঘটছে। আমরা যন্ত্রনির্ভর হয়ে উঠছি। এখান থেকে কীভাবে তরুণ সমাজকে বের করে আনা যায়, সে বিষয়েও ভাবতে হবে।'

একটু থেমে আবার শুরু করেন, 'আমাদের সময়ের তুলনায় বর্তমান তরুণ সমাজের মধ্যে যে যোগাযোগ কমে যাচ্ছে, এখানে নগর পরিকল্পনাবিদদেরও ভূমিকা রয়েছে। তরুণদের খেলাধুলা, বিনোদন ইত্যাদির কোনো জায়গা নেই। খেলার মাঠ নেই, পার্ক নেই। থাকলেও দখল হয়ে যাচ্ছে; ভিন্ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে। আগে ক্লাব ছিল, লাইব্রেরি ছিল। এখন সেগুলোও হারিয়ে গেছে। বইপড়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। বই পড়ে সমাজকে বুঝতে হবে।' কিছুটা আবেগপ্রবণ দেখায় তাকে। একদম ঠিক কথাই বলেছেন। সঠিক মানসিক বিকাশের সুযোগ না করে দিয়ে, তাকে দিয়ে সমাজের জন্য ইতিবাচক কিছু করানো সম্ভব নয়।

সঙ্গত কারণেই প্রসঙ্গ পাল্টাই, কথার খেয়ায় স্পর্শ করতে চাই ব্যক্তি জামিলুর রেজা চৌধুরীর মানসপট। খ্যাতনামা প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা- এমন অনেক বিশেষণই তো রয়েছে আপনার কিন্তু নিজেকে কীভাবে দেখেন? প্রশ্ন শুনে মৃদু হাসলেন। আরও মৃদু কিন্তু ঋজু ভঙ্গিমায় বললেন, একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে। শ্রদ্ধায় আরও একবার মাথা নত হয়ে আসে। জামিলুর রেজা চৌধুরীর এই বোধটি গড়ে উঠেছে পরিবার থেকেই। বাবা আবিদ রেজা চৌধুরী ছিলেন পুর প্রকৌশলী। 'এ অঞ্চলের প্রথম দিকে প্রকৌশলীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম'- জানালেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। ১৯২৯ সালে কলকাতার বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন। অবিভক্ত ভারতে সিলেট ছিল আসাম প্রদেশের অন্তর্গত। 'বাবা সেই আসাম প্রদেশে সরকারি চাকরি শুরু করেন। সিলেটের জাফলং সীমান্তের ভারতীয় অংশে তিন পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে যে ঝুলন্ত সেতুটি আমাদের চোখে পড়ে, ১৯৩০ সালে সেটি বাবাই তৈরি করেছিলেন। এটি ছিল সিলেট অঞ্চলের প্রথম ঝুলন্ত সেতু।' পিতার গৌরবে গর্বিত পুত্রের মুখ খুব সহজেই চোখে পড়ে। বাবাকে দেখে দেখেই তার বেড়ে ওঠা। মা হায়াতুন্নেছা চৌধুরীর স্নেহ আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে জানা- অন্যের সঙ্গে কী করে মিশতে হয়, নিজের প্রাপ্যটাকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে কী করে আনন্দ পেতে হয়। এর মধ্য দিয়েই তৈরি হয় নিজের মানসপট। বাবা ও ভাইসহ পরিবারের ১২-১৩ জন সদস্য প্রকৌশলী। 'এ রকম একটা পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠার কারণেই হয়তো মনের অজান্তে প্রকৌশলী হতে চেয়েছি'- বলছিলেন হাজারো তরুণের আইকন জামিলুর রেজা চৌধুরী। কথার খেয়া আমাদের নিয়ে যায় তার শৈশবে।

আবছায়া শৈশব : সিলেটের জিন্দাবাজার এলাকার কাজী ইলিয়াসে ১৯৪৩ সালের ১৫ নভেম্বর সকালে জন্ম নেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। কয়েক মাস পরে চৌহাট্টার কাছে মনা রায় টিলা বা গৌরগোবিন্দ টিলায় অবস্থিত সরকারি বাসভবনে ওঠেন। বাসা থেকে হজরত শাহজালালের মাজার দেখা যেত- জানালেন তিনি। বাবার বদলি সূত্রে তিন বছর বয়সে আসামের জোড়হাটে চলে যান। 'যদিও ঝাপসা কিন্তু জোড়হাটের কিছু স্মৃতি আমার আছে।' জামিলুর রেজা চৌধুরী ফিরে যান তার ফেলে আসা আবছায়া শৈশবে, 'একতলা বাংলো বাড়ি, সামনে খোলা জায়গা। পাশের বাসায় আমার সমবয়সী একটা ছেলে ছিল। তার ছিল একটা খেলনা গাড়ি। গাড়ির ভেতরে ঢুকে আবার চালানোও যায়। আমার খুব শখ হলো ওই রকম একটা গাড়ির। মা-বাবাকে বলার পর গাড়ি পাইনি, পেলাম একটা ট্রাই সাইকেল। আমি বাসার সামনে ওটা চালাতাম। সেই সময় দেশভাগের দামামা বেজে ওঠে। ভারতে থাকব না পাকিস্তানে যাব এই নিয়ে ভোট হয়। আমার বেশ মনে আছে তখন মুসলমানদের একটা স্লোগান ছিল- 'আসাম সরকার জুলুম করে, নামাজেতে গুলি করে।'

