ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সেই অক্টোবরের স্মৃতি-১

শেফালীর শূন্যভিটে

শেফালীর শূন্যভিটে
×

ভোলার লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের চরঅন্নদাপ্রসাদ গ্রামের এই ভিটেতে ছিল শেফালীর বসবাস- সমকাল

রাজীব নূর, ভোলা থেকে ফিরে

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০১৯ | ১৫:২১ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০১৯ | ১৫:৪৮

শেফালী যে ঘরটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করতেন, সেটি এখন ললিত দাসের গোয়ালঘর। শেফালীরা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন বছর ছয়েক আগে। কোথায় গেছেন, তা ভালো করে জানা নেই ললিত দাসের। বললেন, 'শুনেছি জলপাইগুড়ির টাকিমারির চর বলে একটা এলাকায় আছে ওরা।'

২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর 'নৌকায় ভোট দেওয়ার' অপরাধে নির্যাতন নেমে এসেছিল সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর। সবচেয়ে নির্যাতিত অঞ্চলগুলোর একটি ভোলার লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের চরঅন্নদাপ্রসাদ গ্রামে ধর্ষিত হয়েছিলেন শেফালী। সেই সময় খবরের কাগজে এ নিয়ে পরিবেশিত একটি সংবাদের শিরোনাম হয়, 'পঙ্গু শেফালীর নাকফুল কেড়ে নেওয়ার কাহিনি'। নাকফুল কেড়ে নেওয়া বলতে চূড়ান্ত সল্ফ্ভ্রমহানি বুঝিয়েছিলেন শেফালী এবং সংবাদটিতে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলাও হয়েছিল। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর রাতের ওই ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ হতে লেগে যায় এক মাসেরও বেশি। খবরটি প্রথম প্রচার হয়েছিল ১১ নভেম্বর। তারপর পুলিশ শেফালীর স্বামী সুভাষকে ডেকে নিয়ে প্রথমে নাকফুল লুটের মামলা করতে বাধ্য করে এবং মামলার এজাহারে আসামিদের নাম উল্লেখ না করে ঘর শূন্য রাখে। বিষয়টি ধরা পড়ে শেফালী যখন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন এবং স্পষ্ট করে দুই আসামির নাম বলেন। ওই আসামিরা হলেন সাইফুল ও শাহীন।

শেফালী ধর্ষণ মামলার কী হয়েছিল কিছুই জানাতে পারেননি ললিত দাস। তবে লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মিয়া জানান, 'ওই মামলায় সাইফুল এখনও কারাগারে সাজা ভোগ করছে। তবে শাহীন ছাড়া পেয়ে গেছে।' এর বেশি জানা নেই চেয়ারম্যানেরও। তিনি বলেন, 'শাহীন এখনও বিএনপির রাজনীতি করে। তবে তাকে খুব একটা এলাকায় দেখা যায় না।'

মামলার রায় হয়েছে, অপরাধীদের একজন সাজা ভোগ করছেন, তবু শেফালীরা কেন দেশ ছেড়ে গেলেন? ললিত দাস বলেন, 'ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে। ছেলেটার বিয়ে হয়েছে। মেয়েটাকে নিয়ে ভাবনায় পড়ে গিয়েছিল ওরা।'

ললিত জানান, শেফালীরা ছিলেন তাদের 'ওরকাইত'। ভোলায় ওরকাইত শব্দটি ব্যবহূত হয় আশ্রিতের বেলায়। তবে 'ওরকাইত' আশ্রিতের চেয়েও একটু বেশি। ওরকাইতরা আশ্রয়দাতার চাষাবাদের কাজে সহযোগিতা করেন। আশ্রয়দাতার অনুপস্থিতিতে তার বাড়িঘর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও থাকে ওরকাইতের ওপর। বিনিময়ে জমির অধিকার না দিলেও ওরকাইতকে উচ্ছেদ করেন না আশ্রয়দাতা, এটা নিয়ম।

ললিতদের বাড়িতে শেফালীরা ওরকাইত হয়ে এসেছিলেন ১৯৯২ সালে। ললিতের ভাষায়, তখন 'ঘরপোড়া দাঙ্গা' হয়েছিল। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় ষোড়শ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে হিন্দুরা ব্যাপক তাণ্ডবের মধ্যে পড়ে। সেবার অনেক বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল, চরঅন্নদাপ্রসাদের পাশের গ্রাম ফাতেমাবাদে শেফালীদের বাড়িটিও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেবারের ওই সহিংসতা লর্ডহার্ডিঞ্জের মানুষের কাছে 'ঘরপোড়া দাঙ্গা' নামে পরিচিত।

