ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

আইসোলেশন চেম্বারে সুরক্ষা পাবেন চিকিৎসকরা

আইসোলেশন চেম্বারে সুরক্ষা পাবেন চিকিৎসকরা
×

চিকিৎসকদের জন্য ডিজাইন করা 'আইসোলেশন চেম্বার'

ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ মে ২০২০ | ১৪:৩৮

চিকিৎসকদের বলা হচ্ছে করোনাযুদ্ধের প্রথম সারির সৈনিক। আর এই যোদ্ধারা আছেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে সেবাদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এমন চলতে থাকলে চিকিৎসা খাতে শোচনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টির শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই চিকিৎসকরা যেন নিরাপদ অবস্থানে থেকে সেবা দিয়ে যেতে পারেন, এমন একটি পথ বাতলেছেন স্থপতিরা। তারা 'আইসোলেশন চেম্বার ফর ডক্টরস' নামে একটি সুরক্ষিত চেম্বারের নকশা করেছেন। সেটির ভেতরে থেকে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী রোগীর প্রাথমিক পরীক্ষার কাজটি সেরে ফেলতে পারবেন। এতে রোগীর শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি থাকলেও চিকিৎসকের সংক্রমিত হওয়ার ভয় নেই। অন্যদিকে করোনার উপসর্গ থাকলে রোগীকে দ্রুত সংশ্নিষ্ট বিভাগে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যাবে। নানা জায়গায় ঘুরে তার মাধ্যমে আরও মানুষের সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কাও থাকছে না।

চিকিৎসকদের জন্য এই আইসোলেশন চেম্বারের নকশা করেছে ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ লিমিটেড নামে একটি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান। এর পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব সমকালকে বলেন, 'করোনাযুদ্ধে জয়ী হতে হলে চিকিৎসকদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। এই চেম্বারটি সেই সুরক্ষা দিতে পারবে বলে আমরা আশা করছি। চলমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশে আরও আগেই এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। দেশেও বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজন এ ধরনের কিছু করার চেষ্টা করেছেন। যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচাই করে একটি মডেল তৈরি করা দরকার, যাতে সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে আমরা সেই চেষ্টাই করেছি।'

তিনি জানান, দেশে সুলভ উপাদান দিয়ে এমন একটি চেম্বার তৈরি করতে আনুমানিক ৪৭ হাজার টাকা খরচ পড়বে। এতে মূলত এমএস বক্স, মেলামাইন কোটেড বোর্ড, প্লাস্টিকের দরজা, স্বচ্ছ কাচ, পিভিসি পাইপ, আইপিএস, এক্সহস্ট ফ্যান ইত্যাদি ব্যবহার করা হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ বা সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ চাইলে এই নকশা অনুযায়ী চেম্বার তৈরি করে প্রতিটি হাসপাতালের প্রবেশমুখে স্থাপন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভিত্তির স্থপতি ও এই কর্মকাণ্ডের উদ্যোক্তা 'টিম এসওএস' সবরকম সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

সংশ্নিষ্টরা জানান, হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের প্রবেশমুখেই রোগীর সমস্যার ধরন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেলে অনেক সুবিধা হয়। কারণ, চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে বুঝতে পারছেন না রোগীর করোনা নাকি অন্য কোনো ব্যাধি। আবার কোনো রোগী জেনে-বুঝে তথ্য গোপন করেছেন, এমন ঘটনাও ঘটছে। তেমন কেউ যদি করোনার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালের বদলে সাধারণ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান, আর চিকিৎসকের পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে অনেকের আক্রান্ত হওয়ার ভয় থাকে। তা ছাড়া শুধু পিপিই ব্যবহার করলেই করোনা থেকে শতভাগ মুক্ত থাকা যায়, এমনও নয়। ফলে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা অনেক সময় রোগীর সেবা দিতে ভয় পাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে ডক্টরস আইসোলেশন চেম্বারে থেকে অনায়াসেই রোগীর পরীক্ষা করা যাবে। সেখানে বিশেষভাবে একটি স্টেথোসকোপ বসানো আছে, যার কানে লাগানোর অংশ থাকবে চেম্বারের ভেতরে, আর বুকে বসানোর অংশটি বাইরে রোগীর দিকে। চেম্বারের বাইরের দিকে দুটি দস্তানা লাগানো থাকবে। চিকিৎসক এর মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ঝুঁকি ছাড়াই পালস দেখা বা রোগীর শরীর স্পর্শ করে যেসব পরীক্ষা করতে হয়, তা করতে পারবেন। লেজার থার্মোমিটারের মাধ্যমে দূর থেকেই মাপা যাবে তাপমাত্রা। সাউন্ড সিস্টেমের সাহায্যে চিকিৎসকের কথা রোগী এবং রোগীর কথা চিকিৎসক শুনতে পারবেন। চেম্বারের ভেতরে আলাদা ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা থাকবে। সেখান থেকে বাতাস রোগীর অংশে যাবে না এবং রোগীর অংশের বাতাস চেম্বারের ভেতরে ঢুকবে না। ফলে চিকিৎসক-রোগীর কথোপকথন বা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে অন্যজনের আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকছে না।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ভাইরোলজিস্ট ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, 'কোরিয়া রোগীর নমুনা সংগ্রহের জন্য এমন একটি চেম্বার তৈরি করেছিল। পরে দেশে ব্র্যাকও এ ধরনের উদ্যোগ নেয়। ক্রিকেটার ও এমপি মাশরাফি বিন মুর্তজাও তার এলাকায় এমন চেম্বার স্থাপন করেছেন। নতুন এই উদ্ভাবনী নকশার বিশেষত্ব হলো, এভাবে চেম্বার তৈরি হলে রোগীর প্রাথমিক পরীক্ষার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজটিও নিরাপদে করা যাবে।'

এই কর্মকাণ্ডের অন্যতম উদ্যোক্তা সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন জানান, 'টিম এসওএস' নামে তাদের একটি ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে। করোনাকালে তারা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণসহ নানা সহায়তা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এ সময় চিকিৎসকদের জন্য এমন সুরক্ষিত চেম্বার তৈরির চিন্তা মাথায় আসে। তারা এ ব্যাপারে স্থপতি ইকবাল হাবিবের সহায়তা চাইলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান। এমনকি প্রথম নমুনা চেম্বার তৈরির জন্য অর্থায়নও করছেন তিনি।

শোভন জানান, রোগীর পরীক্ষার পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহের কাজেও এই চেম্বার ব্যবহার করা যাবে। সেজন্য ডিজাইনে সামান্য পরিবর্তন আনতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ার কোথাও কোনো সমস্যা পরিলক্ষিত হলে তা শুধরে নেওয়া কিংবা প্রয়োজনে কোনো প্রযুক্তি যোগ-বিয়োগের সুযোগও রয়েছে।

আরও পড়ুন

×