দেশভাগ হলে ১৯৪৭ সালের আগস্টে তাঁদের পরিবার আবার সিলেট ফিরে আসে। কিছুদিন পর বাবা ময়মনসিংহে বদলি হন। ১৯৪৯ সালে সেখানকার একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি হলেও ভালো না লাগায় দু'দিনের বেশি সেখানে যাননি। পরের বছর ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে একবারে ক্লাস ফোরে ভর্তি হন জামিলুর রেজা চৌধুরী। শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা।

দুরন্ত কৈশোর : দুই বছর পর বাবার আবারও বদলি। জামিলুর রেজা চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে ময়মনসিংহ থেকে চলে আসেন ঢাকায়। 'থাকতাম নটর ডেম কলেজের পাশে কোম্পানি বাগানে।' চকচক করে ওঠে তার চোখ। ফিরে যান কৈশোরের দিনগুলোয়। ঢাকায় এসে প্রথমে প্রিয়নাথ হাইস্কুলে (নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুল) ভর্তি হন। সেখানে এক বছর পড়ার পর ১৯৫৩ সালে ক্লাস সেভেনে সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে ভর্তি হন। বাসা বদল হয়। এবার ঠিকানা গোপীবাগ। 'আমি কখনোই খুব পড়ূয়া ছাত্র ছিলাম না। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা পছন্দ করতাম। সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় ফুটবলে ইন্টার ক্লাস চ্যাম্পিয়ন হই আমরা। উপরের ক্লাসের ছেলেদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন। সে কী আনন্দ! পুরস্কার হিসেবে পাই ৬০ টাকা। দলের সবাই মিলে কালাচাঁদ গন্ধমানিকের মিষ্টির দোকানে যাই মিষ্টি খেতে।' এমনভাবে বললেন, যেন মিষ্টির স্বাদ এখনও তার মুখে লেগে আছে। আর বাকি টাকা শেষ করতে ছুটে যান সিনেমা হলে। সেই কৈশোর থেকেই খেলাধুলার পাশাপাশি সিনেমা দেখার ঝোঁকটা ছিল। 'বিশেষ করে উত্তম-সুচিত্রার কোনো ছবি এলে না দেখে থাকতাম না। হল থেকে বের হয়ে আসার সময় হলের সামনে থেকে কিনে নিয়ে আসতাম সিনেমার গানের বই।'

১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মেধা তালিকায় দ্বাদশ স্থান অধিকার করে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য ভর্তি হন আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়)। সেখানেও একই অবস্থা, বিকেলে খেলাধুলা করে সন্ধ্যায় বন্ধুদের পড়া দেখিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরতেন। 'বন্ধুদের পড়া বোঝাতে গিয়ে আমার পড়াও হয়ে যেত।' আর এভাবেই ১৯৬৩ সালে জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন।

নিয়োগ না পেয়েই শিক্ষক : রেজাল্টের পরদিন বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি সরাসরি ক্লাস নিতে পাঠিয়ে দেন। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই শুরু হয় শিক্ষকজীবন। তারপর ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসে তাঁকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় পুরকৌশল বিভাগে। ১৯৬৪ সালে বৃত্তি নিয়ে চলে যান ইংল্যান্ডে। সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমএসসি করেন অ্যাডভান্স স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে পিএইচডি করেন। থিসিসের বিষয় ছিল, কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন অব হাইরাইজ বিল্ডিং।

বর্ণিল কর্মজীবন : বাইরের দেশে থেকে যাওয়ার একাধিক প্রস্তাব থাকলেও পিএইচডি শেষ করে ১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে তিনি বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ১৯৭৩ সালে সহযোগী অধ্যাপক ও ১৯৭৬ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০১ সাল পর্যন্ত বুয়েটে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর মধ্যে কখনও বিভাগীয় প্রধান ছিলেন; ছিলেন ডিন। বুয়েটের কম্পিউটার সেন্টারের পরিচালক ছিলেন প্রায় ১০ বছর। ১৯৭৪-৭৫ সালে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হন। ২০০১-এর মার্চ থেকে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। ২০১১ সালের মে থেকে এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

আমাদের গৌরব : আন্তর্জাতিকভাবে আমরা যাঁদের নিয়ে গর্ব করতে পারি অবশ্যই ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী তাদের অন্যতম। নিরন্তর গবেষণা করছেন। এ পর্যন্ত ৭৫টি গবেষণাপত্র লিখেছেন, যা দেশি-বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। উঁচু ইমারতের শিয়ার ওয়াল ডিজাইনের সহজ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। পদ্ধতিটি 'কুল অ্যান্ড চৌধুরী মেথড' নামে পরিচিত। উঁচু ইমারত ডিজাইনে কম্পিউটার জনপ্রিয় না হওয়া পর্যন্ত এ পদ্ধতিই সারাবিশ্বে ব্যবহার হতো। এ ছাড়া ২০০৬ সাল থেকে পদ্মা সেতুর ডিজাইন ও নির্মাণে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণের সঙ্গে যেসব বিশেষজ্ঞ জড়িত ছিলেন তাদের অন্যতম জামিলুর রেজা চৌধুরী।

যমুনা সেতুর দেশীয় বিশেষজ্ঞ দলের তিনি ছিলেন চেয়ারম্যান। বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার কর্মসূচির টিম লিডার হিসেবে ১৯৯৩ সালে তিনি উপকূলীয় এলাকায় সাইক্লোন শেল্টারের মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেন। ঢাকার নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলের প্রধানের দায়িত্বসহ  বহু দায়িত্ব পালন করছেন। এমন  অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। অর্জন করেছেন একুশে পদকসহ জাতীয় অধ্যাপকের সম্মান।

আরও পড়ুন

×