শেফালীদের নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন ললিতের বাবা লবণী কুমার দাস। ললিতের সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে লবণীও এলেন। তিনি বলেন, 'আসলেত দাঙ্গা অনা (হয় না)। আমরা একতরফা মাইর খাই।' এখন যেখানটায় লবণীর ঘর, ১৯৯২ সালে সেখানে ছিলেন না তারা। সেবারের পর লবণীর শরিকরা মুসলমানদের কাছে নিজেদের অংশ বিক্রি করে দিয়ে চলে যায়। 'নতুন প্রতিবেশীরা কেমন?' জানতে চাইলে লবণী রসিকতা করে বলেন, 'হেতারা (তারা) এতই ভালা মানুষ, আঁই হেতাগো (তাদের) কাছে বাপদাদার বাই (বাড়ি) বেচি দিতে বাধ্য অইছি। এরপর ইয়ানে আয় (এখানে এসে) ঘর বানাইছি।'

লবণী দাসের এই বাড়ির এক পাশে ছিল শেফালীদের ঘরটি। বাড়ির অন্যরা যখন পালিয়ে যায়, তখন শারীরিক প্রতিবন্ধী শেফালী পালাতে পারেননি। সেটা ছিল ২০০১ সালের ১ অক্টোবর রাতের ঘটনা। তারপরও অনেক বছর ছিলেন এই বাড়িতে। ললিত দাস জানান, তিনি নিজেও অনেকবার চলে যাওয়ার কথা ভেবেছেন। একবার জলপাইগুড়ির টাকিমারিতে ঘুরেও এসেছেন। ললিতের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, টাকিমারিতে আবাদ করার যোগ্য জমি খুব কম। বাগডোগরা থেকে ৪৫ কিলোমিটারের পথ গজলডোবা। গজলডোবা এলাকায় তিস্তার একটি চরের নাম টাকিমারি। ললিত বলেন, 'আমি শেফালীর স্বামী সুভাষকে বলেছি, টাকিমারিতে গিয়ে জীবন বাঁচানো কঠিন হবে। তারা আমার কথা শুনেনি। কে জানে তারা ওখানে কেমন আছে, নাকি অন্য কোথাও চলে গেছে?'

১৯৯১ সাল পর্যন্ত লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের চরঅন্নদাপ্রসাদ, ফাতেমাবাদ ও পিয়ারীমোহন নামের গ্রাম তিনটি ছিল পুরোপুরি হিন্দুঅধ্যুষিত। এই তিন গ্রামের একটি পিয়ারীমোহনের বাসিন্দা হীরালাল ভৌমিক জানান, ইউনিয়নের অন্য চারটি গ্রামেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হিন্দুর বসবাস ছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই ইউনিয়নে হিন্দুদের ভোট ছিল সাড়ে চার হাজারের মতো এবং বর্তমানে তা হাজারখানেক হবে। অবশ্য লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মিয়া বলেন, '১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় সাড়ে চার নয়, হিন্দু ভোটারের সংখ্যা ছিল তিন হাজারের মতো। বর্তমানে কাগজে-কলমে হাজার খানেক হলেও প্রকৃতপক্ষে হিন্দু ভোটার হবে ৬০০ জন।'

রায়চাঁদ উদয়চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক হীরালাল ভৌমিকের ধারণা, এবার আবার যাওয়া শুরু হবে। তিনি বলেন, 'বোরহানউদ্দিনে কে কী করল, তার জন্য লর্ডহার্ডিঞ্জের হিন্দুরা কেন দায়ী হবে? আমি নিজে সেই রাতে নিজের বাড়িতে থাকার সাহস পাইনি।' ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে এক যুবকের ফেসবুক থেকে দেওয়া বিভ্রান্তিকর পোস্ট নিয়ে সহিংসতার সৃষ্টি হয়। বিপ্লবের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার সন্দেহে শরীফ ও ইমন নামে দু'জন আটক হয়েছেন। এরই মধ্যে ওই ফেসবুক পোস্টের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গত ১৯ অক্টোবর চারজন নিহত হন এবং বোরহানউদ্দিন থানার অদূরে অবস্থিত হিন্দু মহল্লা ভাওয়ালবাড়িতে একটি মন্দির ও আটটি হিন্দু বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়।

আরও পড়ুন

×