বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ
প্রকৃতিকে সময় দিন
করোনাকালে দূষণ কম। সিলেট শহরে ফিরেছে সজীবতা। নগরীর পুলিশ লাইন এলাকার ছবি- ইউসুফ আলী
জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২০ | ১৪:৫৫
হর্নের কর্কশ শব্দের সঙ্গে আপস করে ঘুমানোর অভ্যাস রপ্ত করছিল শহরবাসী। কিন্তু করোনাভাইরাসজনিত পরিস্থিতিতে দেখতে পেয়েছে প্রকৃতির নতুন এক রূপ। ইট-পাথরে মোড়ানো শহরে রাত নামার সময় কিংবা খুব ভোরে তার কানে স্পষ্ট বেজেছে পাখপাখালির সুর। বুকভরে নিয়েছে নিশ্বাস। এই কয়েক মাস আগেও আলকাতরার সঙ্গে তুলনা করা ঐতিহাসিক বুড়িগঙ্গা নদীর পানি হয়ে উঠেছে আয়নার মতো। লতাগুল্মে জীবন্ত এখন সমুদ্রসৈকতের তীর। এ সবই সম্ভব হয়েছে করোনাভাইরাসের কারণে। মানব জাতির কাছে অভিশাপ হয়ে এলেও এ যেন প্রকৃতির প্রকৃত বন্ধু।
এ পরিস্থিতিতে এসেছে এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের হাত থেকে প্রকৃতিকে রক্ষার লক্ষ্যে সারা দুনিয়ার মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য এই দিনটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। পরিবেশ সচেতনতা তৈরির জন্য জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় মঞ্চ এ দিবসটি ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন পালিত হয়ে আসছে। পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- 'প্রকৃতিকে বাঁচানোর এখনই সময়'।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিরূপ প্রকৃতিকে রক্ষার জন্য একটি গাইডলাইন ইতোমধ্যে করোনা দিয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার উচিত এই সময়ের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা। দ্রুত এ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনের জন্য কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। কিছুতেই যেন আগের মতো পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড ফিরতে না পারে, সেদিকে বেশি সোচ্চার থাকতে হবে।
শহরবাসীর স্বচ্ছন্দ জীবনযাপনে অন্যতম বিপদ হলো বায়ুদূষণ। বিশেষ করে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি বড় শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। বাতাসকে দূষণকারী ছয়টি উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো পিএম২.৫। এই উপাদান নির্গতের নিরিখে গত বছর শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। বিশ্বে রাজধানীর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। গত বছর ঢাকার বাতাসে ক্ষতিকর বস্তুকণাটির উপস্থিতি ছিল ৮৩ দশমিক ৩ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৮ সালে ৯৭ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম নিয়ে ঢাকা ছিল শীর্ষে। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক বাতাসে বস্তুকণা-পিএম২.৫ এর বার্ষিক মানমাত্রা ১৫ মাইক্রোগ্রাম।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ৩১ মে সীমিত পরিসরে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শুরুর আগ পর্যন্ত আমূল বদলে যায় বায়ুমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখার সময় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স অনুযায়ী ঢাকার অবস্থান ছিল ২৫ নম্বরে। এ সময় বাতাসে ক্ষতিকর বস্তুকণা পিএম২.৫-এর মাত্রা ছিল ২৩ দশমিক ৪ মাইক্রোগ্রাম। শুধু তাই নয়, এপ্রিল-মে মাসজুড়েই বাতাসের মান ভালো ছিল।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) জিয়াউল হক সমকালকে বলেন, করোনাভাইরাস এসে প্রমাণ দিয়ে গেল- বায়ুদূষণের জন্য প্রধান দায়ী কে। এ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে বায়ুমান আদর্শ মাত্রায় রাখতে না পারা হবে বড় দুঃখ। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগের চেয়ে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে বায়ুদূষণ ঠেকাতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি করা হয়েছিল। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনাপূর্বক আদালতে একটি নির্দেশিকা জমা দেওয়া হয়। সেখানে কয়েকটি গাইডলাইন দেওয়া হয়েছিল। তার মধ্যে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছিল ফিটনেসবিহীন গাড়ির কথা। ফিটনেসবিহীন যানবাহন যেন আর সড়কে নামতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে বিআরটিএ এবং পুলিশকে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও গবেষক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, এ মুহূর্তে সবার উচিত খুব সচেতনভাবে তথ্য সংগ্রহ করা। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করতে হবে।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামসুদ্দোহা বলেন, করোনাকালে স্পষ্ট হয়ে গেছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মানুষের নানা বাড়তি তৎপরতা পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিষয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
এদিকে, করোনাকালে পরিবেশের অপরূপ চিত্র দেখা গেছে কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন এবং দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়। নিজেদের জায়গা ফিরে পাওয়ার আনন্দে মেতে ওঠে প্রাণ-প্রকৃতি। কক্সবাজারের বালিয়াড়িতে দেখা গেছে ঝাঁকে ঝাঁকে লাল কাঁকড়ার বিচরণ। ডালপালা মেলতে শুরু করে সাগরলতা। লোকালয়ের কাছে এসেই ডিগবাজিতে মেতে ওঠে ডলফিনের দল।
প্রাণ-প্রকৃতির এই রূপ আগে কখনোই দেখা যায়নি বলে জানান পরিবেশকর্মী ইব্রাহিম খলিল মামুন। পরিবেশ সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির প্রধান নির্বাহী মামুন বলেন, বছরের পর বছর পরিবেশ সুরক্ষার আন্দোলন করে লাভ হয়নি। পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড থেকে প্রভাবশালীদের দমানো যায়নি। একমাত্র করোনা এসে তা পেরেছে। তিনি বলেন, এই অবস্থা থেকে অবশ্যই পাঠ নিতে হবে। বিশেষ করে সামনের দিনগুলোতে সরকারকে সমুদ্রসৈকতে কাঁকড়ার বিচরণ এলাকা এবং নতুন করে জন্মানো লতাগুল্ম সংরক্ষণ করতে হবে। পর্যটকের জন্য একটি সীমারেখা এঁকে দিতে হবে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ বলেন, সৈকত তীরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন। যেসব স্থানে লাল কাঁকড়া ও ডলফিন দেখা গেছে সেগুলো দ্রুত সংরক্ষণ, লতাপাতা জেগে ওঠা জায়গাগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারের মতো এলাকা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু জায়গায় ডলফিন বিচরণ করতে দেখা গেছে। কিন্তু সেখানে জেলেরা মাছ ধরে। তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তবে তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টিও ভাবনায় রয়েছে। পুরো কার্যক্রম পরিচালনায় একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে।