ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিদ্যুতের রমিজের সম্পদ বেড়েছে বিদ্যুৎ গতিতে!

বিদ্যুতের রমিজের সম্পদ বেড়েছে বিদ্যুৎ গতিতে!
×

রমিজ উদ্দিন সরকার

হকিকত জাহান হকি

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০১৯ | ১৫:১৫ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০১৯ | ১৫:৪৮

দুর্নীতির টাকায় ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের (ডিপিডিসি) নির্বাহী পরিচালক রমিজ উদ্দিন সরকার। বিদ্যুৎ গতিতে সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। রাজধানীতে তিনটি বাড়ির মালিক তিনি। আছে ১২৫ বিঘার বেশি জমি। নগদ টাকাও আছে বিপুল। স্ত্রীর নামে আছে ফ্ল্যাট, জমি, গাড়ি, আরও কত কী!

এত সম্পদ কোথায় পেলেন রমিজ? দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আসল রহস্য।

রমিজের মালিকানাধীন রাজধানীর উত্তরা আবাসিক এলাকায় ছয়তলা বিশিষ্ট বাড়ি ও মিরপুরের পূর্ব মনিপুরে ছয়তলা আরেকটি বাড়ি ক্রোক করার আদেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ কে. এম. ইমরুল কায়েস। সূত্র জানায়, ওই বাড়ি দুটি তিনি জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত অর্থে নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে উত্তরার বাড়িটি তার একক মালিকানাধীন ও মিরপুরের বাড়িটি তার স্ত্রী সালমা পারভীনের সঙ্গে যৌথ মালিকানায়।

বাড়ি দুটি অন্যের নামে হস্তান্তর ও বিক্রি করে টাকা পাচারের চেষ্টা করছেন রমিজ- এমন তথ্য রয়েছে দুদকের কাছে। তাই অবৈধ অর্থে অর্জিত বাড়ি দুটি সরকারি মালিকানায় অন্তর্ভুক্ত করতে ক্রোক করার জন্য আদালতে আবেদন করেছিল কমিশন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আদালত থেকে ওই আদেশ দেওয়া হয়।

জানা গেছে, চাকরিকালীন তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। পরিচ্ছন্ন ধার্মিক বেশভূষায় চলাচল করা এই কর্মকর্তার পেছনের দিকটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন। দুদকের অনুসন্ধানে সেই তথ্য-প্রমাণই বেরিয়ে এসেছে।

সূত্র জানায়, রমিজ উদ্দিন ডিপিডিসির ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে আছেন। তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা দায়েরের পরও তিনি সদর্পে অফিস করছেন। মামলার পরও ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্তও করেনি। এদিকে দুদকও তাকে গ্রেফতার করেনি।

গত ৬ অক্টোবর দুদকের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বাদী হয়ে মিথ্যা তথ্য প্রদান, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগে রমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

এজাহারে তার বিরুদ্ধে দুদকে পেশ করা সম্পদ বিবরণীতে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে এক কোটি ১৮ লাখ ৯২ হাজার ৪৭৬ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন, এক কোটি ৯৫ লাখ ৭৯ হাজার ৮৬৭ টাকার জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অবৈধ পথে অর্জিত দুই কোটি ৬১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৬৭ টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে স্থানান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুর দিকে রমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুদক। গত ৭ মার্চ সস্ত্রীক তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। রমিজ উদ্দিন গত চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি দুদকে সম্পদ বিবরণী পেশ করেন। এতে দাবি করা হয়- তিনি এক কোটি ৬৩ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকার স্থাবর ও ৮৪ লাখ ৭ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদসহ মোট দুই কোটি ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকার সম্পদের মালিক।

তবে দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি দুই কোটি ৪১ লাখ ১৯ হাজার ২৮৯ টাকার স্থাবর ও এক কোটি ২৫ লাখ ৭ হাজার ৬৮৭ টাকার অস্থাবর সম্পদসহ মোট তিন কোটি ৬৬ লাখ ২৬ হাজার ৯৭৬ টাকার মালিক। তিনি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে এক কোটি ১৮ লাখ ৬৭ হাজার ৪৭৬ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, জনতা ব্যাংকের ঢাকার আবদুল গণি রোড শাখা, এক্সিম ব্যাংক পান্থপথ শাখা ও আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখার তিনটি হিসাবে গত ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থিতি ছিল ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৯৮৭ টাকা। গত ২১ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসাবগুলো থেকে মোট ৬৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এসব তথ্য সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়নি।

রমিজ উদ্দিনের নামে-বেনামে আরও সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। দুর্নীতির টাকা তার স্ত্রীর নামে রাখা হলেও দুদক এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। দুদকের দায়ের করা ওই মামলায় উল্লেখ করা তথ্যের বাইরে রমিজ দম্পতির বিরুদ্ধে আরও অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। নামে-বেনামে রয়েছে ওইসব সম্পদ। রমিজ উদ্দিনের স্ত্রী সালমা একজন গৃহিণী। দুদকের অনুসন্ধানে সালমার নামেও বিপুল সম্পদ পাওয়া যায়। রমিজ অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের একটি অংশ তার স্ত্রীর নামে রেখেছেন।

রমিজ উদ্দিনের যত সম্পদ :রামপুরা মহানগর হাউজিংয়ের ডি ব্লকের ২০২ নম্বর প্লটে ৪ কাঠা ৫ শতাংশ জমিতে পাঁচটি দোকান ও একটি টিনশেড বাড়ি রয়েছে। এর মূল্য ২ কোটি টাকা। পূর্ব রামপুরার ১৭৭/৫/১ নম্বর প্লটের ৯.৪৮ শতাংশ জমিতে নির্মিত ছয়তলা বাড়ি রয়েছে তার। টঙ্গী ও গাজীপুরে নামে-বেনামে ৩০ একর (৭৫ বিঘা) এবং কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় স্ত্রীর নামে রয়েছে ৫০ বিঘা জমি। বিভিন্ন কোম্পানির ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৯৮ টাকার শেয়ার কিনেছেন তিনি। তার নামে ইসলামী ব্যাংক মতিঝিল শাখায় কয়েক কোটি টাকার ডিপোজিট রয়েছে।

স্ত্রীও কম যান না:  স্ত্রী সালমা পারভীনের নামে মিরপুরের মল্লিকা মিল্ক্ক ভিটা রোডে ২৮ নম্বর বাড়ির চারতলায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। তার অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ছয় লাখ ৩৪ হাজার টাকার শেয়ার, ১৮ লাখ ৫০ টাকা মূল্যের প্রাইভেট কার, দুই লাখ ৮০ হাজার টাকার আসবাবপত্র, দুই লাখ ৭০ হাজার টাকার ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী ও ব্যাংকে গচ্ছিত ৯ লাখ ৮৩ হাজার ২৪২ টাকা।

আরও পড়ুন

×