প্রকৃতি
বৈরী সময়ে বর্ণিল গ্রীষ্ম
শিশু একাডেমির বাগানে ফুটেছে কনকচাঁপা
মোকারম হোসেন
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২০ | ১২:০০
গ্রীষ্ম আসার কথা ছিল স্বরূপে, তার উত্তাপ মেখে। অথচ এখন জানালা গলে বৃষ্টির তুমুল ধ্বনি ভিজিয়ে দিচ্ছে সব। তুমুল ব্যস্ততায় এতদিন প্রতিবেশী যে স্বর্ণচাঁপাকে দেখা হয়নি ভালো করে, তার বৃষ্টিস্নাত সৌরভও এই ঘরবন্দি সময়কে দারুণ মাতিয়ে রাখছে। ভারসাম্যহীন প্রকৃতিতে অসময়ের বর্ষণ নতুন কিছু নয়। তাই তো উষ্ণ সময়ের ভেতর ঢুকে পড়েছে কোমল জলকণা। পৃথিবীজুড়েই গভীর সংকটে মানবজাতি। কঠিন করোনাভাইরাস থেকে রেহাই পেতে স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি মানুষ। তাতেই প্রকৃতির সাপেবর হয়েছে। দূষণমুক্ত নির্ভার প্রকৃতি তার বর্ণবৈভব মেলে ধরেছে। গ্রীষ্ফ্মের সমস্ত সৌন্দর্য এখন একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বসন্তের চেয়ে গ্রীষ্ফ্মের রঙ আরও বেশি জৌলুসময়, আবেদনময়ী। এর জন্য শুধু কৃষ্ণচূড়ার রঙই যথেষ্ট। রাজধানীর ক্রিসেন্ট লেকে গেলে এই কথার সত্যতা মিলবে। শুধু তা-ই নয়, কৃষ্ণচূড়ার এমনই রঙ, অনেক দূরের একটি গাছও তার সৌন্দর্য অবগাহনে আপনাকে নিবিড় মমতায় ডাকবে।
নগরে এখন দুর্লভ কনকচাঁপা তার উদ্ভাসিত রঙ নিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে। নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ূয়া বলধা গার্ডেন থেকে কনকচাঁপার এক কন্যাকে থিতু করেছিলেন শিশু একাডেমির বাগানে। তার চারা রোপণ করলাম চারুকলা প্রাঙ্গণে, গাজীপুর আরণ্যকসহ আরও অনেক বাগানে। এখন কয়েক বছর ধরে সব গাছেই ফুল ফুটছে। মাত্র তিন বছর আগে কুরচি লাগিয়েছি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। গত বছর থেকেই কুরচি শুভ্রতায় মোড়ানো সুবাসিত ফুল উপহার দিচ্ছে।
গ্রীষ্মের নজরকাড়া ফুলের তালিকা আরও অনেক দীর্ঘ। প্রকৃতি থেকে বসন্ত যখন নিজেকে গুটিয়ে নিতে ব্যস্ত ঠিক তখনই সোনালু যেন অলৌকিকভাবেই প্রাণ ফিরে পায়। গাছজুড়ে পুষ্পকলিরা প্রবল উচ্ছ্বাসে উঁকি দেয়, ছড়িয়ে দেয় প্রাণের শিহরণ। ঢাকায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন প্রাঙ্গণ, জাতীয় সংসদ ভবনের পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত (মাঝের পথ) পথের এক পাশে অঢেল সোনালু চোখে পড়ে। রমনা পার্ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও বিক্ষিপ্তভাবে সোনালু দেখা যায়। অথচ ঢাকায় তিন দশক আগেও এর দৈন্য ছিল। জারুল ব্যতীত গ্রীষ্ফ্মের পুষ্পোৎসব অনেকটাই অসম্পূর্ণ। কৃষ্ণচূড়ার লাল এবং সোনালুর হলুদ-সোনালি রঙের সঙ্গে এর নীলাভ সৌন্দর্য স্নিগ্ধ এবং মনোহর। এ সময়ে একমাত্র বেগুনি রঙের উৎস জারুল, তবে সৌন্দর্যের বিচারে জ্যাকরান্ডাও কম যায় না। জারুল জলাভূমির গাছ হলেও স্বাভাবিক শুস্কতায় বেঁচে থাকতে পারে। এ কারণেই ঢাকায় জারুলের আশ্চর্য প্রস্টম্ফুটন চোখে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল লাগোয়া পথপাশে, ভিসির বাসভবনের উত্তর পাশে, রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিপুল পরিমাণ জারুলের দেখা মেলে। গ্রীষ্ফ্মের আরেক আশ্চর্য ফুল পাদাউক। অবাধ অথচ স্বল্পকালীন প্রস্টম্ফুটনের জন্য পাদাউক অনন্য। কোনো এক ভোরে হয়তো মঞ্জরির হলুদ ফুটেছে আলো হয়ে সারা গাছে, বাতাস ভরে উঠেছে মধুগন্ধে, কিন্তু পরদিন কোনো চিহ্ন কোথাও থাকবে না। এক দিনের ব্যবধানে নিঃশেষে মুছে যাবে সব রং, শুধু নিচে ছড়িয়ে থাকবে অজস্র ঝরা ফুলের হলুদ। স্বল্পায়ু প্রস্টম্ফুটন সত্ত্বেও বর্ণে, ঔজ্জ্বল্যে, সুগন্ধের ঐশ্বর্যে, দেহসৌষ্ঠবের আভিজাত্যে পাদাউক তরুরাজ্যের অন্যতম অপ্রতিদ্বন্দ্বী বৃক্ষ। ঢাকায় হেয়ার রোডে পাদাউকের শতোর্ধ্ববর্ষী বৃক্ষ বীথি রয়েছে। এমন একটি অভিজাত সড়ক দেশে আর দ্বিতীয়টি নেই।
কনকচূড়ার একটি সুদৃশ্য বীথি আছে সংসদ ভবন এলাকায় খেজুর বাগানের কোণ থেকে উত্তরের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। ঢাকার গ্রীষ্ফ্মকে বর্ণাঢ্য রাখতে এই নান্দনিক বীথিটিও চমৎকার ভূমিকা রাখছে। গ্রীষ্ফ্মের এই অসংখ্য রঙের ভিড়ে লাল সোনাইলকে তার গোলাপি আভার জন্য একেবারে আলাদা করেই চেনা যায়। শুধু ফুলই নয়, গাছটির ছাতার মতো অবয়বও বেশ আকর্ষণীয়। ঢাকাসহ সারাদেশেই এ গাছের দেখা মেলে। আমাদের পরম কাঙ্ক্ষিত পারুলও গ্রীষ্ফ্মেই ফোটে। এ ছাড়াও দুলিচাঁপা, কাঠগোলাপ, মুচকুন্দ, উদয়পদ্ম, গন্ধরাজ, বেলি, রুদ্রপলাশ, সাদা রঙ্গন, ভাঁট ও পাখিফুল গ্রীষ্মের সৌন্দর্যকে বেশ উপভোগ্য করে তোলে।