ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান

জি কে শামীম ও খালেদের বিরুদ্ধে চার্জশিট

জি কে শামীম ও খালেদের বিরুদ্ধে চার্জশিট
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০১৯ | ১১:০৩ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০১৯ | ১১:১৬

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিস্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া এবং যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার জি কে শামীমের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। চার্জশিটে জি কে শামীমের সাত দেহরক্ষীকে আসামি করা হয়েছে।

রোববার গুলশান থানার অস্ত্র মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয় র‌্যাব। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে দুটির চার্জশিট দাখিল করা হলো। অবশ্য অভিযানের শুরুর দিনই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন খালেদ। প্রথম চার্জশিটও তার বিরুদ্ধে। চার্জশিটে আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে রাজধানীর বড় একটি এলাকায় 'সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েমে'র অভিযোগ করা হয়েছে।

এদিকে রোববার দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা একটি মামলায় সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে তাকে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর র‌্যাব ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করে রাজধানীর মতিঝিলের আরামবাগ ক্লাবপাড়া, গুলিস্তান ও বনানী এলাকায়। এদিন খালেদের ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবসহ চারটি ক্ল্যাসিনো ক্লাব সিলগালা করে দেওয়া হয়।

ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত থাকায় গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় খালেদকে। বাসা থেকে জব্দ করা হয় আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, ইয়াবা ও মদ। গ্রেপ্তারের পর তাকে যুবলীগ থেকে বহিস্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে গুলশান ও মতিঝিল থানায় চারটি মামলা করে র‌্যাব। এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দায়ের করা অস্ত্র মামলাটি তদন্ত করেন র‌্যাব-৩-এর সহকারী পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন। তদন্ত শেষে তাকে অভিযুক্ত করে রোববার তিনি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ১৯৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ধারায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। সাক্ষী করা হয়েছে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১৫ জনকে।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, অবৈধ অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে খালেদ ও তার ক্যাডার বাহিনী শাজাহানপুর, মুগদা, মতিঝিল, আরামবাগ ও কমলাপুরসহ আশপাশ এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। মানুষ তার ভয়ে আতঙ্কিত ছিল। খালেদ দীর্ঘদিন ধরে মতিঝিল এলাকার ইয়ংমেনস ক্লাবসহ বেশ কয়েকটি ক্লাবে জুয়া, ক্যাসিনো ও মাদকের ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন। রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, যুব ভবন ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ছিল তার। এসব অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য অবৈধ অস্ত্রধারী একটি বিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন তিনি। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ক্যাসিনোসহ নানা অপকর্মে এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হতো। চার্জশিটে আরও বলা হয়, খালেদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া আলামতের একটি শটগান ও একটি পিস্তলের লাইসেন্স নবায়ন করার কথা থাকলেও তা নবায়ন করা হয়নি, যা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বলে আইনের দৃষ্টিতে বিবেচিত। দুটি অস্ত্রের লাইসেন্সে ৫০ রাউন্ড করে গুলি কেনার হিসাব থাকার কথা। অথচ তার হেফাজত থেকে নয় রাউন্ড পিস্তলের এবং সাত রাউন্ড শটগানের অতিরিক্ত গুলি পাওয়া যায়। এ ছাড়া জব্দ করা অপর একটি পিস্তলের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তিনি।

খিলগাঁও-শাজাহানপুরে গণপরিবহনে মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি করতেন খালেদ। এ ছাড়া প্রতি ঈদে শাজাহানপুর রেলকলোনি মাঠ, মেরাদিয়া ও কমলাপুরের অস্থায়ী পশুরহাট নিয়ন্ত্রণ করতেন। খিলগাঁও রেলক্রসিং এলাকায় প্রতি রাতে মাছের হাট থেকেও চাঁদাবাজি করতেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খালেদ মাহমুদ এক সময় ফ্রিডম পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৬ সালে যুবলীগে নাম লেখান। ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন এক সময়। তার সহযোগিতায় টেন্ডারবাজিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। সেই টাকার ভাগ বিদেশে জিসানের কাছে পৌঁছে যেত। টেন্ডার ও চাঁদাবাজির জন্য খালেদের নিজস্ব একটি বিশাল ক্যাডার বাহিনীও রয়েছে। ক্যাডার বাহিনীর একটি বড় অংশ শাজাহানপুর ও মতিঝিল এলাকার। ফিল্ম স্টাইলে চলাফেরা করতেন খালেদ। তার আগে-পিছে থাকত অস্ত্রধারী দেহরক্ষী। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিস্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই দাপট ছিল তার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং ক্যাডার বাহিনী ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করতেন। চাঁদা আদায়ের জন্য কমলাপুরে টর্চার সেল খুলে বসেছিলেন। সেখানে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, গায়ের চামড়া জ্বলে জ্বালাপোড়া করে এমন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিও রাখা ছিল টর্চার সেলে। চাঁদার টাকা না পেয়ে টার্গেট ব্যক্তি ও ঠিকাদারদের ওই টর্চার সেলে নিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়াসহ নানাভাবে নির্যাতন করা হতো।

খালেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার ঘনিষ্ঠ এবং ক্যাডার বাহিনীর অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছে। এমনকি মোবাইল ফোনও বন্ধ রেখেছে কেউ কেউ। খালেদ গ্রেপ্তারে ক্যাসিনোকাণ্ডে সামনে উঠে আসে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের নাম। অবশ্য সম্রাট 'ক্যাসিনো রাজ্যের সম্রাট' অনেক আগে থেকেই। তার নিয়ন্ত্রণেই ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে চলছিল ক্যাসিনো। কিন্তু ১৮ সেপ্টেম্বরের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তার বিরুদ্ধে 'টুঁ' শব্দ করেনি। সম্রাট গ্রেপ্তার হবে কি হবে না তা নিয়েও শুরু হয় গুঞ্জন। অভিযান শুরুর পর কিছুদিন সম্রাট প্রকাশ্যে থাকলেও পরে আত্মগোপনে চলে যান। গত ৬ অক্টোবর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে র‌্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে। একইসঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় তার ঘনিষ্ঠ ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের বহিস্কৃত সহসভাপতি এনামুল হক আরমানকে। সম্রাট, আরমান ও খালেদ ছাড়াও ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার হন কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি সফিকুল আলম ফিরোজ, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সেলিম প্রধান ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ড (মোহাম্মদপুর এলাকা) কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজানসহ বেশ কয়েকজন।

আরও পড়ুন

×